প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা চাপে রেখেছে হাম। টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হলেও কমছে না আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। এরই মধ্যে নতুন করে চোখ রাঙাচ্ছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু। বর্ষা শুরু হতেই সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে শুধু জুনেই ডেঙ্গু রোগী প্রায় চার গুণ বেড়েছে, বেড়েছে মৃত্যুও। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা জুনের তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ এবং আগস্টে তিন থেকে চারগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তাদের মতে, দেশের অনেক এলাকায় ইতিমধ্যে এডিস মশার ঘনত্ব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অথচ মশা নিয়ন্ত্রণে এখনও লক্ষ্যভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিক কর্মসূচির ঘাটতি রয়েছে। শুধু ফগিংয়ের ওপর নির্ভর না করে প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভা নিধন এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। একই সঙ্গে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত না করলে মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
দেশে ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর ছিল ২০২৩। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং প্রাণ হারান ১ হাজার ৭০৫ জন। স্বাধীনতার পর দেশের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে বড় ডেঙ্গু বিপর্যয়। শুধু রাজধানী নয়, দেশের ৬৪ জেলাতেই রোগী ছড়িয়ে পড়ে। বেশিরভাগের মৃত্যু হয় ঢাকার বাইরে। ২০২৩ সালের আগে সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব হয়েছিল ২০১৯ সালে। সে বছর হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন এবং মৃত্যু হয় ১৬৪ জনের। এরপর ২০২২ সালে আক্রান্ত হন ৬২ হাজার ৩৮২ জন, মৃত্যু হয় ২৮১ জনের।
এই ধারাবাহিকতা দেখায়, ডেঙ্গু আর রাজধানীকেন্দ্রিক বা বিচ্ছিন্ন মৌসুমি রোগ নয়; এটি এখন জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। ২০২৪ সালেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সরকারি হিসাবে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ এবং মৃত্যু ৪১৩। অর্থাৎ ২০২৩ সালের রেকর্ড বিপর্যয়ের পরও ডেঙ্গু উচ্চমাত্রায় রয়ে গেছে।
প্রতি বছর বর্ষা এলেই ডেঙ্গু বাড়বে এটি এখন প্রায় নিশ্চিত বাস্তবতা। প্রশ্ন হচ্ছে, সংক্রমণ কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। আর সেই উত্তর নির্ভর করছে মশা নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় সরকারের প্রস্তুতি, হাসপাতালের সক্ষমতা এবং জনগণের সচেতনতার ওপর।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গুতে মারা যান ২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন এবং মে মাসে ১ জন। কিন্তু জুনেই মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ জনে। একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যাও লাফিয়ে বেড়েছে। মে মাসে যেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৭১৪ জন, সেখানে জুনে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯০৭ জনে।
বেশি উদ্বেগ ঢাকার বাইরে : আগে ডেঙ্গু মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক থাকলেও এখন প্রায় সব বিভাগেই এ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বরিশাল বিভাগে। সেখানে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬২৯ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১৪০। খুলনা বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ৭০১ জন।
রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ৮৭১ জন। ঢাকা উত্তরে রোগীর সংখ্যা ৫৩২। এদিকে সংক্রমণ ভয়াবহ হওয়ার শঙ্কা থাকলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে আগাম ও কার্যকর পদক্ষেপের ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়ে গেছে। জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নিয়মিত কিছু কার্যক্রম চালালেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
স্বাভাবিক নিয়মে তিন মাস পরপর স্বাস্থ্য অধিদফতর রাজধানীতে এডিস মশার ঘনত্বের জরিপ চালায়। তবে আর্থিক সংকটের কারণে এবার সেই জরিপ হয়নি। পরে ডিএসসিসি নিজস্ব অর্থায়নে একটি জরিপ চালায়। এতে ২০টি ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভার উদ্বেগজনক উপস্থিতি পাওয়া যায়। এসব ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. ফেরদৌস আহমেদ বলেন, মশার চরিত্র পাল্টেছে। বর্ষায় শহরকেন্দ্রিক এডিস মশা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ডেঙ্গুর ধরন পাল্টেছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
এই চিকিৎসক বলেন, এই মৌসুমে সাধারণ জ্বর মনে করে বসে না থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডেঙ্গু পরীক্ষা করে জ্বরের কারণ নিশ্চিত হতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, আগামী দুই মাসে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ রাজধানীর বাইরের এলাকাগুলো নিয়ে।
তিনি বলেন, আমাদের পূর্বাভাস মডেল অনুযায়ী আগস্টে ব্যাপক আকারে সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা এবং দেশের আরও কয়েকটি অঞ্চলে ডেঙ্গু মারাত্মক রূপ নিতে পারে।
পূর্বাভাস বলছে, জুলাইয়ে ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা জুনের তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ এবং আগস্টে জুনের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সম্ভাব্য এই সংক্রমণ ঠেকাতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে দেশের সব জেলা শহরে অবিলম্বে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, অগ্রাধিকার হওয়া উচিত এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও লার্ভা নিধন কার্যক্রম জোরদার করা। এ ক্ষেত্রে কমিউনিটির অংশগ্রহণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাসিন্দাদের নিয়মিত নিজেদের বাড়ি ও আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা উচিত।
জুলাই ও আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থানা, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে এনএস১ পরীক্ষার কিট সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রোগী বাড়লে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব হাসপাতাল চালু করা হবে বলেও জানান তিনি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে মন্ত্রী আরও বলেন, ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে মসজিদের ইমামসহ সবাইকে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে সচেতন করা হয়েছে।
সময়ের আলো/আআ