ত্রাণের অপেক্ষায় লাখো বন্যার্ত

চট্টগ্রাম ব্যুরো

জাতীয়

বৃষ্টির মাত্রা কিছুটা কমলেও বন্যাদুর্গত বিভিন্ন এলাকায় দুর্ভোগ কমেনি। ত্রাণের অপেক্ষায় দিন পার করছেন পানিবন্দি লাখো মানুষ। দুর্গতরা গলাপানি মাড়িয়ে

2026-07-12T01:43:28+00:00
2026-07-12T01:43:28+00:00
 
  রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬,
২৮ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
ত্রাণের অপেক্ষায় লাখো বন্যার্ত
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: রোববার, ১২ জুলাই, ২০২৬, ১:৪৩ এএম 
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে গলাসমান পানি ভেঙে ছুটছে নারী ও শিশুরা (বায়ে)। ছবি : সময়ের আলো
বৃষ্টির মাত্রা কিছুটা কমলেও বন্যাদুর্গত বিভিন্ন এলাকায় দুর্ভোগ কমেনি। ত্রাণের অপেক্ষায় দিন পার করছেন পানিবন্দি লাখো মানুষ। দুর্গতরা গলাপানি মাড়িয়ে ছুটছেন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। স্থানীয় প্রশাসন এবং বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ দেওয়া হলেও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। পরিস্থিতি সরেজমিন দেখতে শনিবার চট্টগ্রাম সফর করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন ও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। 

দুই মন্ত্রীই বন্যা কবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন। দিয়েছেন ত্রাণ সহায়তা। চট্টগ্রামসহ সাত উপজেলায় উদ্ধার কাজ ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস শনিবার বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২৭ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। এর মধ্যে শনিবার ভোর ৬টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ৯ ঘণ্টায় মাত্র ১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।  পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ সুমন সাহা সময়ের আলোকে বলেন, বৃষ্টিপাতের মাত্রা অনেক কমেছে। 

শনিবার দুপুরে আবহাওয়ার তিন নম্বর সতর্ক সংকেত নামিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে আগামী তিন চার দিন হালকা মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এদিকে কক্সবাজার, বান্দরবানে শনিবারও লাখো মানুষ ছিল পানিবন্দি। সেতু ধসে রাঙামাটি-বান্দরবানের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। 

বন্যা-পাহাড় ধসে ৪৪ জনের মৃত্যু : বন্যা ও পাহাড় ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৪৪ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। শনিবার রাতে প্রকাশিত মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা যায়, বন্যা ও পাহাড় ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজারে। সেখানে পাহাড়ধস ও বন্যায় ২৩ জন মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। কক্সবাজারে আহত হয়েছেন ২৪ জন। 

এদিকে বিভাগীয় শহর চট্টগ্রামে বন্যা ও দেয়াল ধসের ঘটনায় ১১ জন নিহত এবং ১২ জনের আহত হয়েছে। পাশাপাশি পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ঢলের পানিতে ভেসে ও পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন। আহতের সংখ্যা ২। আরেক পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা মৌলভীবাজারে বন্যায় ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া এ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাত জেলার ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ এই সাত জেলা বন্যার কবলে পড়েছে।

চট্টগ্রামে ব্যাপক ক্ষতি : টানা বর্ষণ ঢলে সৃষ্টি বন্যায় চট্টগ্রাম জেলায় ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক ক্ষতি হয়েছে। ১৭৬টি সেতু কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সময় ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার জাতীয় আঞ্চলিক মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুক্রবার রাতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং এলজিইডি জেলা প্রশাসনের কাছে ক্ষতির এসব তথ্য পাঠায়। জেলা প্রশাসন এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। 

এতে বলা হয়, সওজের আওতাধীন ২০টি জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের মধ্যে ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে এলজিইডির আওতাধীন জেলার ৫১৪টি সড়কের ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার অংশ এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রামের ১৬ উপজেলা ও ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। পানিবন্দি আছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০। পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন পাঁচজন।


বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা। এ দুই উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দুর্ভোগে পড়েছে দুই উপজেলার সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ।

বাঁশখালী
বাঁশখালী সংবাদদাতা জানান, স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় চরম দুর্ভোগে দিন পার করছেন বন্যা দুর্গতরা। বিভিন্ন এলাকায় মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। শনিবার সরকারের বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়াসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাঁশখালীতে আসেন। তারা বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন শেষে বাহারছড়ায় ত্রাণ বিতরণ করেন।

শনিবারও উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বড় অংশ ছিল নিমজ্জিত। প্রায় ১০ হাজারের অধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। পাশাপাশি বহু পাকা ভবন এবং সেমিপাকা বাসা বাড়িও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এখনও অনেক সড়ক ও রাস্তা ঘাটে কোমরপানি। হাজার হাজার বসতবাড়ি পানির নিচে। বিশেষ করে বাঁশখালী-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কের পশ্চিম অংশ তথা উপকূলীয় এলাকার লক্ষাধিক মানুষ বর্তমানে পানিবন্দি।

অভিযোগ আছে বন্যায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিলেও বানবাসী মানুষের পাশে নেই জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় নেতারা। ১১টি ইউনিয়নে নামেমাত্র চলছে সরকারি ত্রাণ বিতরণ। বিএনপি নেতা মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নেতাকর্মীদের নিয়ে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা গেছে।

বাঁশখালীর বর্তমান এমপি মাওলানা জহিরুল ইসলাম দুর্গত এলাকায় বেশ তৎপর ছিলেন। বন্যা শুরুর দিকে ঢাকায় ছিলেন তিনি। জাতীয় সংসদে বাঁশখালীর দুর্দশা তুলে ধরে সরকারি বরাদ্দ দাবি করে বক্তব্য রাখেন। গত শুক্রবার তিনি দলের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডাক্তার শফিকুর রহমানকে নিয়ে বাঁশখালীতে আসেন এবং ত্রাণ কার্যক্রম চালান।

সাতকানিয়া
সাতকানিয়া প্রতিনিধি জাহেদুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ভয়াবহ বন্যায় এখনও লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি। হাঁটুপানিতে ডুবে আছে বিস্তীর্ণ এলাকা। তলিয়ে গেছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। 

অপরদিকে খাবারের আশায় গলাপানিতে অপেক্ষা করছেন শিশু বৃদ্ধ নারী-পুরুষ সব শ্রেণির মানুষ। বৃষ্টির মাত্রা কমে যাওয়া শনিবার পানি কিছুটা কমেছে। তবে ভারী বৃষ্টি হলেই ফের পানি বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। শুক্রবার থেকে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান এবং ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা। মানুষের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করছে। উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি ইঞ্জিনচালিত বোটে করে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় খাদ্যসামগ্রী নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন সেনাসদস্যরা। শনিবার সকাল থেকে উপজেলার বিভিন্ন প্লাবিত ইউনিয়নে এই ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করা হয়।

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক গ্রামে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোমর থেকে বুকসমান পানির কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় নৌকাই এখন দুর্গত মানুষের একমাত্র ভরসা। এমন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা বোটে করে চাল, চিড়া, মুড়ি, বিশুদ্ধ পানিসহ জরুরি খাদ্যসামগ্রী নিয়ে দুর্গত মানুষের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন। 

স্থানীয়রা জানান, অনেক পরিবার কয়েক দিন ধরে ঘরবন্দি অবস্থায় আছেন। বাজারে যাওয়া বা বাইরে থেকে খাদ্য সংগ্রহের সুযোগ না থাকায় অনেকেই খাদ্যসংকটে পড়েছেন। সেনাবাহিনীর ত্রাণ পৌঁছে যাওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে বানভাসি মানুষের মাঝে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে সেনাবাহিনী, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

দুর্ভোগে অন্য উপজেলার বাসিন্দারাও
লোহাগাড়া প্রতিনিধি হোছাইন মেহেদী জানান, কয়েক দিন ধরে বৃষ্টির তাণ্ডবের পর কমতে শুরু করেছে বানের পানি। এতে স্বস্তি মিললেও ভেসে উঠছে ব্যাপক ক্ষতচিহ্ন। পানি কমতে শুরু করায় দীর্ঘদিন পানিবন্দি থাকা মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে এখন সামনে এসেছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। অনেক পরিবারের বসতঘর, আসবাবপত্র, কৃষিজমি, পুকুরের মাছ এবং বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শনিবার উপজেলার আমিরাবাদ, আধুনগর, বড়হাতিয়া, পদুয়া, চুনতি, কলাউজানসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের নিচু এলাকা থেকে পানি কমতে দেখা যায়। তবে অনেক এলাকায় এখনও কাদামাটি ও জলাবদ্ধতার কারণে জীবনযাত্রা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

