মানুষ মাত্রই সৌন্দর্যপিপাসু। সেই পিপাসা মেটাতে প্রকৃতির কাছেই ছোটে মানুষ। কখনো চড়ে পাহাড়ে, কখনো জঙ্গলে। আবার কখনোবা সাগর-নদী-হাওড়ে ভ্রমণ করে। এখন বর্ষাকাল। আর বর্ষাকাল মানেই পানিতে ভ্রমণ, আর পানিতে ভ্রমণ মানেই হাওড়ের টান।
সেই টানকে আরও সহজ ও সাশ্রয়ী করতে বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের শৈলপ্রপাত হলে শুরু হয়েছে তিন দিনের দ্বিতীয় বাংলাদেশ হাউসবোট ফেয়ার-২০২৬। হাউসবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ আয়োজিত এই মেলায় এক ছাদের নিচে মিলছে দেশের শতাধিক হাউসবোট প্রতিষ্ঠানের প্যাকেজ, থাকছে বিশেষ মূল্যছাড় ও আগাম বুকিংয়ের সুযোগ।
শুধু পর্যটন নয়, হাওড়ের পরিবেশ রক্ষা করেই টেকসই জলভিত্তিক পর্যটন গড়ে তোলার বার্তাও দিচ্ছেন আয়োজকরা। শুরুর দিনই স্টলগুলোতে পর্যটকদের ভিড় দেখা যায়।
এবারের মেলার টাইটেল স্পন্সর হিসেবে রয়েছে ‘দ্য হাওড় সেইল’ এবং ‘পাওয়ারড বাই ঘুরিং ফিরিং’। আয়োজনে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। এ ছাড়া মেলার মিডিয়া পার্টনার হিসেবে যুক্ত রয়েছে দৈনিক সময়ের আলো ও দৈনিক ইত্তেফাক।
আয়োজকরা বলছেন, তিন দিনব্যাপী হাউসবোট মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অংশ নিয়েছে শতাধিক হাউসবোট প্রতিষ্ঠান। টাঙ্গুয়ার হাওড়, কাপ্তাই লেক, পদ্মাসহ দেশের জলভিত্তিক পর্যটনকে আরও জনপ্রিয় করতে আয়োজন করা হয়েছে এই মেলার। দর্শনার্থীরা সরাসরি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে প্যাকেজ, নিরাপত্তা, খাবার, ভ্রমণপথ ও বুকিং-সংক্রান্ত তথ্য জেনে নিজের পছন্দের হাউসবোট বেছে নিতে পারছেন। মেলা উপলক্ষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে থাকছে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড়ও।
আয়োজকরা জানান, বর্ষা এলেই প্রাণ ফিরে পায় দেশের হাওড়াঞ্চল। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার কিংবা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা- যেখানেই যান, চারদিকে বিস্তীর্ণ জলরাশি আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। বিশেষ করে সুনামগঞ্জে এখন আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন নানা ধরনের হাউসবোটে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। চলতি মৌসুমে নন-এসি হাউসবোটে জনপ্রতি ভাড়া চার হাজার থেকে আট হাজার টাকা। আর এসি হাউসবোটে জনপ্রতি খরচ হবে ৮ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকা। সাধারণত এই প্যাকেজে দুদিন এক রাতের ভ্রমণ এবং পাঁচ বেলার খাবার অন্তর্ভুক্ত থাকে।
একটি হাউসবোটে সাধারণত ৬ থেকে ১২টি কেবিন থাকে। প্রতিটি কেবিনে দুই থেকে তিনজন থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। পুরো কেবিন বুক করলে অনেক প্রতিষ্ঠান কিছুটা ছাড়ও দিয়ে থাকে। এ ছাড়া কাপ্তাই লেক, পদ্মা কিংবা দেশের অন্যান্য নদীভিত্তিক গন্তব্যে আগামী কয়েক মাসের ভ্রমণ আগাম বুকিং দিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা যাবে।
এবারের মেলার বিশেষ আকর্ষণ ১০০ টাকার লটারি কুপন। এই কুপনের মাধ্যমে ৫০ জন বিজয়ী সঙ্গীসহ বিলাসবহুল হাউসবোটে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন বলে জানিয়েছে আয়োজকরা।
