ফুটবল উন্মাদনায় মাঠের খেলায় যখন চলছে প্রিয় দলগুলোর টিকে থাকার লড়াই, তখন তাদের জয়-পরাজয় নিয়ে অনলাইনে চলছে জুয়াড়িদের মাতামাতি। তারা মেতে উঠছে নিজেদের মধ্যে দরকষাকষিতে। কোন দল জিতবে কিংবা কোন প্লেয়ার কত গোল করবে- এ নিয়ে চলছে অনলাইন বেটিং। অর্থাৎ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে মাঠের খেলার পাশাপাশি মাঠের বাইরে অনলাইনে গড়ে উঠেছে ডিজিটাল ক্যাসিনো ও স্পোর্টস বেটিংয়ের এক বিশাল অবৈধ বাজার। আর এতে করে নিঃস্ব হচ্ছে অনেক পরিবার।
গত ১১ জুন শুরু হয়েছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। এবারের খেলায় অংশগ্রহণ করেছে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলসহ ৪৮টি দেশ। প্রথম তিন ধাপ শেষ করে চলছে কোয়ার্টার ফাইনাল অর্থাৎ চতুর্থ ধাপের খেলা। এরপর পঞ্চম ধাপে সেমিফাইনালের পর ষষ্ঠ ধাপে হবে সেমিফাইনালে টিকে যাওয়া দুই দলের চূড়ান্ত লড়াই কিংবা শিরোপা যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সরব অনলাইন জুয়াড়িরা।
অনলাইনে ফ্রিতে কেউ লেখা দেখার লিংক খুঁজলে সহজেই তার সামনে অনলাইন জুয়ার লিংক দিয়ে দিচ্ছে তারা। এতে শুরুতে কেউ কৌতূহল নিয়ে আগ্রহ দেখালেও পরে আটকে যায় অনলাইন জুয়ার ফাঁদে। এমনই একজন মো. রাশেদুল হক (২২)। পেশায় একজন শিক্ষার্থী। খেলার সময় তিনি মজেছেন অনলাইন জুয়ায়। এখন পর্যন্ত একটি বেটিং জিতলেও হেরেছেন বেশিরভাগ বাজিতে।
নাম পরিচয় গোপন রেখে তিনি বলেন, মোবাইলে ফ্রি বিশ্বকাপ খেলা দেখার জন্য গুগলে লিংক খুঁজতে
থাকি। এ সময় ওপরে থামবেলে ‘ফ্রিতে লাইভ খেলা দেখুন’ লেখা দেখে ক্লিক করি, এরপর সাইটে ক্লিক করে দেখি এটি একটি জুয়ার সাইট। প্রথমে কৌতূহলবশত কিছু টাকা বাজি ধরি। প্রথমবার জিতলেও পরের কয়েকবার হেরে গেছি। হারানো টাকা তুলতে গিয়ে আরও বেশি হেরেছি। এখন আমি খুবই হতাশ। কেন যে সেদিন ওই লিংকে ক্লিক করলাম। এ তো গেল না জেনে খেলার গল্প।
এর বাইরে অনেকে আছে যারা জেনেই খেলছেন এই মরণব্যাধি খেলা। সম্প্রতি ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে দেশে বেশ কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশের তদন্ত ও পরিবারের পক্ষ থেকে সাইবার বুলিংয়ের কথা বলা হলেও এর পেছনে অনলাইন জুয়ার প্রভাব থাকতে পারে বলে মনে করেন সাইবার বিশেষজ্ঞরা। তাই প্রতিটি মৃত্যুর পেছনের কারণ গভীর তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করার পরামর্শ সাইবার বিশ্লেষকদের।
এ প্রসঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা সময়ের আলোকে বলেন, ফুটবল বিশ্বব্যাপী অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। বড় টুর্নামেন্টের সময় মানুষের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে অনলাইন জুয়া চক্রগুলো অত্যন্ত আক্রমণাত্মকভাবে প্রচার চালায়।
অনেক সময় ‘লাইভ ম্যাচ’ ‘ফ্রি স্ট্রিমিং’ ‘এসডি লাইভ’ বা ‘ওয়াচ নাউ’ এই ধরনের কী ওয়ার্ড ব্যবহার করে ব্যবহারকারীদের জুয়ার ওয়েবসাইট বা অ্যাপে নিয়ে যাওয়া হয়। এটি মূলত ডিজিটাল মার্কেটিং, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন, সোশ্যাল মিডিয়া বিজ্ঞাপন এবং শর্ট লিংকের অপব্যবহারের মাধ্যমে করা হয়। এটি শুধু জুয়ার বিষয় নয়, বরং একটি সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিও। কারণ এসব সাইটে ব্যক্তিগত তথ্য, মোবাইল ব্যাংকিং তথ্য বা ব্যাংক কার্ডের তথ্য চুরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তাই খেলা দেখার নামে অজানা লিংকে প্রবেশ না করা এবং শুধু বৈধ সম্প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করা জরুরি।