চন্দনাইশ প্রতিনিধি জানান, স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যন্ত চন্দনাইশের বিশাল এলাকা। এর মধ্যে উপজেলার দক্ষিণ হাশিমপুর বড়পাড়াবাসী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। টানা ৫ দিনের ভারি বৃষ্টিপাতে পাহাড়ি ঢলে বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। দুই দিন ধরে পানির নিচে শত শত বাড়িঘর, ফসলি জমি, হাটবাজার ও দোকানপাট। এছাড়া চরম দুর্ভোগে আছেন উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ। এদিকে বন্যাকবলিতদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদরাসাকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে খোলা রাখা হয়েছে। 

রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি জাহেদ হাসান তালুকদার জানান, কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে সারা দেশের মতো চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়াতেও দেখা দিয়েছে ভয়াবহ দুর্যোগ। বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও বন্যার পানিতে অসংখ্য ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। দুর্যোগে বিভিন্ন স্থানে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া কর্ণফুলী নদীতে এক যুবক নিখোঁজ রয়েছেন। 

এরই মধ্যে টানা বর্ষণ ও বন্যার পানির প্রবল স্রোতে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দুধপুকুরিয়া-পদুয়া এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ধসে পড়েছে। শনিবার সকালে এ ঘটনা ঘটে। ধসে পড়া সেতুটি বান্দরবান সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বন্যার পানির তীব্র স্রোতের মুখে সেতুটি ধসে পড়লে রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কপথে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দুই জেলার মানুষের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

এদিকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় কর্ণফুলী নদীতে ভাসমান লাকড়ি সংগ্রহ করার সময় ডিঙ্গি নৌকা উল্টে গিয়ে এক যুবক নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজ যুবকের নাম মো. সোলেমান (২০)। শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার পূর্ব সরফভাটা এলাকায় কর্ণফুলী নদীতে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

ফটিকছড়ি প্রতিনিধি এস এম আক্কাছ জানান, টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক স্থানে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে শত শত পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। এমন পরিস্থিতিতে দুর্গত মানুষের পাশে আস্থার কান্ডারি হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

কক্সবাজার
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে এলোমেলো হয়ে গেছে জেলার জনজীবন। গত সাত দিন ধরে দুর্বিষহ জীবন পার করছেন কক্সবাজার জেলার প্রায় তিন লাখ মানুষ। গত ৫ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত জেলায় পানিতে ডুবে এবং পাহাড়ধসে মোট ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সবশেষ শুক্রবার দুপুরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে রসুলাবাদ এলাকার আবদুল মালেকের মেয়ে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) মারা যায়। এ ঘটনায় ঝর্ণার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তারা বর্তমানে চিকিৎসাধীন।

এর আগে বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টার দিকে চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকায় পানিতে ডুবে স্থানীয় সোলতান আহমদের দুই বছর বয়সি ছেলে মোহাম্মদ ওয়াকিমের মৃত্যু হয়। একই দিন সকালে বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে চকরিয়া থেকে বিভক্ত নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকার আরিফুল ইসলামের ছেলে পুষ্প (৩) মারা যায়।

এ ছাড়া বৃহস্পতিবার ভোরে চকরিয়া উপজেলার মছনিয়া কাটা এলাকায় বসতঘরের ওপর পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়। কক্সবাজার সদর উপজেলা, পেকুয়া এবং উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ আরও ২১ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

বান্দরবান
বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার প্রবল স্রোতে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দুধপুকুরিয়া-পদুয়া এলাকায় একটি সেতু ধসে পড়েছে। শনিবার ভোর রাতে সেতুটি ভেঙে পড়ে। এ ঘটনায় বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কপথে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দুই জেলার মধ্যে সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বান্দরবান সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সেতুটির নিচ দিয়ে প্রবাহিত পানির তীব্র স্রোত কয়েক দিন ধরেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। শুক্রবার রাতে স্রোতের চাপ সহ্য করতে না পেরে সেতুর একটি বড় অংশ হঠাৎ ধসে পড়ে। এরপর নিরাপত্তার স্বার্থে সড়কটিতে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পদুয়া ইউনিয়নের দুধপুকুরিয়া সেতুটি ভেঙে পড়ায় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা হয়ে বান্দরবানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ এখন বন্ধ আছে বলে জানান দেবব্রত দাশ।

খাগড়াছড়ি
খাগড়াছড়ি জেলা ও দীঘিনালা প্রতিনিধি জানান, টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলে জেলার প্লাবিত নিম্নাঞ্চল থেকে এখনও পানি সরেনি। এতে পানিবন্দি আছে প্রায় ২০ হাজার মানুষ। এখনও থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও মাইনী, চেঙ্গী নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোর পানি কমতে শুরু করেছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়া সড়ক ভেসে উঠেছে এতে জেলার সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পাশাপাশি যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। 

দীঘিনালা উপজেলার মেরুং হেডকোয়ার্টার এলাকায় সড়কের ওপর এখনও পানি থাকায় খাগড়াছড়ির সঙ্গে দীঘিনালা-লংগদু সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে অন্যান্য এলাকার পানি কমতে শুরু করায় খাগড়াছড়ির সঙ্গে রাঙামাটি জেলা এবং সাজেকের সড়ক যোগাযোগ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।

দীঘিনালা উপজেলার ছোট মেরুং ইউনিয়নের কয়েকটি নিচু গ্রামে এখনও জলাবদ্ধতা রয়েছে। মাইনী নদীর তীরবর্তী হওয়ায় এসব এলাকা থেকে ধীরগতিতে পানি নামছে। ছোট মেরুং বাজারসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি সরে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা দোকানপাট ও বসতবাড়ি পরিষ্কারের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

রাঙামাটি
রাঙামাটি প্রতিনিধি মুহাম্মদ ইলিয়াস জানান, রাঙামাটিতে টানা সাত দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। বর্ষণের সময় জেলার ১২৮টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়াও রাঙামাটি-বান্দবান সড়কে সেতু ভেঙে দুই জেলার সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

জেলা প্রশাসন ও সড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত জেলার অন্তত ১২৮ জায়গায় ছোট-বড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। ১২৮টি পাহাড়ধসের ঘটনার অন্যতম হলো- কাপ্তাই উপজেলায় ১৫টি, বাঘাইছড়িতে ৩টি, কাউখালীতে ৩০টি, রাঙামাটি সদরে ১১টি, নানিয়ারচরে ২টি এবং বিলাইছড়িতে ৩৭টি। সহসা ভারী বর্ষণ না থামলে ৯৮টি স্থানের মতো আরও অনেক স্থানে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছে। ব্যাপক পাহাড়ধসের ঘটনায় জেলার বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং কয়েকটি এলাকার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

রাঙামাটি সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কের ব্রিজঘাট সেতুর এক পাশের বড় অংশ ধসে পড়ায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে জানান। ঘটনাস্থল বান্দরবান সড়ক বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। দ্রুত সময়ে বেইলি ব্রিজ স্থাপনের বিকল্প নেই বলে জানান এ কর্মকর্তা।


হাতিয়ায় এখনও পানির নিচে ৮০ গ্রাম
এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণ, জোয়ারের প্রভাব এবং অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার ৮০টিরও বেশি গ্রাম এখনও পানির নিচে তলিয়ে আছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর, আবার কোথাও ঘরের মেঝে পর্যন্ত পানি জমে থাকায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। পানিবন্দি হয়ে পড়া মানুষজনের অনেকেই রান্না করতে পারছেন না, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে, আর কর্মহীন হয়ে পড়েছেন দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষ।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাতিয়া পৌরসভা, সোনাদিয়া, বুড়িরচর, হরণী, চানন্দী, সুখচর, নলচিরা ও নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের নিচু এলাকাগুলো। অনেক স্থানে ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, কাঁচা-পাকা সড়ক এবং বাজারে পানি ঢুকে পড়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   ত্রাণ  অপেক্ষা  লাখো বন্যার্ত  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: