ভোলার মনপুরা যোগাযোগের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মাধ্যম সি-ট্রাকটি দীর্ঘ ছয় মাস ধরে বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরার লক্ষাধিক বাসিন্দা। উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিতে নিরাপদ কোনো নৌযান না থাকায় নিরুপায় হয়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে পণ্যবাহী ট্রলারে চড়ে জেলা সদরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করছেন সাধারণ মানুষ। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের নৌ-দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মনপুরা-তজুমদ্দিন নৌরুটে যাত্রী পারাপারের জন্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি) সি-ট্রাক সার্ভিস চালু করেছিল। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটি এবং ইজারাদার সংকটের অজুহাতে গত ছয় মাস ধরে এই রুটে সি-ট্রাক চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
এদিকে মেঘনার ডেঞ্জার জোনে সি-সার্ভে ব্যতীত নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ হলেও অবৈধ ট্রলারে যাত্রী পারাপার করছে মাসের পর মাস। তবে এসব ট্রলার নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএর নেই কোন তদারকি। আর বড় দুর্ঘটনা এড়াতে জরুরী ভিত্তিতে অবৈধ নৌযান নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি সচেতন মহলের। তবে এ সংকট সমাধানে শিগগিরই সি-ট্রাকটি চালুর আশ্বাস দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সরেজমিনে ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন শত শত মানুষ জেলা সদর ভোলা কিংবা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘাটে ভিড় করছেন। সি-ট্রাক না থাকায় ঘাটে নোঙর করে রাখা পণ্যবাহী ট্রলারই এখন তাদের একমাত্র অবলম্বন। এই ট্রলার মূলত মাছ, ধান, তরমুজ এবং বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহনের জন্য তৈরি। সেখানে যাত্রীদের বসার কোনো সুব্যবস্থা নেই, নেই কোনো ছাদ বা রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচার ছাউনি। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, ওই ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট বা ন্যূনতম কোনো জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম নেই। উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ যাত্রী এবং সাথে ভারী মালামাল বোঝাই করে ট্রলারগুলো ঝুঁকি নিয়ে নদী পাড়ি দিচ্ছে।
সি-ট্রাক বন্ধ থাকার সুযোগে ট্রলার চালক ও ঘাট ইজারাদারেরা সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।এমনকি নিরাপদ নৌ-যোগাযোগ না থাকায় দ্বীপের কাঁচামাল ও কৃষিপণ্য সময়মতো মূল ভূখণ্ডে পাঠানো যাচ্ছে না। ফলে লোকসানের মুখে পড়ছেন স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
মনপুরার কয়েক জন যাত্রীর সাথে কথা বলে জানা যায়, যোগাযোগের এই বেহাল দশার কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশীরা। দ্বীপে উন্নত চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় জটিল কোনো রোগী কিংবা প্রসূতি মায়েদের উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত জেলা সদর হাসপাতাল বা বরিশালে পাঠাতে হয়। কিন্তু সি-ট্রাক বন্ধ থাকায় ট্রলারে করে নদী পথে রোগী নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে। অনেক সময় সঠিক সময়ে উন্নত চিকিৎসা না পেয়ে পথেই রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে। এছাড়া বৃদ্ধ ও শিশুদের নিয়ে এই উত্তাল নদী পাড়ি দেওয়া যেন এক একটি দুঃস্বপ্নের মতো।
যোগাযোগের এই অচলাবস্থার প্রভাব পড়েছে দ্বীপের অর্থনীতিতেও। মনপুরার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হলো মৎস্য আহরণ এবং কৃষি। নিরাপদ ও সময়োপযোগী যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় জেলেরা তাদের ধৃত মাছ এবং কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত শাকসবজি ও ফসল সঠিক সময়ে বাইরের বড় বাজারগুলোতে পাঠাতে পারছেন না। ফলে ঘাটে মালামাল পচে নষ্ট হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন।
স্থানীয় সমাজকর্মী ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দাবি, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং জীবনযাত্রার মান স্বাভাবিক রাখতে অনতিবিলম্বে এই রুটে একটি উন্নতমানের সি-ট্রাক বা নিরাপদ যাত্রীবাহী নৌযান চালু করা প্রয়োজন।
মনপুরা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর আমিনুল এহসান জসিম জানান, মনপুরা তজুমদ্দিন রুটের ট্রলারে যাত্রা চরম এক ভোগান্তির নাম। তারপও গত ৬ মাস বাধ্য হয়ে মনপুরার মানুষে যাতায়াত করছেন। তিনি একাধিকবার উপজেলা আইন শৃঙ্খলা মিটিংয়ে জানিয়েছেন কিন্তু কোন প্রতিকার পাননি। যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাতে ট্রলারটি মাসের পর মাস বন্ধ রাখা হয়। মনপুরার মানুষের ভোগান্তি লাগবে ওই রুটে একটি নতুন সি-ট্রাক বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে মনপুরা যাওয়ার জন্য ঘাটে আসেন হাজিরহাট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তপন চন্দ্র হাওলাদার। ট্রলার দুরবস্থা ও নদীর ঢেউ দেখে ট্রলারে উঠতে সাহস পাচ্ছেন না তিনি। তপন চন্দ্রের ভাষ্য, মনপুরার প্রতিটি মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করছেন।
জানা যায়, তজুমদ্দিন থেকে মনপুরা যাত্রীদের নিরাপদ মেঘনা পারাপারের জন্য এসটি ইলিশা নামের বিআইডব্লিউটিসি একটি সি-ট্রাক বরাদ্দ দেয়। যা গত বছরের নভেম্বর মাস থেকেই বন্ধ রয়েছে। অথচ সরকারের নির্দেশনা রয়েছে ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর মেঘনার ডেঞ্জার জোনে সি-সার্ভে ছাড়া কোন নৌযানে যাত্রী পরিবহন করতে পারবে না। সরকারের এ নির্দেশনা উপেক্ষা করে মনপুরা-তজুমদ্দিন নৌরুটে পণ্য পরিবহনের ট্রলারে যাত্রী পারাপার করছে। জিম্মি করে আদায় করছে অতিরিক্ত ভাড়া। বিকল্প কোন উপায় না থাকায় সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ যানে উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। জান-মালের নিরাপত্তায় দ্রুত সি-ট্রাক চালুর দাবি স্থানীয়দের।
এই ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিসির উপ-বাণিজ্য ব্যবস্থাপক (যাত্রী) খন্দকার মুহাম্মদ তানভী হোসেন জানান, যান্ত্রিক ত্রুটি ও ইজারা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সি-ট্রাকটি বন্ধ ছিল। সে জটিলতা কাটিয়ে শিগগিরই সি-ট্রাক চালু করা হবে।
এই ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএ সহকারী পরিচালক নির্মল কুমার রায় জানান, ডেঞ্জার জোনে সি-সার্ভে ছাড়া কোন ট্রলারে যাত্রী পারাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মনপুরা-তজুমুদ্দিন নৌরুটে চলাচলকারী অবৈধ ট্রলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে প্রশাসনের এই আশ্বাস কবে নাগাদ বাস্তবে রূপ নেবে, তা জানা নেই কারো। যতদিন না নতুন কোনো নিরাপদ নৌযান ঘাটে ভিড়ছে, ততদিন পর্যন্ত বাধ্য হয়েই বুকভরা আতঙ্ক আর জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে এই উত্তাল মেঘনার বুকেই ভাগ্য সঁপে দিতে হচ্ছে মনপুরার অবহেলিত জনপদকে।
সময়ের আলো/আতা