কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে দেশে অনেক আলোচনা হলেও বাস্তবে নীরবে এক নতুন বিপ্লব ঘটছে মাদারীপুরের সরকারি হর্টিকালচার সেন্টারে। আধুনিক টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে এখানে উৎপাদিত হচ্ছে মাতৃগাছের হুবহু বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ও সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত চারা। ল্যাবে বর্তমানে জারবেরা, হাইব্রিড অর্কিড, লিলিয়াম, আনারস, জি-নাইন কলা, স্ট্রবেরি ও স্টেভিয়া এই সাত ধরনের ফসলের চারা উৎপাদন হচ্ছে। একই সঙ্গে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ক্যাকটাস জার্মপ্লাজম সংগ্রহশালা। ফলে বিদেশনির্ভরতা কমার পাশাপাশি কৃষক, উদ্যোক্তা ও ফুলচাষিদের কাছে স্বল্পমূল্যে উন্নত চারা পৌঁছে যাচ্ছে।
ফল, ফুল ও উচ্চমূল্যের উদ্যান ফসলের ক্ষেত্রে বিদেশি চারার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের কৃষক ও উদ্যোক্তাদের হাতে স্বল্পমূল্যে উন্নত চারা পৌঁছে দিচ্ছে সরকারি এই প্রতিষ্ঠান। গত অর্থবছরে শুধু চারা বিক্রি করেই কেন্দ্রটির আয় হয়েছে প্রায় ৫২ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছর উৎপাদন ও বিক্রির লক্ষ্য আরও বাড়ানো হয়েছে। আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারের টিস্যু কালচার ল্যাবের সহকারী টিস্যু কালচারিস্ট কৃষিবিদ মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানান, তারা ইন-ভিট্রো প্রযুক্তিতে এমন চারা তৈরি করেন, যা মাতৃগাছের হুবহু বৈশিষ্ট্য বহন করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এসব চারা সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত। ফলে মাঠে রোগবালাই কম হয় এবং উৎপাদনও বেশি পাওয়া যায়।
তিনি জানান, প্রতিটি চারা বিশেষ পুষ্টিসমৃদ্ধ মাধ্যমে তৈরি করা হয়। মাঠ থেকে সংগ্রহ করা উদ্ভিদের অংশকে জীবাণুমুক্ত করে ইনোকুলেশন করার প্রতি ২৫ থেকে ৩০ দিন পরপর সাব-কালচার করে প্রয়োজনীয়-সংখ্যক চারা উৎপাদন করা হয়। এভাবে একটি ক্ষুদ্র টিস্যু থেকে হাজার হাজার চারা উৎপাদন সম্ভব হয়।
দেশের ফুলচাষিদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে ল্যাবে উৎপাদিত জারবেরা। ভারত থেকে আমদানি করা একটি জারবেরা চারার দাম যেখানে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, সেখানে সরকারি এই কেন্দ্রে একই মানের চারা মিলছে মাত্র ৩০ টাকায়।
কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, একটি জারবেরা গাছ প্রায় তিন বছর পর্যন্ত নিয়মিত ফুল দেয়। কাটফ্লাওয়ার হিসেবে এর বাজারমূল্যও ভালো। যশোর, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, বগুড়া, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে উদ্যোক্তারা নিয়মিত এসব চারা সংগ্রহ করেন।
শীতপ্রধান দেশের জনপ্রিয় ফুল লিলিয়াম এতদিন প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর ছিল। বিদেশ থেকে বাল্ব আমদানি করতে হতো উচ্চমূল্যে। প্রথমবারের মতো এখন সেই লিলিয়ামের চারা টিস্যু কালচার প্রযুক্তিতে উৎপাদন করছে মাদারীপুরের এই ল্যাব।
কৃষিবিদ আমিনুল ইসলাম বলেন, বাজারে একটি লিলিয়াম ফুল ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। আমরা দেশেই এর চারা উৎপাদন করছি। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং কৃষক সহজেই এই ফুলের বাণিজ্যিক চাষ করতে পারবেন। চলতি বছরে প্রায় আট হাজার চারা উৎপাদিত হয়েছে। আগামী মৌসুমে উৎপাদন ২০ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ল্যাবের সবচেয়ে নতুন সংযোজন স্টেভিয়া। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সম্ভাবনাময় এই উদ্ভিদের পাতার মিষ্টতা চিনির চেয়ে অনেক বেশি হলেও এতে ক্যালরি নেই।
কৃষিবিদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য স্টেভিয়া গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। বিদেশ থেকে আমদানি করা একটি স্টেভিয়া চারার দাম ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা হলেও আমরা মাত্র ৫০ টাকায় কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। বর্তমানে পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলছে। চলতি বছর পরীক্ষামূলকভাবে পাঁচ হাজার চারা উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
অর্কিডের চারা সাধারণত বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে দামও অনেক বেশি। এই ল্যাবের বিজ্ঞানীরা টিস্যু কালচারের মাধ্যমে অর্কিড উৎপাদনে সফল হয়েছেন। আগামী বছর প্রায় ২০ হাজার অর্কিড চারা উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান কৃষিবিদ আমিনুল ইসলাম।
জি-নাইন কলা বর্তমানে দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক জাতগুলোর একটি। একটি কাঁদিতে ৪০ থেকে ৬০ হালি পর্যন্ত কলা পাওয়া যায়। ফল বড়, বাজারমূল্য ভালো এবং উৎপাদনশীলতাও বেশি। প্রতিটি চারার দাম ৪০ টাকা। ইতিমধ্যে প্রায় চার হাজার চারা উৎপাদন হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় তিন হাজারেরও বেশি চারা বিক্রি হয়েছে বলে জানান কৃষিবিদ আমিনুল ইসলাম।
এ ছাড়া রসালো ও উন্নত জাতের আনারসের চারা মাত্র ৩০ টাকায় বিক্রি করছে কেন্দ্রটি। চলতি বছরে প্রায় ছয় হাজার চারা বিক্রি হয়েছে। আগামী মৌসুমে উৎপাদন ২০ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। অন্যদিকে বারি স্ট্রবেরি-১ জাতের চারারও ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি চারা ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
শুধু টিস্যু কালচার নয়, ক্যাকটাস গবেষণাতেও আলোচনায় এসেছে মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টার। কেন্দ্রটির উপপরিচালক কৃষিবিদ আশুতোষ কুমার বিশ্বাস সময়ের আলোকে জানান, গত দুই বছরে দেশ-বিদেশ থেকে প্রায় ২১০ প্রজাতির ক্যাকটাস সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার ক্যাকটাস সংরক্ষিত রয়েছে এবং ৬০টির বেশি ভ্যারাইটি বিক্রির উপযোগী। বীজ উৎপাদন, গ্রাফটিং, ক্রসিং, স্টেম কাটিং এবং বাড সেপারেশনের মাধ্যমে নতুন নতুন জাত তৈরি করা হচ্ছে। বেসরকারি নার্সারিতে যে ক্যাকটাসের দাম ৩০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকা, সরকারি এই কেন্দ্রে টব ও গ্রোইং মিডিয়াসহ তা বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০০ টাকায়। গত অর্থবছরে ক্যাকটাস বিক্রি করে আয় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা।
রংপুর, যশোর, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, কুমিল্লা এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্যোক্তা, নার্সারি মালিক ও শৌখিন বাগানপ্রেমীরা নিয়মিত এই কেন্দ্রে আসছেন। অনেকেই একসঙ্গে শত শত চারা কিনে নিজ এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন।
কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি দামে মানসম্মত চারা পাওয়ায় কৃষকদের আস্থা বাড়ছে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রযুক্তিতে উৎপাদিত চারা বিদেশি চারার কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির বিস্তার ঘটলে উচ্চমূল্যের ফল, ফুল ও উদ্যান ফসলের উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এতে বিদেশ থেকে চারা আমদানির ব্যয় কমবে, কৃষকের উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে ও রফতানিমুখি উদ্যান খাত আরও শক্তিশালী হবে। বিদেশ থেকে ব্যয়বহুল চারা আমদানির পরিবর্তে দেশেই যদি জীবাণুমুক্ত ও মানসম্মত চারা উৎপাদন সম্ভব হয়, তা হলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং রফতানিমুখি ফুল ও উদ্যান খাত নতুন গতি পাবে।
সময়ের আলো/এসএকে