গ্রিন হেভেন হাউসবোটের মালিক জানান, এ বোটটি সম্পূর্ণ এসি বোট এবং ম্যানেজমেন্ট গ্রাহকদের সব চাহিদা পূরণে প্রস্তুত রয়েছে। মেলা উপলক্ষে তারা গ্রাহকদের জন্য ২০% ডিসকাউন্ট দিচ্ছে, যাতে মানুষ বাংলাদেশের টাঙ্গুয়ার হাওড়ের মতো সুন্দর জায়গা ভ্রমণে আরও উৎসাহিত হয়। এখন পর্যন্ত মেলায় দর্শনার্থীদের কাছ থেকে বেশ ভালো সাড়া পেয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মেলার প্রথম দিনেই দর্শনার্থীদের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ‘ঘুরিং ফিরিং ট্রাভেল’-এর মালিক সৌরভ ইশতিয়াক।
তিনি বলেন, সকাল থেকেই আমাদের স্টলে অনেক ভ্রমণপ্রেমী আসছেন। তারা বিশেষ করে হাউসবোট ও টাঙ্গুয়ার হাওড় ভ্রমণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অনেকেই বিভিন্ন প্যাকেজ সম্পর্কে তথ্য নিচ্ছেন, আবার অনেকে অগ্রিম বুকিংও সম্পন্ন করছেন। মানুষের মধ্যে এখন হাওড় ভ্রমণ নিয়ে আগ্রহ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
তিনি জানান, ঘুরিং ফিরিং ট্রাভেলের নিজস্ব বহরে বর্তমানে ১০টি হাউসবোট রয়েছে। এর মধ্যে ৭টি নন-এসি এবং ৩টি এসি হাউসবোট।
তিনি বলেন, আমরা দুই সদস্যের ছোট দল থেকে শুরু করে ৫০ সদস্যের বড় গ্রুপের জন্যও সেবা দিতে পারি। আমাদের পুরো ফ্লিটে একসঙ্গে প্রায় ৩০০ পর্যটককে ভ্রমণের সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব।
মেলায় আসা দর্শনার্থী হুমায়ুন কবির বলেন, দেশে দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত এই মেলায় এসে আমার খুব ভালো লাগছে। কারণ এখানে সব হাউসবোটের মালিকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা যাচ্ছে এবং সাধারণ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ডিসকাউন্ট পাওয়া যাচ্ছে। এক ছাদের নিচে অনেক স্টল থাকায় বিভিন্ন বোটের সুযোগ-সুবিধা ও অফার সম্পর্কে সহজেই জানা সম্ভব হচ্ছে।
আরেক দর্শনার্থী মুহিবুল ইসলাম জানান, টাঙ্গুয়ার হাওড় ভ্রমণের উদ্দেশ্যে মেলায় এসে তিনি বিভিন্ন অফার-উপহার পেয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে ‘হাওড় সুলতান’-এর অফার এবং ‘মুসাফির’ থেকে পাঞ্জাবি উপহার। এ ছাড়া গ্রিন হেভেন থেকেও তিনি ২০% ডিসকাউন্ট পেয়েছেন।
তিনি বলেন, অনলাইনে পেমেন্ট করার ক্ষেত্রে অনেক সময় দ্বিধা থাকে, কিন্তু মেলায় এসে সরাসরি পেমেন্ট করলে বিশ্বস্ততা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া যায়।
তিনি সবাইকে অন্তত একবার হলেও দেশের এই সুন্দর জায়গা অর্থাৎ টাঙ্গুয়ার হাওড় ঘুরে দেখার আহ্বান জানান।
সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক তারেকুর রহমান পাপ্পু সময়ের আলোকে বলেন, জলভিত্তিক পর্যটনের প্রসারের পাশাপাশি হাওড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সচেতনতা তৈরি করা এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য। হাউসবোটে ভ্রমণ এখন শুধু বিলাসিতা নয়, বরং প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আর সেই অভিজ্ঞতাকে আরও সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী করতেই এই আয়োজন।
হাউসবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মো. আরাফাত হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, দেশের জলপর্যটন খাত দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পর্যটকদের আধুনিক ও নিরাপদ সেবা নিশ্চিত করতে এবং দেশীয় পর্যটনকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতেই আমাদের এই আয়োজন। আমরা আশা করি, প্রথম মেলার মতো এবারও ভ্রমণপ্রেমীদের কাছ থেকে উপচেপড়া সাড়া পাব।
ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান জানান, এমন আয়োজন দেশের জলভিত্তিক পর্যটন শিল্পকে আরও এগিয়ে নেবে এবং হাওড়াঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বাড়াবে।
সময়ের আলো/আআ