ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ও উজানের ঢলের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা বাড়তে থাকায় আগাম প্রস্তুতি জোরদার করেছে সরকার। সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতিতে যাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো যায়, সে জন্য দেশের সব জেলা প্রশাসকের অনুকূলে ৬ হাজার ৯০০ মেট্রিকটন চাল এবং ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), বিভাগীয় কমিশনার, জেলা ও উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়।
পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার জন্য ২০০ মেট্রিকটন চাল ও ১০ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দেশের বাকি ৬০ জেলার প্রতিটিকে ১০০ মেট্রিকটন চাল ও ৫ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতির বিবেচনায় মন্ত্রণালয় থেকে দ্বিতীয় দফায় নতুন করে চট্টগ্রামে আরও ২৫ লাখ টাকা, কক্সবাজারে ২০ লাখ টাকা এবং রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামে ৩০০ মেট্রিকটন, কক্সবাজারে ২৫০ মেট্রিকটন এবং রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ২০০ মেট্রিকটন করে চাল অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব ত্রাণভান্ডার থেকে প্রতিটি জেলায় ২০ লাখ টাকা করে বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছেন। বরাদ্দের অর্থ চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ত্রাণ খাত থেকে ব্যয় হবে।
পরিস্থিতি খারাপ হলে আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে। এ জন্য কেন্দ্রীয় গুদামে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য ও নগদ তহবিল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দকৃত চাল ও নগদ অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে স্বচ্ছতার সঙ্গে বিতরণ করতে নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। বিতরণের হিসাব সংরক্ষণ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। সরকারি নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনে দ্রুত অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ার জন্যও প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
গত তিন দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বর্ষণ এবং উজানের ঢলের খবর পাওয়ার পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে। বিশেষ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, জামালপুর, গাইবান্ধা, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। যদিও তা এখনও অধিকাংশ স্থানে বিপদসীমার নিচে রয়েছে, তবে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নিম্নাঞ্চলে পানি জমার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে স্থানীয় প্রশাসনকে আগাম প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের নির্দেশ অনুযায়ী জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জেলা ও উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে সক্রিয় রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জরুরি সভা করা। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং পানি বৃদ্ধির তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা।
ইউনিয়ন পর্যায়ে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও বসবাস উপযোগী রাখা এবং শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য, ওষুধ ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুত রাখা। ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা, পর্যাপ্ত নৌকা, স্পিডবোট ও উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা, গবাদি পশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা, নদীভাঙন ও বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা এবং দুর্যোগের খবর দ্রুত মন্ত্রণালয় ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরে পাঠানো।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, যেসব জেলায় পানি দ্রুত বাড়তে পারে, সেখানে ইউএনওদের মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে আগাম সতর্কবার্তা প্রচার এবং মাইকিংয়ের ব্যবস্থাও রাখতে বলা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব আরিফ ফয়সাল খান (ত্রাক-১) স্বাক্ষরিত মন্ত্রণালয়ের আদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মানবিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন নির্দেশিকা ২০২২-২৩ অনুসরণ করে বরাদ্দ বিতরণ করতে হবে। সব ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে এবং বিতরণ শেষে বিস্তারিত প্রতিবেদন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি এবং জেলা-উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বর্ষা মৌসুমে সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের প্রশাসনিক বিলম্ব যাতে না হয়, সে জন্য আগেভাগেই অর্থ ও খাদ্যশস্য জেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে জেলা প্রশাসকদের চাহিদার ভিত্তিতে অতিরিক্ত চাল, নগদ অর্থ, শুকনো খাবার, শিশুখাদ্য, গোখাদ্য, ঢেউটিন এবং অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী দ্রুত বরাদ্দ দেওয়া হবে।
সরকার সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি বলেন, ‘আমরা আগাম প্রস্তুতি নিয়েছি। দেশের সব জেলায় চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোথাও পরিস্থিতির অবনতি হলে সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত ত্রাণ পাঠানো হবে। কোনো মানুষকে খাদ্য বা আশ্রয়ের অভাবে কষ্ট পেতে দেওয়া হবে না।’
মন্ত্রী বলেন, আবহাওয়া অধিদফতর, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যেসব এলাকায় ঝুঁকি বাড়বে, সেখানে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রণালয়ের সচিব সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে অবস্থান করছেন এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।