সেবা মেলে না চট্টগ্রাম ওয়াসার পানির বুথে। পানির মান নিয়ে আছে হরেক অভিযোগ। দুর্গন্ধযুক্ত পানি সরবরাহের অভিযোগও আছে। আবার বুথের পানি খেয়ে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগও আছে। ছয় এটিএম বুথের পানির বিশুদ্ধতা নিয়েও আছে সংশয়। সব মিলে মুখ থুবড়ে পড়েছে এটিএম বুথ সেবা। অনেকের মতে ছয় বুথ শো পিস হিসেবেই টিকে আছে।
বাজারে চড়া দামে বিশুদ্ধ পানি সাধারণ গ্রাহকরা কিনতে পারে না। আবার ওয়াসার লাইনের পানি ব্যবহার করা নিয়েও আছে নানা অভিযোগ। ওয়াসার সরবরাহ করা পানি সরাসরি পান করা যায় না। লাইনের পানি পানে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ বহু পুরোনো। মূলত এই বিষয়টি মাথায় রেখে চট্টগ্রাম ওয়াসা পানির এটিএম বুথ স্থাপন কাজে হাত দেয়। কিন্তু ৬০ বর্গমাইলের প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ বাসিন্দার জন্য মাত্র ছয়টি এটিএম বুথ স্থাপন করা হয়। অন্তত ৫০০ এটিএম বুথের প্রয়োজন হলেও আছে নামেমাত্র বুথ। এতে বাস্তবে নগরবাসীর সুপেয় পানির সংকট মেটেনি। সস্তায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এটিএম বুথ সুবিধা সীমিত থাকায় বাজারে দেদার বিক্রি হচ্ছে নানা ব্র্যান্ডের বিশুদ্ধ পানির প্লাস্টিক বোতল। এটিএম বুথের পরিষেবা সম্প্রসারণ হয়নি। আবার পানির মান নিয়েও আছে প্রশ্ন। এই সুযোগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা বাড়ছে। নগরবাসীর অনেকেই জানেই না এটিএম বুথ থেকে সস্তায় বিশুদ্ধ পানি কেনা যায়।
ওয়াসা সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীতে প্রথমবারের মতো শুরু হয় ‘ওয়াটার এটিএম বুথ’ পরিষেবা। বুথের কোনটিতে লেখা ‘পানির এটিএম বুথ’। আবার কোনোটিতে লেখা ‘ওয়াটার এটিএম বুথ’। এসব বুথে কার্ড চেপে পানি বের করা যায়। গ্রাহকরা পরিমাণ মতো পানি নিতে পারেন জার, প্লাস্টিক বোতল, কলসিতে। শুরুতে বুথের পানির দামও কম ছিল। লিটার ৫০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে দাম।
এখন বুথের প্রতি লিটার পানির দাম ৮০ পয়সা। দাম বাড়ালেও বেসরকারি পর্যায়ে বাজারজাত করা পানির চেয়ে বুথের পানির দাম অনেক কম। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আধা লিটার পানির দামই ২০ টাকা। দাম কম হওয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ওয়াসার পানির বুথ। তবে বারবার পানির দাম বাড়ানোর কারণে বুথ থেকে পানি কেনা কমিয়ে দিয়েছেন গ্রাহকরা। আবার বুথে পানি নিতে আসা লোকজন নানা বিড়ম্বনায় পড়েন। সার্ভিস দেওয়ার লোকজনও ঠিকমতো কাজ করে না। তাই একেকটি এরপর এটিএম বুথ ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে দিন দিন কমছে বুথের জনপ্রিয়তা।
এটিএম বুথ তদারকির দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রাম ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী রিচার্ড নেলচন পিয়ারু সময়ের আলোকে বলেন, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছয়টি এটিএম বুথ পরিচালনা করছে। সবগুলো চালু আছে এবং ভালো সার্ভিস দিচ্ছে। আমরা চাহিদা অনুযায়ী আরও এটিএম বুথ চালুর চিন্তভাবনা করছি।
এটিএম বুথ কারা পরিচালনা করছে এবং সেবা নিয়ে অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ড্রিঙ্কওয়েল নামে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। তারা বুথের সরঞ্জাম কারিগরি বিষয় পানি সরবরাহের তদারকি সবই করছে। চট্টগ্রাম ওয়াসা কেবল ওই প্রতিষ্ঠানকে বুথ স্থাপনের জন্য জমি দিয়েছে। পাশাপাশি সেবার কাজ মনিটর করে ওয়াসা।
ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে বলেন, বেসরকারি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ড্রিঙ্কওয়েলের কাছে আমরা প্রতি এক হাজার লিটার পানি ৩৭ টাকায় বিক্রি করি। ভ্যাটসহ এক হাজার লিটারের দাম পড়ে ৪০ টাকা। তবে তারা গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি লিটার পানি বিক্রি করে নিজেদের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের কাছে কত দামে বিক্রি করে তা অবহিত নয়।
