বিশ্বকাপ শুরুর আগে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল যে দলটি, সেটি নিঃসন্দেহে স্পেন। ইউরো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলকে অনেকেই ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ফেবারিট হিসেবে দেখেছিলেন। লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, পেদ্রি, রদ্রি, ফাবিয়ান রুইসদের নিয়ে গড়া এই দলকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল। তারা প্রতিপক্ষকে একের পর এক উড়িয়ে দিয়ে শিরোপার পথে এগিয়ে যাবে। কিন্তু মাঠের স্পেন সেই প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মিল রাখতে পারেনি।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই কেপভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র যেন বাস্তবতার প্রথম ইঙ্গিত দেয়। বল দখলে আধিপত্য, শত শত পাস আর নিখুঁত পজিশনিং। সবই ছিল, কিন্তু ছিল না গোলের সামনে সেই নির্মমতা। এরপরও স্পেন এগিয়েছে, তবে তাদের যাত্রা ছিল অনেকটাই ধীরগতির। প্রতিটি ম্যাচে তারা যেন কচ্ছপের গতিতে এগিয়েছে, তাড়াহুড়ো নয়; বরং হিসাবি ফুটবল খেলেই জয় তুলে নিয়েছে। তবে এই ধীরগতির ফুটবলের মাঝেও স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে তাদের রক্ষণভাগ।
চলতি বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত স্পেন মাত্র একটি গোল হজম করেছে। সেটিও এসেছে বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে। এর আগে গ্রুপ পর্ব, রাউন্ড অব বত্রিশ এবং শেষ ষোলো মিলিয়ে কোনো প্রতিপক্ষই স্পেনের জালে বল জড়াতে পারেনি। গোলের সামনে খুব বেশি ঝলমলে না হলেও নিজেদের রক্ষণকে প্রায় দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছে লা রোজারা। বিশ্বকাপে সবচেয়ে শক্তিশালী ডিফেন্সগুলোর একটি এখন নিঃসন্দেহে স্পেনের।
কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনায় স্পেনকে নিয়ে প্রত্যাশা ছিল অন্যরকম। সবাই ভেবেছিলেন লামিন ইয়ামালের বিস্ফোরক ড্রিবলিং, নিকো উইলিয়ামসের গতি, পেদ্রির সৃজনশীলতা আর রদ্রির নিয়ন্ত্রণে প্রতিপক্ষের ওপর ঝড় তুলবে স্পেন। বাস্তবে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত ঝলকের চেয়ে দলীয় শৃঙ্খলা এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তারা।
বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালেও সেই একই ছবি। জয় এসেছে ২-১ ব্যবধানে, সেমিফাইনালও নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু ম্যাচের বড় সময়জুড়ে স্পেন খেলেছে নিজেদের পরিচিত ধৈর্যশীল ছন্দে। এক গোলের লিড পাওয়ার পর তারা ম্যাচের গতি আরও কমিয়ে দিয়েছে, বলের দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করেছে। আক্রমণের চেয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য।
একসময় স্পেন মানেই ছিল চোখধাঁধানো টিকি-টাকা ফুটবল। আবার বর্তমান প্রজন্মকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল আরও দ্রুত, আরও আক্রমণাত্মক এক সংস্করণের। কিন্তু এই বিশ্বকাপে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন এক স্পেনকে। তারা সৌন্দর্যের চেয়ে ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতিপক্ষকে গোলবন্যায় ভাসানোর বদলে একটি বা দুটি গোল করেই ম্যাচ শেষ করার পরিকল্পনা নিয়েই যেন মাঠে নামছে।
এ কারণেই হয়তো বিশ্বকাপের সবচেয়ে সফল দলগুলোর একটি হয়েও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই স্পেন। বরং ফ্রান্সের কার্যকর ফুটবল, আর্জেন্টিনার কৌশলী পরিকল্পনা কিংবা মরক্কোর সাহসী লড়াই বেশি প্রশংসা পাচ্ছে। স্পেন যেন নিঃশব্দে নিজেদের কাজ করে যাচ্ছে। তারা শিরোপার দৌড়ে আছে, কিন্তু আলোচনার শিরোনামে নেই।
অবশ্য এটিই হয়তো লুইস দে লা ফুয়েন্তের পরিকল্পনা। নকআউট ফুটবলে একটি ভুলই পুরো টুর্নামেন্ট শেষ করে দিতে পারে। তাই তিনি ঝুঁকির বদলে নিয়ন্ত্রণকেই বেছে নিয়েছেন। বলের দখল ধরে রেখে ম্যাচের গতি কমানো, প্রতিপক্ষকে সুযোগ না দেওয়া এবং রক্ষণকে অভেদ্য রাখা, এই তিনটি বিষয়ই স্পেনকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে এসেছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, অনেক চ্যাম্পিয়ন দল শুরুতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফুটবল খেলেনি। বরং হিসাবি, ধৈর্যশীল এবং ফলনির্ভর ফুটবলই শেষ পর্যন্ত ট্রফি এনে দিয়েছে। স্পেনও হয়তো সেই পথেই হাঁটছে। এখন সামনে আরও বড় পরীক্ষা। সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ ফ্রান্স। সেখানে শুধু শক্তিশালী রক্ষণই নয়, আক্রমণেও নিজেদের প্রকৃত রূপ দেখাতে হবে লা রোজাদের। কারণ বিশ্বকাপের শেষ চার থেকে শুধু জিতলেই হয় না, ইতিহাসে জায়গা করে নিতে কখনো কখনো ফুটবলের সৌন্দর্যও দেখাতে হয়।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে স্পেনকে ঘিরে যতটা উন্মাদনা ছিল, এখন তার অনেকটাই স্তিমিত। কিন্তু সেটি স্পেনের জন্য হয়তো সমস্যা নয়, বরং আশীর্বাদ। কারণ তারা আলোচনার ঝড়ের মধ্যে নয়, বরং কচ্ছপের মতো ধীরে, নিশ্চিন্তে এবং নিখুঁত পরিকল্পনায় এগিয়ে যাচ্ছে। ফুটবলের ইতিহাস বহুবার দেখিয়েছে, সবচেয়ে জোরে দৌড়ানো দল নয়, বরং সবচেয়ে ধারাবাহিক দলই শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছায়।
স্পেনও সেই পথেই হাঁটছে। এখন দেখার বিষয়, আলোচনার বাইরে থেকে নীরবে এগিয়ে চলা এই লা রোজারা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফিটাও নিজেদের করে নিতে পারে কি না।
সময়ের আলো/এসএকে