খেলা দেখে আত্মহত্যা করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে কোনো একটি কারণকে দায়ী করা বৈজ্ঞানিক বা আইনগতভাবে সঠিক হবে না। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনের কারণ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হয়। তবে তিনটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা উচিত। যেমন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনলাইন জুয়ায় আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছিলেন কি না। তিনি সাইবার বুলিং, ট্রলিং বা সামাজিক অপমানের শিকার হয়েছিলেন কি না এবং তার মানসিক, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত অন্য কোনো সংকট ছিল কি না। ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্তে মোবাইল ফোন, লেনদেনের তথ্য, ব্রাউজিং হিস্ট্রি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা এবং অনলাইন অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করে এসব বিষয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব। তাই কোনো ঘটনা ঘটলে শুরু থেকেই ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জুয়া ও বাজির আসরে পরিণত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে টুর্নামেন্টজুড়ে বিশ্বব্যাপী শুধু বৈধ বাজারেই প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজি ধরা হতে পারে। যা ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের (৩৫ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় অনেক বেশি। এর বাইরে অবৈধ বা অনিয়ন্ত্রিত বাজারে লেনদেন হচ্ছে আরও কয়েকশ বিলিয়ন ডলার। কারণ বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৩২টি দলের পরিবর্তে ৪৮টি দেশ অংশ নিয়েছে। ফলে ম্যাচের সংখ্যা ৬৪ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১০০টিরও বেশি হয়েছে। ম্যাচের সংখ্যা বাড়ার কারণে জুয়াড়িদের বাজি ধরার সুযোগ এবং জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবসার পরিধিও সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
যেসব অ্যাপ ও উপায়ে ফুটবল বিশ্বকাপে জুয়া খেলা হচ্ছে : জুয়াড়িরা মূলত আন্তর্জাতিক কিছু বুকমেকার অ্যাপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফাঁদ ব্যবহার করে বাজি ধরছে। এর মধ্যে ‘ওয়ানএক্সবেট’ ‘মেলবেট’ ‘মোস্টবেট’ ‘লাইনবেট’ ও ‘বাজি ৯৯৯’ অ্যাপে সবচেয়ে বেশি বাজি ধরা হয়। এ ছাড়া ‘লাইভ বেটিং’ খেলা চলাকালীন প্রতি মিনিটে বাজি ধরা হয়- যেমন পরবর্তী গোল কে করবে, প্রথমার্ধে কয়টি কর্নার হবে, কোন খেলোয়াড় হলুদ কার্ড দেখবে ইত্যাদি। এ ছাড়া প্রতারকরা ফিফার আদলে ভুয়া ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক-টেলিগ্রামে ফ্রি ‘লাইভ ম্যাচ লিংক’ ছড়িয়ে দিচ্ছে এসব লিংকে ক্লিক করলেই জুয়ার অ্যাপ ডাউনলোড হয়ে যাচ্ছে ব্যক্তির ফোনে।
বিশ্বকাপের মৌসুমে জুয়ায় সর্বস্বান্ত হয়ে বহু পরিবারে অশান্তি, ডিভোর্স এবং সামাজিক অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে। কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ১ জুলাই ২০২৬ থেকে অত্যন্ত কড়া (জুয়া প্রতিরোধ আইন ২০২৬) আইন কার্যকর করেছে। নতুন আইন অনুযায়ী কেউ অনলাইন জুয়ার অ্যাপ বা সাইট পরিচালনা করলে তাকে সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল এবং ৫ কোটি টাকা জরিমানা করা হবে। এ ছাড়া সাধারণ ব্যবহারকারী হিসেবে বাজি ধরলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের জেল বা ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
সম্প্রতি দেশে সক্রিয় ২৬৮টি অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট শনাক্ত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এসব ওয়েবসাইট বন্ধ করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে অনলাইন বেটিং কার্যক্রমে ব্যবহৃত ২ হাজার ২২১টি ব্যাংক হিসাব নম্বর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) পাঠিয়েছে সংস্থাটি। সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) ডিআইজি সানা শামীনুর রহমান বলেন, আমাদের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিটিআরসি ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট বন্ধ করেছে। বাকি সাইটগুলোর বিরুদ্ধেও পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করছি।
সানা শামীনুর রহমান জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে জুয়ার বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে এবং অনলাইন ক্যাসিনোর মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বেটিং পরিচালিত হচ্ছিল। অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে সিআইডির অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত মে মাস থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে এখন পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বিটিআরসি সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ‘গেমব্লেলিং ওয়েবসাইট’ ‘ফেসবুক লিংক’ ‘ইউটিউব’ ও টিকটক লিংকসহ সর্বমোট ২২৫৫টি জুয়ার সাইট বন্ধ করেছে বিটিআরসি। এ ছাড়া ৫৯৪টি জুয়া-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ও ৪৮৬টি আইপিটিভি বন্ধ করেছে সংস্থাটি। যা গত বছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে ১৭৬৮টি জুয়ার সাইট বন্ধ করা হয়।
এ প্রসঙ্গে বিটিআরসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সময়ের আলোকে জানান, অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট পরিচালনাকারীদের শনাক্তকরণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিটিআরসি সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটগুলো বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। তবে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি চক্র একটি ওয়েবসাইট বন্ধ হয়ে গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন নামে একাধিক ওয়েবসাইট চালু করে তাদের অবৈধ কার্যক্রম অব্যাহত রাখে।
সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে সাইট ব্লক করা অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু এটি একা দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট নয়। অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু ‘সাইট ব্লকিং’ হিসেবে দেখলে হবে না। এটি প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক লেনদেন, আইন প্রয়োগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জনসচেতনতা এই পাঁচটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে নিয়ে পরিচালিত একটি সমন্বিত কৌশল হওয়া উচিত। কারণ বর্তমান অনলাইন জুয়া নেটওয়ার্ক খুব দ্রুত নতুন ডোমেইন, মিরর সাইট, ‘ভিপিএন’ ‘সিডিএন’ এবং ক্লাউড অবকাঠামো ব্যবহার করে আবার কার্যক্রম শুরু করতে পারে। আমার মতে কয়েকটি বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যেমন- শুধু ওয়েবসাইট নয়, অর্থ লেনদেনের পথও বন্ধ করতে হবে।
মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ব্যাংকিং চ্যানেল ও ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন নজরদারিতে আনতে হবে। ফেসবুক, টেলিগ্রাম, ইউটিউব, টিকটক ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে জুয়ার প্রচারণা দ্রুত অপসারণের জন্য কার্যকর সমন্বয় দরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নতুন জুয়ার ডোমেইন, বিজ্ঞাপন ও প্রচার দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। আন্তর্জাতিক ডোমেইন রেজিস্ট্রার, হোস্টিং কোম্পানি ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, কারণ চাহিদা কমলে এই ব্যবসাও দুর্বল হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা দরকার।
সময়ের আলো/এসএকে