ওয়াসার বাণিজ্য বিভাগ সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি খুলশী এলাকায় প্রথম ওয়াটার এটিএম বুথ চালু করা হয়। এরপর দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটি নগরীর মাত্র ৬টি এলাকায় এই সেবা চালু করতে পেরেছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পটি শুরুর সময় চট্টগ্রাম ওয়াসা ১০০টি ওয়াটার এটিএম বুথ স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি ড্রিঙ্কওয়েলের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছিল। এরই মধ্যে ছয় বছর পার হয়ে গেলেও সেই ছয় এটিএম বুথই আছে। নতুন করে কোনো ওয়াটার এটিএম বুথ চালু হয়নি। অথচ ছয় বছরে অন্তত কয়েক লাখ গ্রাহক বেড়েছে ওয়াসার।
২০২৩ সালের ১ আগস্ট থেকে ওয়াসার এটিএম বুথের পানির দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। আগে প্রতি লিটার পানির দাম ছিল ৪০ পয়সা। আর এখন গ্রাহকের খরচ হচ্ছে ৮০ পয়সা করে। প্রতি লিটার পানির দর ৭০ পয়সা ধার্য হলেও সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১০ পয়সা ভ্যাট। সব মিলে বর্তমানে এক লিটার পানি নিতে গ্রাহকদের এক টাকার কাছাকাছি পড়ে।
ওয়াসার সংশ্লিষ্টরা জানায়, পাইলট প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি খুলশী ১ নম্বর সড়ক এলাকায় প্রথম ওয়াটার এটিএম বুথ চালু করা হয়। পর্যায়ক্রমে নগরীর ফিরোজ শাহ কলোনি, ওয়াসা মোড়, হালিশহর নয়াবাজার, হালিশহর এ ব্লক ও সদরঘাট সাহেব বাজার এলাকায় এই সেবা সম্প্রসারণ করা হয়।
প্রতিটি ওয়াটার এটিএম বুথে দুটি আউটলেট আছে। বুথ থেকে একই সময়ে দুজন পানি নিতে পারেন। প্রতিটি আউটলেটে এটিএম কার্ড ব্যবহারের ব্যবস্থা আছে। নির্ধারিত মেশিনে কার্ড রাখার সঙ্গে সঙ্গে পাইপ দিয়ে পানি আসতে শুরু করে। একটি যন্ত্রের মাধ্যমে ওয়াসার পানি বিশুদ্ধ হয়ে এখানে আসে। পুরো প্রক্রিয়াটি কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত।
শুক্রবার বেলা ৩টায় সরেজমিন ওয়াসা ভবনের কাছের এটিএম বুথ ঘুরে দেখা যায়, বুথটি বন্ধ। শার্টার লাগানো পুরো বুথে। সিকিউরিটির দায়িত্ব পালন করা কাউকে পাওয়া যায়নি। দুপুর ১২টায় বুথ বন্ধ করে চলে গেছেন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা। আশপাশের লোকজন জানান, শুক্রবার প্রতিদিন এক বেলা চালু থাকে। দুপুর ১২টার পরপরই বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনেকে পানি নিতে এসে ফিরে যান।
বুথ এলাকার বাসিন্দারা জানান, চাহিদা অনুযায়ী পানি মেলে না। আবার কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে বন্ধ থাকে পানি গ্রহণ। খোদ ওয়াসা ভবনের সামনের এটিএম বুথের বেহাল দশা। বাকি পাঁচ বুথে আরও করুণ অবস্থা।
গ্রাহকদের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে এটিএম বুথ পরিচালনাকারী ড্রিঙ্কওয়েলের হট নম্বরে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, বিষয়টি নিয়ে কর্মকর্তারা ফোন করে জানাবেন। আমরা শুধু এটিএম বুথের অভিযোগ সম্পর্কে গ্রাহকদের তথ্য সংগ্রহ করি। বৃহস্পতি ও শুক্রবার আরও দুবার হট লাইনে যোগাযোগ করা হলেও কেউ কোন তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ওয়াসার এটিএম বুথের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ। নগরীর খুলশী এলাকা থেকে বেশি অভিযোগ এসেছে আমাদের কাছে। আসলে এটিএম বুথে মানুষ সেবা পায় না। নতুন প্রযুক্তির পানি সরবরাহ প্রক্রিয়া সম্পর্কে গ্রাহকরা বেশি অবহিত নন। কারা পরিচালনা করে আমরাও তাদের চিনি না গ্রাহক কীভাবে চিনবে। ওয়াসার তদারকি ঠিকমতো না থাকায় এটিএম বুথের সেবা এখনো লাভজনক বা জনপ্রিয় হতে পারেনি।
সময়ের আলো/ প্রিন্ট/কেএইচও