তদবিরে হাঁপিয়ে উঠছেন মন্ত্রীরা

এসএম আলমগীর

জাতীয়

বাংলাদেশ সচিবালয়ে এখন তদবিরের চাপ এতটাই বেড়েছে যে, অনেকের ভাষায় এটি যেন ‘তদবিরের হাট’। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দর্শনার্থীদের ভিড়ে

2026-07-12T02:07:33+00:00
2026-07-12T02:07:33+00:00
 
  রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬,
২৮ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
তদবিরে হাঁপিয়ে উঠছেন মন্ত্রীরা
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: রোববার, ১২ জুলাই, ২০২৬, ২:০৭ এএম 
বাংলাদেশ সচিবালয়। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশ সচিবালয়ে এখন তদবিরের চাপ এতটাই বেড়েছে যে, অনেকের ভাষায় এটি যেন ‘তদবিরের হাট’। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দর্শনার্থীদের ভিড়ে মন্ত্রী-সচিবদের নিয়মিত কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। অনুরোধের চাপ এত বেশি যে মন্ত্রীরা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক মন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলছেন, ‘এত তদবির নয়, কাজ করতে চাই।’

নতুন সরকার গঠনের পর তদবিরকারীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সচিবদের পাস ইস্যু বেড়েছে, পাশাপাশি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পিএস-এপিএসদের মাধ্যমেও বিপুলসংখ্যক পাস দেওয়া হচ্ছে। আগে প্রতিদিন একজন সচিব সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৫টি পাস ইস্যু করতে পারতেন, এখন দিচ্ছেন ১০টি। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে পুলিশ সদস্যরাও দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছেন। এমন ঘটনায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

সচিবালয়ে এখন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং কিছু অসাধু কর্মচারী ও পিএস-এপিএসের মাধ্যমে আসা তদবিরকারীদের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি। সরকারি কর্মকর্তারা পছন্দের পোস্টিং, বদলি, পদোন্নতি ও নতুন দায়িত্বের জন্য তদবির করছেন। পাশাপাশি প্রকল্প, ঠিকাদারি, ডিলারশিপ, বরাদ্দ, লাইসেন্স এবং ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও ব্যাপক তদবির চলছে।

কেন এত বেড়েছে?
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার পরিবর্তনের পর নতুন সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং অতীতে বঞ্চিতদের দ্রুত সুবিধা ফিরে পাওয়ার চেষ্টায় তদবির বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গণপূর্ত, স্থানীয় সরকার, যোগাযোগ, খাদ্য, বাণিজ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। পুরোনো হিসাব-নিকাশ করতে গিয়ে গত ১৭ বছরে বঞ্চিতরা এখন দ্রুত সব ফিরে পেতে চায়- এ জন্যও তদবির করছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সচিবালয়ের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়লেও এখন প্রবেশ কিছুটা নিয়ন্ত্রিত। তবে দর্শনার্থী পাসের মাধ্যমে ব্যাপক প্রবেশের সুযোগ থাকায় তদবির ও দালাল চক্রের তৎপরতা আবারও বেড়েছে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রকৃত কাজের চেয়ে তদবিরেই বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে।

তদবিরের এই চাপ মন্ত্রীদের দৈনন্দিন কাজেও প্রভাব ফেলছে। গত সপ্তাহে এক সিনিয়র মন্ত্রীর দফতরে মাত্র ১০ মিনিট অবস্থানকালে একের পর এক ১০-১২ জন দর্শনার্থী দেখা করতে আসেন, আর মন্ত্রীকে একই সঙ্গে ফাইলে সই ও তাদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়।

চরম বিরক্ত মন্ত্রীরা
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিদিন সকাল ৯টার আগেই সচিবালয়ে উপস্থিত হচ্ছেন। তার দেখাদেখি অন্য মন্ত্রীরাও সকালেই নিজ নিজ দফতরে আসছেন। তবে তদবিরকারীদের ভিড়ে অনেক সময় মন্ত্রীদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গত সপ্তাহে একটি সংবাদ বিষয়ে এক সিনিয়র মন্ত্রীর দফতরে এই প্রতিবেদক প্রায় ১০ মিনিট অবস্থানকালে ১০-১২ জন দর্শনার্থী সেখানে আসেন।  

