পানিবন্দি জনপদে দুর্ভোগ

সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম

সারাদেশ

ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসে সারা দেশে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, নোয়াখালীর হাতিয়া, ভোলা, ফেনীসহ বিভিন্ন স্থানে বন্যার আশঙ্কা

2026-07-10T01:07:38+00:00
2026-07-10T01:07:38+00:00
 
  শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬,
২৬ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
পানিবন্দি জনপদে দুর্ভোগ
সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ১:০৭ এএম 
ভারী বর্ষণে তলিয়ে গেছে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার কবাখালী সড়ক। ছবি : সময়ের আলো
ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসে সারা দেশে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, নোয়াখালীর হাতিয়া, ভোলা, ফেনীসহ বিভিন্ন স্থানে বন্যার আশঙ্কা বেড়েছে। পানিবন্দি এলাকায় বেড়েছে ত্রাণের হাহাকার। বৃষ্টিতে টইটম্বুর নদীর পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেছে নিচু এলাকা। বিভিন্ন এলাকায় হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

পাহাড়ধসে বান্দরবানের লামায় পাঁচজন ও কক্সবাজারের চকরিয়ায় দুজনসহ সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। রাঙামাটিতে পাহাড়ধসে একজনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও দুজন। চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে প্রবল বৃষ্টির সময় খালে পড়ে এক যুবক নিখোঁজ রয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত সন্ধান মেলেনি।

জেলার বাঁশখালী, পটিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, ফটিকছড়ির নিম্নাঞ্চল হাঁটু থেকে কোমর পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে। পাহাড়ধস ও সড়কে পানি ওঠায় রাঙামাটির সঙ্গে খাগড়াছড়ির যোগাযোগব্যবস্থা বিছিন্ন রয়েছে। সাজেকে আটকা পড়েছেন ৪০০ পর্যটক। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের দোহাজারি অংশ হাঁটুপানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্থানে নিম্নাঞ্চল পানিতে ডুবে যাওয়ায় লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় অনেকের ঘরে জ্বলেনি চুলা। চলছে ত্রাণের হাহাকার। 

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানায়, বৃষ্টির মাত্রা ধীরে ধীরে কমে আসছে। তবে ঝড়-বৃষ্টি আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকবে। তিন নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল আছে। চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে চার দিন ধরে বন্ধ আছে বড় জাহাজ থেকে পণ্য লাইটারেজ। বন্দরের সংরক্ষিত ইয়ার্ডের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে আমদানি পণ্য ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে বৃহস্পতিবার চতুর্থ দিনের মতো জলমগ্ন ছিল নগরীর বিভিন্ন নিচু এলাকা। বৃষ্টিপাত কমলেও টইটম্বুর খাল-নালায় এখনও পানির তীব্র স্রোত বয়ে যাচ্ছে। কর্ণফুলী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় জোয়ারের সময় নগরীর খালে উপচে পড়ে পানি। এতে নিচু এলাকা থেকে পানি কমছে ধীরে। একটানা পানি জমে থাকায় নগরীর বিভিন্ন সড়কে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত খানাখন্দ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) উদ্যোগে জরুরি মেরামতকাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। দ্রুত ইট দিয়ে গর্ত ভরাট করা হচ্ছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

এদিকে নগরীতে জলমগ্ন পরিস্থিতির কারণে ফের চলমান জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে বলছেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের নামে হাজার কোটি জলেই গেছে। 

নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মিনহাজ উদ্দিন বলেন, বৃষ্টিপাত কমলেও জলমগ্ন অবস্থার উন্নতি হয়নি। এই আবাসিক এলাকার প্রতিটি ব্লকেই দিনভর ছিল হাঁটুপানি। দৈনন্দিন কাজে বের হতে গেলে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। 

বোয়ালখালী প্রতিনিধি জানান, বোয়ালখালী উপজেলায় পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট প্রবল স্রোতে ভান্ডালজুড়ি খালে ডুবে দিদার আলম হৃদয় (১৮) নামের এক যুবক নিখোঁজ হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়নের জ্যৈষ্ঠপুরা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হৃদয় পূর্ব জ্যৈষ্ঠপুরা গুচ্ছগ্রাম আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকার মৃত ইলিয়াছের ছেলে। হৃদয় জীবিকার তাগিদে পাহাড়ে বাগান শ্রমিক হিসেবে কাজ করত। সকালে লিচুবাগানে কাজ করতে যাওয়ার সময় ভান্ডালজুড়ি খাল পার হওয়ার চেষ্টার সময় পানিতে ভেসে যায়।

বাঁশখালী : স্মরণকালের ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে বাঁশখালীতে। স্থানীয়রা জানান, বাঁশখালীর পানি নিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া জলকদর খাল। এই খালের নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে চিংড়ি চাষের নামে প্রভাবশালী মহল স্লুইসগেট আটকে রাখায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে পাহাড়ি ঢল আর চিংড়ি ঘেরের পানি আটকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, বাঁশখালীর পাকা দালান ছাড়া প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ বাড়িঘর এখন পানির নিচে। কোথাও গলা সমান, কোথাও কোমর সমান পানি। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের ২১২টি গ্রামের অধিকাংশই এখন পানির তলায়।
কাথরিয়া ইউনিয়নের মানিকপাঠান গ্রামের বাসিন্দা রিফাত হোসেন বলেন, আমাদের উপকূলীয় এলাকা, সাধারণত পানি দ্রুত নেমে যায়। বাড়িতে এত পানি আমাদের বয়সে দেখিনি আর। সবাই পানিবন্দি।

বাগমারা গ্রামের বাসিন্দা মনির উদ্দিন বলেন, বিক্রির জন্য ৫০০ আড়ি ধান মজুদ রেখেছিলাম বাড়ির বারান্দায়। এর মধ্যে গত রাতে ঘর প্লাবিত হয়ে ১৫ বস্তা ধান ভিজে গেছে। ঘরের দরজায় তক্তা দিয়েও পানি আটকাতে পারিনি।

ঢল আর বানের পানি হঠাৎ করেই ঢুকে পড়েছে মানুষের ঘরে। নলকূপ ডুবে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির সংকট। ঘরে মজুদ না থাকায় সংকট তৈরি হয়েছে শুকনো খাবারেরও। মাটির ঘর ভেঙে পড়েছে একের পর এক। ভেসে গেছে ধান-চাল ও ঘরের আসবাব।

শেখেরখীল হিন্দুপাড়ার বাসিন্দা প্রান্ত দেব বলেন, পাকা দালানের বাসিন্দারা কিছুটা নিরাপদ থাকলেও কাঁচা, টিনশেড ও মাটির ঘরগুলো পুরোপুরি ভাসছে পানিতে। পানি কমছে না। উল্টো বাড়ছে।

রাঙ্গুনিয়া : রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থান পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ইসলামপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাহেবনগর এলাকায় পাহাড়ি ঢলের তোড়ে প্রধান সড়কের একটি কালভার্ট দুই পাশের সংযোগ সড়ক থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সাহেবনগর সড়কের ‘বেল্লাতল’ খালের ওপর অবস্থিত এই জরাজীর্ণ কালভার্টটি বর্তমানে চলাচলের জন্য একেবারেই অনুপযোগী ও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা কালভার্টটির দুপাশে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে পারাপার হচ্ছেন।

সাতকানিয়া : ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। উপজেলার প্রায় সব নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়ছে নদ-নদীর পানি। একের পর এক গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ। বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে সাতকানিয়া থানা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও বসতবাড়িতে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কোথাও বুকসমান পানি জমে থাকায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হাসমতের দোকান এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক যানবাহন ধীরগতিতে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। অন্যদিকে কেরানীহাট-বান্দরবান সড়কের বুড়ির দোকান ব্রিজ এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রামের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

বন্যাকবলিত এলাকার অধিকাংশ পরিবার এখন মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। অনেক বাড়ির রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দুদিন ধরেই রান্না করতে পারছেন না বাসিন্দারা। কেউ শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছেন, আবার কেউ প্রতিবেশীর উঁচু ঘরে আশ্রয় নিয়ে রান্না করছেন। অনেক পরিবারের চাল, ডাল, জ্বালানি কাঠ, আসবাবপত্র, কাপড়চোপড় এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পানিতে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

কক্সবাজার-বান্দরবান : গত কয়েক দিনের বৈরী আবহাওয়ায় কক্সবাজার ও বান্দরবানে সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ভারী বৃষ্টির মধ্যে বান্দরবানের লামা এবং কক্সবাজারের চকরিয়ায় পাহাড় ধসে শিশুসহ সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে। 

বান্দরবানের লামায় পাহাড় ধসের ঘটনায় মারা গেছেন- জুয়েল (২৮) ও তার স্ত্রী কুলসুমা বেগম (২২)। আরেক ঘটনায় মারা যান ইউনুস (২৮), তার স্ত্রী রানু বেগম (২২) এবং তাদের চার বছর বয়সি সন্তান সোলায়মান। তারা সবাই আজিজনগর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মিশনপাড়ার বাসিন্দা।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মোবারক হোসেন বলেন, পাহাড়ধসে প্রথম নিহতের ঘটনা ঘটে রাতে। অন্য আরেকটার ঘটনা বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে ঘটেছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া এলাকার চুনতি থেকে ফায়ার সার্ভিস এসে মরদেহ উদ্ধার করেছে। 

তিনি বলেন, বান্দরবানে প্রায় সময় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ২০০৯ সালে লামায় একবার এবং ২০১৬ সালে আরেক ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। তখন অনেক মানুষ মারা গেছে। এই মিশনপাড়া এলাকায় এর আগে কখনও ঘটেনি। 

লামা থানার ওসি কায়ছার হামিদ বলেন, লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নে পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় দুই পরিবারে পাঁচজন মারা গেছেন। প্রথম ঘটনাটি ঘটে বুধবার রাত ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে। এতে এক পরিবারে দুজন নিহত হয়। পরে বৃহস্পতিবার ভোর ৪টায় আরেকটা পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়। তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। লামা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে টেলিটক নেটওয়ার্ক নেই। অনেকটা বিচ্ছিন্ন আছে এই উপজেলা।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, পাহাড়ধসের ঘটনা অবহিত হয়ে একটি টিম দ্রুত ছুটে যায়। তারা পৌঁছানোর আগেই তিনজনকে নিহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। আরেকটি ঘটনায় চট্টগ্রামের লোহাগাড়া ফায়ার স্টেশনের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুজনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। এদিকে লামা উপজেলার কাছাকাছি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দুজনই চাচাতো ভাই-বোন। আহত হয়েছেন এক নারী।

রাঙামাটি : ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটি পার্বত্য জেলার পরিস্থিতি ক্রমেই অবনিত হচ্ছে। পাহাড়ধসের ঘটনায় অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। টানা প্রবল বর্ষণের ঘটনায় দুজন নিখোঁজ হয়েছেন। জেলায় পাহাড়ে ধসে একজন মারা গেছেন।  বৃহস্পতিবার  বিকালে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়।

এতে বলা হয়, প্রবল বর্ষণের সময় গত ৭ জুলাই জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া বাজারের মুদি ব্যবসায়ী মো. বদিউল আলম (৪৫) নিখোঁজ হন। ৭ জুলাই রাত ৯টার পর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজ বদিউল আলম চট্টগ্রামের পশ্চিম রাঙ্গুনিয়া থানার সরফভাটা গ্রামের বাসিন্দা।

জানা যায়, গত ৭ জুলাই রাত ৯টার দিকে মো. বদিউল আলম মোটরসাইকেলে করে বাড়ি থেকে ফারুয়া বাজারে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ফিরছিলেন। পথে ফারুয়া ইউনিয়নের গোয়েনছড়ি বিহার এলাকাসংলগ্ন সড়কে পৌঁছালে সেখানে বৃষ্টির পানির কারণে মোটরসাইকেল চালানো সম্ভব হচ্ছিল না।

অন্যদিকে একই তারিখে জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় পাহাড় ধসে ৭ জুলাই লক্ষ্মী বিলাশ চাকমা (৬০) নামে এক বৃদ্ধের  মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন মারা যাওয়া ব্যক্তির পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। এ ছাড়া পাহাড় ধসের ঘটনায় জেলার কাপ্তাই উপজেলায় দুই শিশু আহত হয়।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) শেখ সালমান বলেন, পাহাড়ধসে মৃত ব্যক্তির পরিবারকে প্রশাসন আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। নিখোঁজ দুজনের সন্ধানে প্রশাসন তৎপর রয়েছে।

জেলা প্রশাসন জানায়, ভারী বর্ষণ শুরুর পর জেলার ৯৮টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। আরও বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রশাসনের উদ্যোগে ঝুঁকি এড়াতে বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে ২০০টিরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, কাপ্তাই উপজেলায় ১৫টি, বাঘাইছড়িতে তিনটি, কাউখালীতে ৩০টি, রাঙামাটি সদরে ১১টি, নানিয়ারচরে দুটি এবং বিলাইছড়িতে ৩৭টিসহ মোট ৯৮টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জেলার বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কয়েকটি এলাকার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। লোকজন চরম আতঙ্কের মধ্যে আছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ঠিকমতো কাজ করছে না। এতে দুর্গম এলাকার বাসিন্দারা অনেকটা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন।


দুর্যোগ মোকাবিলায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ২০০টিরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। এর মধ্যে বর্তমানে ৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে মোট চার হাজার ১৬৬ জন আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে রাঙামাটি পৌরসভা, রাঙামাটি সদর, কাউখালী, কাপ্তাই, বাঘাইছড়ি পৌরসভা, বাঘাইছড়ি উপজেলা, জুরাছড়ি, রাজস্থলী, নানিয়ারচর ও বিলাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গত মানুষ অবস্থান করছেন। 

বেশি মৃত্যু কক্সবাজারে : টানা বর্ষণের মধ্যে কক্সবাজারে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বুধবার ধসের একটি ঘটনায় অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ জেলার চকরিয়ায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটের দিকে উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-এ মেয়েদের একটি হেফজখানার (মাদরাসা) ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। এতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়।

বুধবারের ধসের ঘটনার পরপর ওই ক্যাম্পের রোহিঙ্গা মাঝি (নেতা) দিল মোহাম্মদ বলেন, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীরা পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। ভূমিধসের সময় হেফজখানার ভেতরে ৩০ জনের বেশি ছাত্রী ছিল। গত রোববার রাতে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে সবচেয়ে বড় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। প্রবল বর্ষণে আলাদা পাহাড়ধসে আটজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে একই পরিবারের কয়েকজন সদস্যও ছিলেন। আহত হন আরও বেশ কয়েকজন।

খাগড়াছড়ি : টানা বৃষ্টিপাতে খাগড়াছড়ির চেঙ্গী নদীতে বেড়ে যায় পানি। গত কয়েক দিনে পানি কিছুটা কমলেও মাইনী নদীতে পানি আরও বেড়েছে। জেলা সদরের কয়েকটি নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতার আংশিক উন্নতি হলেও বেতছড়ি মার্মাপাড়া, বিচিতলা, লার্মাপাড়া ও বটতলার কিছু এলাকায় এখনও পানি জমে রয়েছে। দুদিনেও জেলার সড়ক যোগাযোগব্যবস্থায় স্বাভাবিকতা ফেরেনি। দীঘিনালা উপজেলার কবাখালি ও মেরুং এলাকায় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে থাকায় দীঘিনালা-লংগদু, দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি এবং দীঘিনালা-সাজেক সড়কে এখনও যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং পর্যটনকেন্দ্রে চার শতাধিক পর্যটক আটকা রয়েছেন।

এদিকে মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি কালোপাহাড় জামতলী এলাকায় ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সড়ক প্লাবিত হওয়ায় গত রাত থেকে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কেও সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত জানান, বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি এড়াতে ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। আশ্রিতদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিরা)

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   পানিবন্দি  জনপদ  দুর্ভোগ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: