বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বছরে একবার দানার জন্য ভুট্টা চাষের পরিবর্তে পশুখাদ্য হিসেবে বছরে দুইবার ভুট্টা চাষ করলে কৃষকদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে সারা বছর গবাদি পশুর খাদ্যের নিশ্চয়তা তৈরি হবে, মৌসুমি বন্যাকালীন সময়ে জীবিকা নির্বাহ সহজ হবে এবং গবাদিপশু পালন স্থায়িত্ব লাভ করবে। মূলত বর্ষাকালে দীর্ঘ ছয় মাস ধরে চলা জলমগ্ন অবস্থায় পশুখাদ্যের যে তীব্র সংকট দেখা দেয়, তা সমাধানে এই পদ্ধতি দারুণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল নিউট্রিটিন বিভাগের অধ্যাপক ড. খান মো. সাইফুল ইসলাম সম্প্রতি এক গবেষণার বরাতে এসব তথ্য জানিয়েছেন
গবেষকেরা জানান, দেশের হাওর বাস্তুতন্ত্র প্রায় ২০ লাখ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যা বাংলাদেশের মোট ভূমির প্রায় ১৪ শতাংশ। বছরের প্রায় অর্ধেক সময় এই অঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে থাকে। ফলে গবাদিপশু তীব্র খাদ্য সংকটের মুখে পড়ে। পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে কৃষকেরা অনেক সময় কম বয়সেই গবাদিপশু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন, যার কারণে পারিবারিক আয় ও গবাদি পশুর উৎপাদনশীলতা উভয়ই হ্রাস পায়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) গবেষণা অনুদানের আওতায় পশুখাদ্য সংরক্ষণের একটি টেকসই প্রযুক্তি প্রবর্তন করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের গবেষণার পর এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বছরে দুইবার ভুট্টা ঘাস উৎপাদন এবং সাইলেজ (সংরক্ষিত পশুখাদ্য) তৈরির ওপর ভিত্তি করে একটি উদ্ভাবনী পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এতে দানার জন্য অপেক্ষা না করে কৃষকেরা শুষ্ক মৌসুমে দুইবার সম্পূর্ণ ভুট্টা গাছ (সবুজ ঘাস হিসেবে) চাষ করেন এবং বর্ষাকালে গবাদি পশুকে খাওয়ানোর জন্য তা সাইলেজ হিসেবে সংরক্ষণ করেন।
এই পদ্ধতিতে প্রতি একরে প্রায় ৩২.৭ টন বায়োমাস উৎপাদিত হয়েছে, যা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় আট গুণেরও বেশি। যদিও এতে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি, তবুও শুধুমাত্র দানার জন্য উৎপাদিত ভুট্টার তুলনায় এই পদ্ধতিতে চার গুণেরও বেশি মুনাফা অর্জিত হয়। সংরক্ষিত ভুট্টার সাইলেজ দুগ্ধবতী গরুর জন্য অত্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে দেখা গেছে, সাইলেজ ব্যবহারের ফলে বন্যা মৌসুমে গরুর দৈহিক ওজন হ্রাস রোধের পাশাপাশি দৈনিক গড় দুধের উৎপাদন প্রতি গরুতে ৩.৭ লিটার থেকে বেড়ে ৫.৫৮ লিটারে উন্নীত হয়েছে।
গবেষণায় আরও নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, হাওর অঞ্চলে গবাদি পশুর প্রচলিত খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত ধানের খড়ের তুলনায় ভুট্টার সাইলেজ অনেক বেশি পরিমাণে প্রোটিন ও শক্তি সরবরাহ করে।
ড. সাইফুল জানান, কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার হাসানপুর, মহিষারকান্দি ও উরিঅন্দ গ্রামের তিন শতাধিক কৃষক এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করেন। শুরুতে কৃষকদের কাছে সাইলেজ তৈরির বিষয়টি নতুন ও অপরিচিত ছিল। তবে বর্ষাকালে গবাদি পশুর উন্নত স্বাস্থ্য, অধিক দুধ উৎপাদন এবং খাদ্যের সংকট কমে যাওয়া প্রত্যক্ষ করার পর তারা দ্রুত এই প্রযুক্তিটি গ্রহণ করেন।
এই সাইলেজের ধারণাটি হাওর অঞ্চলে ভুট্টা চাষ বিষয়ক চিন্তাধারায় একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। শুধুমাত্র ভুট্টার দানার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে কৃষকেরা এখন সম্পূর্ণ ফসলটিকে উচ্চমানের সাইলেজে রূপান্তর করতে পারছেন। ফসল ও গবাদি পশুর সমন্বিত এই পদ্ধতিটি হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রাখছে।
প্রযুক্তিটির দারুণ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন গবেষকেরা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, কৃষকদের সচেতনতার অভাব। সাইলেজ তৈরির আধুনিক যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা। উন্নত মানের ভুট্টা বীজের ঘাটতি। প্লাস্টিক বা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব। সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তির সীমিত সুযোগ। কৃষি সম্প্রসারণ সেবার পর্যাপ্ততার ঘাটতি।
কেজিএফ-এর অর্থায়নে ২০২৩ সালের নভেম্বরে তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটি শুরু হয়। এতে প্রধান গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ড. খান মো. সাইফুল ইসলাম।
পাশাপাশি কেজিএফ-এর একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি দল এই প্রকল্পটির নিবিড় তদারকি করছেন। দলটিতে রয়েছেন,অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক ড. নাথু রাম সরকার, জলবায়ু ও প্রাকৃতিক সম্পদ জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ ড. মো. মনোয়ার করিম খান, উদ্যান ফসলের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ ড. এম. নাজিরুল ইসলাম, প্রাণিসম্পদের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ ড. মো. এরশাদউজ্জামান।
সম্প্রতি এই কারিগরি দলটি প্রকল্পের মাঠ পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন, সাইলেজ তৈরি ও ব্যবহারের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন এবং হাওর অঞ্চলে এই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারে উৎসাহ প্রদান করেন।
এটি কেবল একটি নতুন শস্য উৎপাদন পদ্ধতিই নয়, বরং বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ হাওর এলাকায় শস্য ও গবাদি পশু পালনকে সমন্বিত করার মতো একটি সম্ভাবনাময় জীবিকা কৌশল। সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত সহায়তার মাধ্যমে এই প্রযুক্তি দেশের বন্যাপ্রবণ জলাভূমি এলাকায় টেকসই কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।
সময়ের আলো/জোই