বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন আজ এক বিরাট শূন্যতার মুখোমুখি। বাংলা একাডেমির সভাপতি, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যসমালোচক, শিক্ষক ও রাষ্ট্রচিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই। রোববার রাজধানীর মিরপুরে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তার মৃত্যু শুধু একজন মানুষের বিদায় নয়; এটি এমন এক মননের প্রস্থান, যিনি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের সাহিত্য, সমাজ, ইতিহাস ও রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম নির্ভরযোগ্য কণ্ঠ হয়ে ছিলেন।
আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন বিরলপ্রজ এক বুদ্ধিজীবী। তিনি কখনো প্রচারের ঝলকানির পেছনে ছোটেননি, বরং যুক্তি, গবেষণা ও বিবেককে আশ্রয় করে সমাজের গভীরতম প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে সচেষ্ট ছিলেন। তার লেখায় যেমন ছিল ইতিহাসের নির্মোহ পাঠ, তেমনি ছিল মানুষের মুক্তি, ন্যায়বিচার এবং সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার চিন্তার স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক শক্তির ওপর ভর করে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের জন্ম ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পাকুন্দিয়া গ্রামে। তিনি ১৯৬২ সালে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৬৫ সালে স্নাতক ও ১৯৬৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানে যোগ দেন ১৯৭২-এ। অবসরে যান ২০১১ সালের ৩০ জুন। একই বিভাগে সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন ২০১১-১৫ সাল পর্যন্ত। বিভাগের আহমদ শরীফ চেয়ার পদে নিয়োজিত ছিলেন দুই বছর (২০২১-২৩)।
দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শুধু সাহিত্য নয়, চিন্তা করার পদ্ধতিও শিখিয়েছেন এই বিদ্বজন। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন কঠোর যুক্তিনিষ্ঠ, কিন্তু মানবিক; গবেষক হিসেবে ছিলেন নিরলস; আর লেখক হিসেবে ছিলেন স্বতন্ত্র ও নির্ভীক।
সক্রিয় রাজনীতিও করেছেন একসময় আবুল কাসেম ফজলুল হক। শুরুটা হয়েছিল ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির মাধ্যমে। গত শতকের ছয়-এর দশকের শেষ দিকে যুক্ত হন মার্ক্সবাদী ধারার রাজনীতিতে।তখনকার প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন সামনের সারিতে। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তবে তার জীবনের রাজনৈতিক পর্ব দীর্ঘ হয়নি। একসময় স্বেচ্ছায় যতি টেনে মার্ক্সবাদী রাজনীতির সব সাংগঠনিক সংযোগ থেকে দূরে সরে যান। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পরে তিনি সক্রিয় রাজনীতি করেননি। তবে রাজনীতি থেকে বিযুক্তও হননি। তার লেখায় রাজননৈতিক চেতনা ছিল প্রখর।
বাংলা সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি, দর্শন ও ইতিহাস নিয়ে তার প্রবন্ধগুলো বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, উনিশ শতকের নবজাগরণ, ভাষা আন্দোলন, জাতীয়তাবাদ, মধ্যবিত্তের বিকাশ এবং রাষ্ট্র ও সমাজের নানা সংকট নিয়ে গভীর বিশ্লেষণধর্মী কাজ করেছেন। তার লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল- আবেগ নয়, যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে সত্যকে অনুসন্ধান করার চেষ্টা।
তিনি শুধু লেখক ছিলেন না; ছিলেন একজন সক্রিয় সাংস্কৃতিক চিন্তকও। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। রাষ্ট্রভাষা বাংলার সর্বস্তরে ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রশ্নে তিনি দীর্ঘদিন সোচ্চার ছিলেন। ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট এবং আপসহীন।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের ব্যক্তিজীবনও ছিল গভীর বেদনায় স্পর্শিত। ২০১৫ সালে উগ্রপন্থিদের হাতে নিহত প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন ছিলেন তার সন্তান। সেই ব্যক্তিগত শোককে তিনি কখনো ঘৃণার ভাষায় রূপ দেননি; বরং সমাজে যুক্তি, সহনশীলতা ও মানবিকতার প্রয়োজনীয়তার কথাই আরও জোরালোভাবে উচ্চারণ করেছেন। এই সংযম ও নৈতিক দৃঢ়তাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
তিনি ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি লেখালেখি, গবেষণা এবং সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। তার মৃত্যুতে দেশের সাহিত্যিক, শিক্ষক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোক নেমে এসেছে। বিভিন্ন মহল তার অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে।
আবুল কাসেম ফজলুল হক আমাদের শিখিয়েছেন, একজন বুদ্ধিজীবীর প্রকৃত শক্তি তার স্বাধীন চিন্তায়, নৈতিক সাহসে এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতায়। ক্ষণিকের জনপ্রিয়তার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী মননই যে একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ, তার জীবন সেই সত্যের উজ্জ্বল উদাহরণ।
তিনি চলে গেলেন। কিন্তু তার লেখা, চিন্তা, প্রশ্ন এবং তার বুদ্ধিবৃত্তিক সততা বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের মননজগতে বহুদিন আলো ছড়াবে। সময়ের স্রোতে মানুষ হারিয়ে যায়, কিন্তু যারা জাতির চিন্তার ভিত নির্মাণ করেন, তারা তাদের কর্মের মধ্যেই বেঁচে থাকেন। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক তেমনই একজন মানুষ- যার প্রস্থান অপূরণীয়, আর উত্তরাধিকার অনিঃশেষ।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক মূলত প্রাবন্ধিক, সাহিত্য-সমালোচক, সমাজচিন্তক ও রাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিত। তার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ইতিহাস, সাহিত্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে একই বৌদ্ধিক পরিসরে বিচার করা। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- মুক্তির সংগ্রাম (১৯৭২), একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন (১৯৭৬), উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণি ও বাংলা সাহিত্য (১৯৭৯) বাংলা সাহিত্য-গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।
মানুষ ও তার পরিবেশ (১৯৮৮), মাও সেতুং-এর জ্ঞানতত্ত্ব (১৯৮৭), রাজনীতি ও দর্শন (১৯৮৯), বাংলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা (১৯৯৭), সাহিত্যচিন্তা (১৯৯৫), সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে (২০০২), কালের যাত্রার ধ্বনি (২০০৪), শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ (২০১১) তার নির্বাচিত প্রবন্ধের সংকলন।
তিনি দার্শনিক বারট্রান্ড রাসেলের গুরুত্বপূর্ণ দুটি বই বাংলায় অনুবাদ করেন- রাজনৈতিক আদর্শ, নবযুগের প্রত্যাশা।
সম্পাদক হিসেবেও তার অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি ১৯৮২ সাল থেকে সাহিত্য পত্রিকা ‘লোকায়ত’ সম্পাদনা করেছেন। এটি বাংলাদেশের চিন্তাশীল প্রবন্ধচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে পরিচিত।
পুরস্কার
আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। তার অর্জনের ঝুড়িতে আরও রয়েছে অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ লেখক শিবির হুমায়ুন কবির স্মারক পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার। ‘লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার’ পান কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাকেন্দ্র থেকে।
চিরশয়ান বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে, প্রধানমন্ত্রীর শোক : এদিকে আবুল কাসেম ফজলুল হকে চিরশয়ান হবে মিরপুরের শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। রোববার দুপুরে পরিবারের সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন আবুল কাসেম ফজলুল হক। দ্রুত একটি ক্লিনিকে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের মেয়ে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শুচিতা শারমিন সাংবাদিকদের জানান, সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত তার বাবার কফিন রাখা হবে তার সবশেষ কর্মস্থল বাংলা একাডেমিতে।
এরপর সবার শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে রাখা হবে আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহ। দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত রাখা হবে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে।
এরপর জোহরের নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে আবুল কাসেম ফজলুল হকের জানাজা হবে। এক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, জানাজা শেষে মিরপুরের শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হবে।
এদিকে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে দেশ একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও লেখককে হারাল। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে দেশের শিক্ষা অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের রুহের মাগফিরাত ও চিরশান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শাইরুল কবির খান।
এ ছাড়া অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিএনপির মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকেও তার মৃত্যুতে শোক জানানো হয়েছে।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়াত সভাপতির আত্মার শান্তি কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে।
অন্যদিকে শোক প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল, জাতীয় কবিতা পরিষদ, থিয়েটার পত্রিকা ক্ষ্যাপা।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল। রোববার এক শোক বার্তায় জানানো হয়।
সময়ের আলো/এসএকে