বাগেরহাটের ফকিরহাটে ভৈরব নদ পুনঃখননে সরকারের ব্যয় হয়েছিল ২৩ কোটি টাকা। লক্ষ্য ছিল নদের নাব্যতা ফিরিয়ে এনে জলাবদ্ধতা দূর করা এবং নৌপথ সচল করা। কিন্তু খননের মাত্র ছয় মাসের মাথায় পলি জমে নদীটি আবার ভরাট হয়ে গেছে, বন্ধ হয়ে গেছে নৌ চলাচল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খুলনা ওয়াসা কর্তৃক নদের মাঝ বরাবর স্থাপিত পাইপলাইন এবং তা রক্ষায় নির্মিত লোহার কাঠামোর কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। এদিকে বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রের দাবি, এসব স্থাপনা নির্মাণের জন্য ওয়াসা তাদের কাছ থেকে কোনো অনুমতি বা ছাড়পত্র নেয়নি।
বাগেরহাট পাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মিরাজ মোল্লা জানান, প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী নদে অন্য কোনো সংস্থা কর্তৃক স্থাপনা নির্মাণ বা পাইপলাইন স্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ফকিরহাটের ভৈরব নদের মাঝখান দিয়ে খুলনা ওয়াসা পাইপলাইন ও লোহার কাঠামো স্থাপনের ক্ষেত্রে এমন কোনো অনুমতি নেয়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই জাইকার অর্থায়নে খুলনা মহানগরীতে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য মোল্লাহাট উপজেলার মধুমতি নদী থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপন প্রকল্প শুরু হয়। ভৈরব নদ অতিক্রমের সময় পাইপলাইনটি নদের তলদেশ দিয়ে না নিয়ে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মাঝ বরাবর (সরাসরি পানির ওপর দিয়ে) স্থাপন করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা তখনই এর তীব্র বিরোধিতা করলেও কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয়নি।
পাইপলাইনটি স্থাপনের পর নদের স্বাভাবিক স্রোত কমে গিয়ে দ্রুত পলি জমতে শুরু করে এবং বর্ষা মৌসুমে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে ফকিরহাট ও আশপাশের এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নৌপথ সচল রাখতে ২০২০-২১ অর্থবছরে পানি উন্নয়ন বোর্ড ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ভৈরব নদের প্রায় সাড়ে ১৭ কিলোমিটার এলাকা পুনঃখনন করে। ৯১ ফুট প্রশস্ত ও ১৬ ফুট গভীরতার এই খননকাজ করার পরও কোনো সুফল মেলেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুনঃখননের পর নদের স্রোতের গতি বাড়লে ২০২১ সালের জুলাই মাসে পাইপলাইন রক্ষার্থে ওয়াসা নদের ভেতর আড়াআড়িভাবে লোহার খুঁটি ও বেষ্টনী নির্মাণ করে। এমনকি পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এই অজুহাতে ওই নদে ট্রলার চলাচল নিষিদ্ধ করে সতর্কতার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয় ওয়াসা। সাড়ে পাঁচ ফুট উঁচু পাইপের কারণে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই নদে পলি জমে এটি একটি সরু নালায় পরিণত হয়েছে।
নদের এই দুরবস্থার কারণে পুনঃখননে ব্যয় হওয়া সরকারের ২৩ কোটি টাকা কার্যত ভেস্তে গেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের কাঁঠালতলা সেতুর নিচে নদের মাঝ বরাবর স্থাপিত পাইপলাইনটি এখনো আগের অবস্থানেই রয়েছে। লোহার বেষ্টনীর কারণে কোনো নৌযান চলাচল করতে পারছে না। নদের বিস্তীর্ণ অংশে এখন ঝোপঝাড় গজিয়ে উঠেছে।
পাইপলাইন স্থাপনের আট বছর পার হলেও সেটি নদের তলদেশে স্থানান্তর বা পুনঃস্থাপনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ফলে উপজেলার প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার মানুষ বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। এতে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় কৃষি, মৎস্য ও ব্যবসা-বাণিজ্য।
নদের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের কাঁঠালতলা সেতুর নিরাপত্তা নিয়েও বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের এক দায়িত্বশীল প্রকৌশলী জানান, পাইপলাইনের কারণে ওই স্থানে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে নদের তলদেশ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। এতে সেতুর ভিত্তির (ফাউন্ডেশন) সুরক্ষায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং কয়েকটি স্থানে ইতোমধ্যে ক্ষয়ের চিহ্ন দেখা দিয়েছে।
ফকিরহাট বাজারের ব্যবসায়ী মুকুন্দ পাল বলেন, নৌচলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। নদীপথ সচল থাকলে খুলনা, মোংলা বন্দর, বাগেরহাট ও বরিশালের সঙ্গে অনেক কম খরচে পণ্য আনা-নেওয়া করা যেত।
বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল বলেন, আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। তবে শুনেছি পাইপটি সরিয়ে নিতে অথবা নদের তলদেশে স্থানান্তরের বিষয়ে ওয়াসা ও জেলা প্রশাসনকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আমি আবারও সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠি দেব।
যোগাযোগ করা হলে খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহ বলেন, বর্তমান অবস্থান থেকে পাইপলাইনটি নদের তলদেশে স্থানান্তরের জন্য প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে প্রস্তাব করা হয়েছে। কাজ শুরু হলে পাইপটি স্থানান্তরের কাজও করা হবে। তবে প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজ কবে নাগাদ শুরু হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি।
স্থানীয় ভুক্তভোগী জনগণের দাবি, দীর্ঘ আট বছর ধরে কেবল আশ্বাসের বাণীই শোনানো হচ্ছে, বাস্তবে কোনো সমাধান হয়নি। ভৈরব নদকে বাঁচাতে এবং ১ লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে অবিলম্বে পাইপলাইনটি নদের তলদেশে স্থানান্তর করে স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার প্রবাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সময়ের আলো/জোই