এ সময় মন্ত্রী একদিকে ফাইলে সই করছিলেন, অন্যদিকে তাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। একের পর এক দর্শনার্থী আসতে থাকায় তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে একসময় তার পিএসকে বলেন- ‘এত লোক এলে কাজ করব কীভাবে, তোমরা কি একটু নিয়ন্ত্রণ করতে পার না। আমি কোনো ফাইল মনোযোগ দিয়ে দেখতে পারছি না। কী লেখা আছে, কী বিষয়ে সেটিও ঠিকমতো দেখার সুযোগ পাচ্ছি না।’ 


তিনি আরও বলেন, জনগণ ভোট দিয়ে আমাদের এমপি বানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের মন্ত্রী বানিয়েছেন। আমরা এখানে এসেছি দেশের মানুষের সেবার জন্য, তাদের জন্য কাজ করতে এসেছি। এভাবে যদি মিনিটে মিনেটে তদবির নিয়ে লোক আসে তা হলে কীভাবে কাজ করব। মাঝেমধ্যে আমার চরম বিরক্ত লাগে, কিন্তু কিছু বলতেও পারি না, নিজে দলের লোকরা আসে, এলাকার লোক আসে। আমার কথা হচ্ছে, লোক আসবে, আসুক; কিন্তু একটা লিমিট তো থাকবে। আমাদের তো কাজ করতে দিতে হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মন্ত্রী সময়ের আলোকে বলেন, ‘এখন তদবিরের ব্যাপকতা বেড়েছে- এটা ঠিক। আসলে দাফতরিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের কথাও শুনতে হয়। সব অনুরোধ তো আর রক্ষা করা সম্ভব নয়, বিশেষ করে সেগুলো যদি আইনসম্মত না হয়। কিন্তু আমরা যদি তাদের কথা না শুনি বা সৌজন্যমূলক আচরণ না করি, তবে তারা কষ্ট পান। অনেক সময় মানুষের অত্যধিক ভিড় হতাশাজনক মনে হতে পারে, কিন্তু তারা আমাদের কাছেই আসেন। কারণ আমরাই দায়িত্বশীল পদে আছি। তবে আমাদের চাওয়া-আমরা যেন জাতির জন্য কাজ করতে পারি-সে সময়টা আমাদের যেন দেওয়া হয়। আমাদের দৈনন্দিন কাজে যেন ব্যাঘাত না ঘটে।’

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী সময়ের আলোকে বলেন, ‘আসলে সচিবালয়ে প্রতিদিন কী পরিমাণ লোক আসে সেটি ভালো বলতে পারবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আমার এখানে তেমন একটা সমস্যা ফিল করি না। কারণ আমার কাছে বাইরে থেকে তদবিরে তেমন কেউ আসে না বা আসার সুযোগ পায় না। তারপরও বাংলাদেশের কালচার-কিছু লোক তো আসেই। তা ছাড়া আমি বসি মূলত প্রধানমন্ত্রী যে বিল্ডিংয়ে বসেন, সে বিল্ডিংয়ে। এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ কড়া। তাই চাইলেই যে কেউ হুটহাট আমার কাছে আসতে পারে না। 

তবে সরকারি কর্মকর্তারা কিছু আসে আমার কাছে, কিন্তু আমার কাছে এসে তেমন একটা লাভ হয় না। কারণ এখন সবকিছু একটা সিস্টেমে কাজ চলছে। এখানে এসে হুটহাট কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। অবশ্য যারা অবসরে চলে গেছেন তাদের কিছু লোক আসেন আমার কাছে। তাদের বিষয়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কমিশন গঠন করেছিল। কমিশনের রিপোর্টের প্রেক্ষিতে তো সিদ্ধান্ত দিয়েই দিয়েছে। নতুন করে কোনো কমিশন গঠনেরও কোনো কার্যক্রমও আপাতত নেই। তারপরও অবসরে যাওয়া কিছু লোক আসে আমার কাছে খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য। এটাকে সেই অর্থে তদবির বলা যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, সচিবলয়ে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কী অবস্থা এবং প্রতিদিন কত সংখ্যক তদবিরকারী আসে, সে তথ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিতে পারবে। তা ছাড়া এটা নিয়ন্ত্রণের জন্য পাস দেওয়ার হার কমানো হবে। তাই দেদার যে দর্শনার্থী আসবে সে সুযোগও কম। তবে বিষয়টি আমরা ক্ষতিয়ে দেখব।

তদবিরবাজদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধির বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এ জন্য দর্শনার্থী প্রবেশ কমানোসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়। এ তথ্য জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রশাসন-১ অধিশাখা) মো. জসিম উদ্দীন সময়ের আলোকে বলেন, ‘২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে জুলাই-আগস্ট মাস পর্যন্ত সময়ের চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে ওই সময়ের মধ্যে গড়ে এক দিনে সর্বনিম্ন দর্শনার্থী এসেছিল ৪৫০ জন এবং সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ জনের মতো। বর্তমানে সে অবস্থার চেয়ে অনেক বেড়েছে।’

তিনি বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু দিন পাস দেওয়া একেবারে বন্ধ করা হয়েছিল। আবার সে সময় আগের আওয়ামী সরকারের আমলে দেওয়া ২৫ হাজার পাস বাতিল করে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণের জন্য আওয়ামী সরকারের সময় সোমবার দর্শনার্থী পাস দেওয়া বন্ধ করা ছিল; কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সোমবারের পাশাপাশি বৃহস্পতিবারও দর্শনার্থী পাস দেওয়া বন্ধ করা হয়। এখনও ওই নিয়মনই চালু রয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একজন সচিব দিনে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৫ জনের জন্য পাস দিতে পারতেন। এখন সেটি বাড়িয়ে ১০ জন করা হয়েছে। এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। 

মো. জসিম উদ্দীন আরও বলেন, তবে আমরা দর্শনার্থী দেদার আসা কিছুটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। প্রতিটি গেটে তদারকি বাড়ানো হচ্ছে। সিসিটিভি ক্যামেরার সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। ভেহিক্যাল স্ক্যানার নষ্ট ছিল, সেগুলো ঠিক করা হচ্ছে। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী এখানে নিয়মিত অফিস করেন, সেহেতু সচিবালয়ের নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়ে অনেক জোর দেওয়া হচ্ছে। 

সচিবালয়ের নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করছি। শুধু তাই নয়, দর্শনার্থীরা সচিবালয়ে প্রবেশ করার পর কোথায় যাচ্ছে, কী করছে সেগুলোও তদারকির উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। এ জন্য সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যরা টহল দেবে।

এ ছাড়া আমরা আরেকটি উদ্যোগ নিতে যাচ্ছি। ইতিমধ্যেই স্বরাষ্ট্র সচিব নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছেন-সচিবালয়ে যেসব দর্শনার্থী আসবেন তাদের জন্য দর্শনার্থী কার্ড দেওয়া হবে, যেটি গলায় ঝুলিয়ে রাখতে হবে, যেন কে দর্শনার্থী আর কে সচিবালয়ে কর্মরত-সহজে চিহ্নিত করা যায়। সুতরাং দেদার দর্শনার্থী আসা ঠেকাতে আমাদের চেষ্টার কমতি নেই। 

১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, সচিবালয়ে এ ধরনের তদবির বা লবিং নিষিদ্ধ হলেও, রাজনৈতিক সরকারের আমলে ঐতিহাসিকভাবেই এই নিয়ম উপেক্ষা করা হয়েছে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তদবিরের ব্যাপকতা অব্যাহত ছিল এবং এ নিয়ে কয়েকজন উপদেষ্টা হতাশা প্রকাশ করেছিলেন।

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের শুরুর দিকে মন্ত্রীরা মূলত ফুলেল শুভেচ্ছা গ্রহণ ও পরিচিতি পর্বেই ব্যস্ত ছিলেন। যারা একসময় ফুলের তোড়া নিয়ে এসেছিলেন, তারাই এখন নানা ধরনের দাবি-দাওয়া নিয়ে আসছেন। দলের অনেক নেতাকর্মী দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, হয়রানি ও মিথ্যা মামলার কথা তুলে ধরছেন; গত ১৬-১৭ বছরে নিজেদের আর্থিক বিপর্যয়ের কথা বলছেন এবং এখন বিভিন্ন বিষয়ে সরকারি সহায়তা চাইছেন। তারা মন্ত্রীদের কাছে তাদের অনুরোধের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   তদবির  হাঁপিয়ে উঠছে  মন্ত্রী  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: