যেখানে রাজনীতি থামে, ফুটবল কথা বলে

ক্রীড়া ডেস্ক

খেলা

ফুটবল কখনো শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। কখনো এটি ইতিহাসের প্রতিধ্বনি, কখনো রাজনীতির ছায়া, কখনো আবার বিভক্ত মানুষকে এক পতাকার

2026-07-10T01:26:54+00:00
2026-07-10T01:26:54+00:00
 
  শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬,
২৬ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
খেলা
মুখোমুখি স্পেন ও বেলজিয়াম
যেখানে রাজনীতি থামে, ফুটবল কথা বলে
ক্রীড়া ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১:২৬ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
ফুটবল কখনো শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। কখনো এটি ইতিহাসের প্রতিধ্বনি, কখনো রাজনীতির ছায়া, কখনো আবার বিভক্ত মানুষকে এক পতাকার নিচে দাঁড় করানোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। স্পেন ও বেলজিয়ামের গল্প ঠিক তেমনই। একসময় কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল হয়েছিল স্পেন। বার্সেলোনার রাজপথ থেকে সেই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল ফুটবল মাঠেও।

অন্যদিকে ভাষা ও পরিচয়ের প্রশ্নে বছরের পর বছর ফ্লেমিশ ও ওয়ালুন জনগোষ্ঠীর টানাপোড়েনে বিভক্ত ছিল বেলজিয়াম। কিন্তু জাতীয় দলের জার্সি গায়ে উঠলেই সব বিভাজন হারিয়ে যায়। তখন সবাই শুধু স্প্যানিয়ার্ড, সবাই শুধু বেলজিয়ান। ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন ও বেলজিয়ামের লড়াই কেবল দুই দলের নয়; এটি বিভাজনের ইতিহাস পেরিয়ে ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠা দুই জাতিরও লড়াই।

বর্তমান ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে স্পেন রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে, আর বেলজিয়াম নবম। তবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে র‌্যাঙ্কিংয়ের হিসাব খুব কমই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে। এখানে পার্থক্য গড়ে দেয় মানসিক দৃঢ়তা, মুহূর্তের সিদ্ধান্ত আর চাপের মধ্যে নিজের সেরাটা তুলে ধরার সামর্থ্য। লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে এবার যেন নতুন এক স্পেনকে দেখছে বিশ্ব। গ্রুপ এইচের শীর্ষ দল হিসেবে নকআউটে ওঠার পর রাউন্ড অব ৩২-এ অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেয় লা রোহা। এরপর শেষ ষোলোতে অপেক্ষা করছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পর্তুগাল।

গত বছরের উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার মঞ্চও ছিল সেটি। দীর্ঘ সময় গোলশূন্য লড়াইয়ের পর ম্যাচের শেষ দিকে মিকেল মেরিনোর গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় স্পেন। এই জয় শুধু সেমিফাইনালের পথে আরেকটি ধাপ নয়, বরং তাদের ধারাবাহিকতারও প্রতিচ্ছবি। পুরো টুর্নামেন্টে এখনও একটিও গোল হজম করেনি স্পেন।

বিশ্বকাপে টানা ছয়টি ক্লিন শিট রেখে তারা গড়েছে নতুন ইতিহাস। প্রতিপক্ষকে টানা ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় গোল করতে না দেওয়ার এই কীর্তিই বলে দেয়, দে লা ফুয়েন্তের দল কতটা সংগঠিত। প্রায় ১৬ বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সেই ঐতিহাসিক গোলে প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন। এবারও তারা দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের দোরগোড়ায়। আর মাত্র তিনটি জয় তাদের এনে দিতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বড় টুর্নামেন্টের নকআউটে এখনও শতভাগ সফল স্পেনকে তাই অনেকেই এবারের অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে দেখছেন।

তবে বেলজিয়ামও এসেছে নতুন রূপে। কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন ‘গোল্ডেন জেনারেশন’-এর গল্প শেষ। কিন্তু রুডি গার্সিয়ার অধীনে যেন নতুন জীবন পেয়েছে রেড ডেভিলস। টানা ১৮ ম্যাচ অপরাজিত থেকে তারা আবারও বিশ্বকাপের শেষ আটে জায়গা করে নিয়েছে। গ্রুপ জি-এর শীর্ষ দল হলেও শুরুতে খুব একটা ছন্দে ছিল না বেলজিয়াম। নকআউটে এসে বদলে যায় তাদের চেহারা।

রাউন্ড অব ৩২-এ সেনেগালের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করে জয় তুলে নেয় তারা। অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে অধিনায়ক ইউরি তিলেমান্সের গোল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম দেরিতে করা জয়সূচক গোল হিসেবে জায়গা করে নেয়।

এরপর স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে আরও বড় চমক দেন কোচ রুডি গার্সিয়া। কেভিন ডি ব্রুইন, জেরেমি ডোকু ও রোমেলু লুকাকুর মতো তারকাদের বেঞ্চে রেখেও দল সাজান তিনি। তার সেই সাহসী সিদ্ধান্ত সঠিক প্রমাণ করেন চার্লস ডি কেটেলারে। জোড়া গোল করেন তিনি, হান্স ভানাকেন যোগ করেন আরেকটি, আর বদলি হিসেবে নেমে টানা তৃতীয় ম্যাচে গোল করেন লুকাকু। শেষ পর্যন্ত ৪-১ ব্যবধানে দুর্দান্ত জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে বেলজিয়াম।

তবে বড় ম্যাচের আগে দুশ্চিন্তাও আছে। মিডফিল্ডার আমাদু ওনানার ডান হাঁটুর এসিএল ছিঁড়ে যাওয়ায় বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে তার। মাঝমাঠে তার অনুপস্থিতি স্পেনের মতো বল দখলে দক্ষ দলের বিপক্ষে বড় ক্ষতি হয়ে উঠতে পারে। দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। সব মিলিয়ে ২৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে স্পেনের জয় ১২টি, বেলজিয়ামের ৫টি এবং ড্র হয়েছে ৬টি। ১৯৮০ সালের ইউরোর পর থেকে শেষ ১১ দেখায় ৯টিতেই জয় পেয়েছে স্পেন। তবে বিশ্বকাপের স্মৃতি বেলজিয়ামের পক্ষেই। ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে স্পেনকে বিদায় করে শেষ চারে উঠেছিল রেড ডেভিলস। প্রায় চার দশক পর সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে চায় তারা।

স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে মনে করেন, নকআউটের প্রতিটি ম্যাচই নতুন পরীক্ষা। তার ভাষায়, বেলজিয়ামের মতো প্রতিপক্ষকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে রুডি গার্সিয়া বলেছেন, স্পেন টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা দল হলেও তার খেলোয়াড়দের মধ্যে ভয় নেই; বরং তারা নিজেদের সামর্থ্যে বিশ্বাসী। 

এই ম্যাচে সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে লামিনে ইয়ামালের ওপর। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই ইউরোপের সবচেয়ে ভয়ংকর উইঙ্গারদের একজন হয়ে উঠেছেন তিনি। তার গতি, ড্রিবলিং ও সৃজনশীলতা প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বারবার বিপদে ফেলছে। মাঝমাঠে রদ্রি ও ফ্যাবিয়ান রুইজের নিয়ন্ত্রণ স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি। সামনে গোলের দায়িত্বে থাকবেন মিকেল ওইয়ারসাবাল।

অন্যদিকে বেলজিয়ামের আশা কেভিন ডি ব্রুইনের অভিজ্ঞতা, চার্লস ডি কেটেলারের দুর্দান্ত ফর্ম, রোমেলু লুকাকুর গোল করার সহজাত ক্ষমতা এবং গোলবারের নিচে থিবো কোর্তোয়ার বিশ্বমানের উপস্থিতি। কৌশলগতভাবেও এটি হতে যাচ্ছে দুই ভিন্ন দর্শনের লড়াই। স্পেন বলের দখল রেখে ধৈর্যের সঙ্গে আক্রমণ গড়ে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তুলতে চায়।

বিপরীতে বেলজিয়াম দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাকে প্রতিপক্ষকে শাস্তি দিতে অভ্যস্ত। তাই মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণভাগের শৃঙ্খলা এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কে পাবে সেমিফাইনালের টিকেট। একটি মুহূর্ত, একটি ভুল কিংবা একজন খেলোয়াড়ের অসাধারণ নৈপুণ্যই বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের ভাগ্য।

সময়ের আলো/আআ


  বিষয়:   রাজনীতি  ফুটবল  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: