প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১২:৩৭ এএম আপডেট: ১০.০৭.২০২৬ ১২:৩৯ এএম
জামিল মিগদাদ। ছবি : সংগৃহীত যুদ্ধের বিভীষিকায় যখন গাজা উপত্যকা বিপর্যস্ত। এমন সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক অসাধ্য সাধনে মগ্ন সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ জামিল মিগদাদ। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর, লাঠিতে ভর দিয়ে চলতে হয় তাকে। কিন্তু এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা তার অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মেনেছে। গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা পবিত্র কোরআন শরীফের পাতাগুলো যত্নসহকারে কুড়িয়ে আনেন তিনি। এরপর নিজ হাতে সেগুলো মেরামত করে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করে তোলেন এই নিভৃতচারী মানুষ।
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় জামিল মিগদাদের এই মহৎ উদ্যোগ এখন অনেকের কাছেই আশার আলো। তিনি জানান, মূলত নিজের সংগ্রহে থাকা কোরআন মেরামতের মাধ্যমেই এই কাজ শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে স্থানীয়রা যখন দেখেন যে তিনি পরম মমতায় ক্ষতিগ্রস্ত কোরআনগুলো নতুন রূপ দিচ্ছেন, তখন তারাও নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত বইগুলো তার কাছে নিয়ে আসতে শুরু করেন। মানুষের এই আস্থা তাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করছে।
জামিল মিগদাদ বলেন, আমার বয়স এখন ৭০ বছর। আগের মতো শারীরিক পরিশ্রম করার শক্তি আর নেই। তবুও এই কাজে আমি প্রশান্তি খুঁজে পাই। মানুষ এখন দূর-দূরান্ত থেকে তাদের ঘরবাড়ি বা বিধ্বস্ত মসজিদ থেকে উদ্ধার করা ক্ষতিগ্রস্ত কোরআন নিয়ে আমার কাছে আসে। আমি সেগুলো সাধ্যমতো মেরামত করার চেষ্টা করি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই দুর্দিনে যখন সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকাই কঠিন, তখন তিনি এই সেবামূলক কাজের জন্য কারো কাছ থেকেই কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না। পরম শ্রদ্ধার সাথে তিনি বলেন, এটি তার ইবাদতের অংশ।
তবে বর্তমান পরিস্থিতির কারণে কাজটি মোটেও সহজ নয়। প্রয়োজনীয় উপকরণের তীব্র সংকট এখন তার কাজের পথে বড় বাধা। তিনি জানান, বই বাঁধাইয়ের জন্য আঠা, কার্ডবোর্ড বা চামড়ার মতো সাধারণ উপকরণগুলো এখন বাজারে পাওয়া দুষ্কর। যা-ও বা পাওয়া যায়, সেগুলোর দাম যুদ্ধের আগের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ গুণ বেড়ে গেছে। এই অভাবের মধ্যেও তিনি থেমে নেই, সীমিত সম্পদ দিয়েই চালিয়ে যাচ্ছেন তার এই পবিত্র লড়াই।
গাজার ধর্মীয় বিষয়ক ওয়াক্ফ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলমান সংঘাতে উপত্যকার এক হাজার ২৭৫টি মসজিদের মধ্যে এক হাজার ৫০টি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ১৯১টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মসজিদগুলোর সাথে সাথে অগুনতি পবিত্র কোরআনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জামিল মিগদাদের এই উদ্যোগ যেন সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলোকে রক্ষা করার এক নীরব প্রচেষ্টা।
যুদ্ধের বিভীষিকা যেখানে মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে, সেখানে জামিল মিগদাদের এই নিবেদিতপ্রাণ কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ধ্বংসের মাঝেও টিকে থাকে বিশ্বাস এবং ভালোবাসার শক্তি। গাজার এই বৃদ্ধ কারিগর কেবল কোরআনই মেরামত করছেন না, তিনি মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যাওয়া বিশ্বাসের শিখাটিকেও জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
সময়ের আলো/আআ