রাজধানীর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিভিন্ন ওয়ার্ডে নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন নগরবাসী। চলতি বছরের ২২ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে এসব কেন্দ্র হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
পরদিন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সিভিল সার্জনদের পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, স্বাস্থ্যসেবাকে এক ছাতার নিচে আনতে নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো আত্তীকরণ করা হবে। কিন্তু এরপর আর কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। হস্তান্তরের পর সিটি করপোরেশনগুলোরও নিষ্ক্রিয়তায় কেন্দ্রগুলো অবহেলায় ধুঁকছে। ফলে সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতাল ও বেসরকারি ক্লিনিকমুখী হচ্ছেন, বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় ও বড় হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর চাপ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় আড়াই কোটি নগরবাসীর জন্য ডিএনসিসির ৩৬টি ও ডিএসসিসির ৩১টি- মোট ৬৭টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। আগে এসব কেন্দ্রের পরিচালনা ব্যয়ের ৫০ শতাংশ আসত সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে, ২৫ শতাংশ করে দিত সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের পর অর্থায়ন ও পরিচালনা নিয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এসব কেন্দ্র থেকে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা, সাধারণ রোগের চিকিৎসাসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কথা থাকলেও জনবল সংকট, চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, ওষুধের অভাব, যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা ও দুর্বল তদারকির কারণে অধিকাংশ কেন্দ্র কার্যকর সেবা দিতে পারছে না।
নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেসব সেবা দেওয়া হয় : মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা : গর্ভবতী মায়েদের প্রাক-প্রসব (এএনসি) ও প্রসবোত্তর (পিএনসি) স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং নিরাপদ প্রসবসেবা।
গর্ভকালীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা : নামমাত্র মূল্যে আল্ট্রাসনোগ্রাম, রক্ত ও প্রস্রাবের বিভিন্ন পরীক্ষা।
সাধারণ চিকিৎসাসেবা : জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়া ও অন্যান্য সাধারণ রোগের চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ।
টিকাদান কর্মসূচি : শিশুদের জন্য ইপিআই টিকাদান কর্মসূচি) অনুযায়ী নিয়মিত টিকা এবং গর্ভবতী মায়েদের টিটেনাস (টিটি) টিকা প্রদান।
পরিবার পরিকল্পনা সেবা : পরিবার পরিকল্পনাবিষয়ক পরামর্শ এবং পিল, কনডম, ইনজেকশনসহ বিভিন্ন জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ।
পুষ্টি ও স্বাস্থ্যশিক্ষা : অপুষ্টিতে ভোগা মা ও শিশুদের পুষ্টিবিষয়ক পরামর্শ, স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং সচেতনতামূলক সেবা।
দ্রুত বর্ধনশীল রাজধানী ঢাকায় জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর বিকল্প নেই। কিন্তু সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, অনেক কেন্দ্রেই রোগীর উপস্থিতি খুবই কম। কোথাও চিকিৎসক নেই, নেই নার্স। আবার চিকিৎসক ও নার্স থাকলেও নেই স্বাস্থ্যকর্মী। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়েও তারা উপস্থিত হন না।
কয়েকটি কেন্দ্রে কেবল টিকাদান কিংবা পরিবার পরিকল্পনার সীমিত কার্যক্রম চললেও সাধারণ চিকিৎসাসেবা কার্যত অনিয়মিত। এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আধুনিক যন্ত্রেরও সংকট রয়েছে। আর আধুনিক যন্ত্র থাকলেও নেই ল্যাব টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট। এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনেরও সংকট রয়েছে। আর থাকলেও তা অনেক জায়গায় অকেজো। ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও রয়েছে। জনবল-সংকট, ওষুধের অপ্রতুলতা এবং কার্যকর তদারকির অভাবে অনেক কেন্দ্রই প্রায় বন্ধ।
তবে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, একসময় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অধীনেই পরিচালিত হতো নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো। পরে সেগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে গেলেও এখন পর্যন্ত কার্যকরভাবে সেবার মানোন্নয়নে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে অধিকাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই অনুমোদিত পদের তুলনায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা অনেক কম। কোথাও দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকের পদ শূন্য পড়ে আছে, আবার কোথাও একজন চিকিৎসককে একাধিক কেন্দ্রের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে নিয়মিত চিকিৎসাসেবায়; নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকের দেখা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে অনেক রোগীকে।
শুধু চিকিৎসকই নন, নার্স, ল্যাব টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট এবং সহায়ক কর্মচারীরও তীব্র সংকট রয়েছে। ফলে অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রই পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতায় সেবা দিতে পারছে না।
স্বাস্থ্যসেবা কেবল ভবন নির্মাণ বা অবকাঠামো গড়ে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ও দক্ষ জনবল, কার্যকর জবাবদিহিতা, নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহব্যবস্থা এবং নাগরিকবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা। ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি যদি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম বাস্তব অর্থে শক্তিশালী করতে পারে, তবে রাজধানীর লাখো মানুষ স্বল্প ব্যয়ে মানসম্মত প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পাবেন। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে, আর নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থাও হয়ে উঠবে আরও কার্যকর, সমন্বিত ও টেকসই।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যকর করতে প্রতিটি এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রতিটি জোনে ১০০-২০০ শয্যার হাসপাতাল, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা, বিনামূল্যে মানসম্মত এসআরএইচআর সেবা, নগরস্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিশোরী ও নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ ও পরীক্ষার ব্যয় কমানো, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যবীমা এবং শক্তিশালী প্রশাসনিক সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে রাজধানীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশ সেখানেই নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে কোথাও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলোর অনেক কিছুই দীর্ঘদিন অচল। অধিকাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে সরবরাহযোগ্য প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট রয়েছে। অনেক সময় সাধারণ জ্বর, সর্দি, ব্যথা কিংবা রক্তচাপের ওষুধও মেলে না। আবার প্রয়োজনীয় ল্যাব-সুবিধার অভাবে রোগীদের বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হয়, ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
তাদের মতে, নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সেবার মান উন্নত করা গেলে সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। প্রতি বছর এ খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তার সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অবকাঠামো নির্মাণ, বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ থাকলেও মাঠপর্যায়ে সেবার মান সেই অনুপাতে বাড়েনি।
তারা বলেন, অনেক নগরবাসীই জানেন না যে তাদের ওয়ার্ডে একটি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। কোথায় কী ধরনের সেবা পাওয়া যায়, সেটিও অধিকাংশের অজানা। আবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর সামনে সেবার তালিকা ও সময়সূচি স্পষ্টভাবে প্রদর্শন না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তাই জনসচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রচার জোরদার করা প্রয়োজন। এ কাজে ওয়ার্ড কাউন্সিলর, কমিউনিটি সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করা গেলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ব্যবহারও বাড়বে।
তারা আরও বলেন, নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনায় নিয়মিত তদারকির ঘাটতি রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকদের উপস্থিতি, রোগীরা কী ধরনের সেবা পাচ্ছেন এবং ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক আছে কি না- এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি নেই। সেবার মান মূল্যায়নে রোগীদের মতামত নেওয়ারও ব্যবস্থা নেই। তবে ডিজিটাল উপস্থিতি, অনলাইন রিপোর্টিং ও নিয়মিত অডিট চালু করা গেলে সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।
এদিকে যেসব রোগের চিকিৎসা নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই সম্ভব, তারাও বড় হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোয় জরুরি রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।
শিপাহীবাগ এলাকার এক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা রহিমা বেগম বলেন, ডাক্তার পাব ভেবে এসেছিলাম। এসে শুনি ডাক্তার আসেননি। ওষুধও নেই। তাই আবার বাইরে গিয়ে চিকিৎসক দেখাতে হবে। অনেক সময় শিশুদের টিকাও পাওয়া যায় না।
খিলগাঁওয়ের এক বাসিন্দা বলেন, কয়েকবার এই কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু প্রতিবারই হয় চিকিৎসক পাইনি, নয়তো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। তাদের এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন ভালো কাজ করছে না। শেষ পর্যন্ত আমাকে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়েছে।
ক্লিনিক হেলথ সাপোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, নগরস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় ও পরিকল্পনা অপরিহার্য। আরবান প্রাইমারি হেলথকেয়ার সার্ভিস প্রজেক্টের সেবা প্রদানের মাধ্যমে দেখা গেছে, ফ্রন্টাল লেবেল, চিকিৎসক, মিডওয়াইফ, নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ানসহ সুষম জনবল এবং বিনামূল্যের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের বিশ্বাস ও সেবা গ্রহণ বৃদ্ধি করে। ফান্ডিং ও পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট জরুরি।
জনগণকে সচেতন করা, সোশ্যাল হেলথ ইনস্যুরেন্স চালু করা এবং রাজস্ব বরাদ্দ ও মন্ত্রণালয়ের সহায়তা মিলিয়ে ১ শতাংশের সাসটেইনেবল ফান্ড তৈরি করা যেতে পারে। অবকাঠামো শক্তিশালী করে, প্রাইমারি হেলথকেয়ার ইউনিটে পর্যাপ্ত ডাক্তার ও মিডওয়াইফ নিয়োগে নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে স্থিতিশীল ও কার্যকর করা সম্ভব।
আইপাস বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সাইদ রুবায়েত বলেন, বাংলাদেশে নগর জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নগরস্বাস্থ্য নিয়ে এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ ভয়াবহ হতে পারে। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভঙ্গুর। মাথাপিছু স্বাস্থ্যব্যয়, সরকারি বিনিয়োগ ও জিডিপির তুলনায় জনস্বাস্থ্য ব্যয় কমেছে। এর মধ্যে আরবান হেলথ আরও বেশি বঞ্চিত।
নগর স্বাস্থ্যসেবা অনেকটা দাতা প্রকল্প, এনজিও, জেনারেল প্র্যাকটিশনার ও অনিয়ন্ত্রিত বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। স্বাস্থ্যসেবায় সাধারণ মানুষের খরচ বেড়েছে এবং অনেকেই দরিদ্র হয়ে পড়ছেন। প্রকল্পভিত্তিক ব্যবস্থায় স্থায়ী স্বাস্থ্যকর্মী বাহিনী গড়ে ওঠেনি, বড় প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে, অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যতথ্য ব্যবস্থাও দুর্বল।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান বলেন, নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীনে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কীভাবে চালাবে, তারা জানে। আমাদের এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
সময়ের আলো/আআ