দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আলোচনা জোরালো হতেই সারা দেশে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে বিএনপি। এখন পর্যন্ত শুধু ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডেই কাউন্সিলর প্রার্থী হতে চান ১২ জন। তাদের বেশিরভাগ ওয়ার্ড বিএনপির পদধারী নেতা।
এ ছাড়া যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং ছাত্রদল নেতাও প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশের চিত্র এমনই। প্রতিটি উপজেলা থানা ও ওয়ার্ডে বিএনপি প্রার্থীর ছড়াছড়ি। এ পরিস্থিতিতে একক প্রার্থী বাছাই, দলীয় সমর্থন নির্ধারণ এবং বিদ্রোহী প্রার্থী সামাল দেওয়া- এ তিনটি বিষয়ই এখন বিএনপির সামনে বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নানামুখী হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে গেছে। সম্ভাব্য এ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বিএনপি। দলটির জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে প্রতিটি পদে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করে সমর্থন দেওয়া এবং সমর্থনবঞ্চিত প্রার্থীদের বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমের পর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। নির্বাচন কমিশন থেকেও বলা হয়েছে, আগস্টে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে।
নির্বাচনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুনে প্রার্থী হওয়ার জানান দিচ্ছেন বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। এরই মধ্যে বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য নিজ নিজ দলের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে।
বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম পুরোপুরি সক্রিয় হয়েছে। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও নেতাকর্মীরা জোরালো ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
ইতোমধ্যে একই পদে একাধিক শক্তিশালী ও জনপ্রিয় নেতা আগ্রহ প্রকাশ করায় একক প্রার্থী চূড়ান্ত করে সমর্থন দেওয়া যেমন কঠিন হবে, তেমনি বিদ্রোহী প্রার্থীদের সামলে সমর্থিত প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করাও কঠিন। কারণ এবারের নির্বাচন হবে নির্দলীয়। ফলে দল একজনকে সমর্থন দিলেও যেকোনো প্রার্থীর নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না। দল সমর্থিত প্রার্থীকে শুধু নিজ দলের অন্য প্রার্থীদের নয় বিরোধী দলের প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হতে হবে, যা নির্বাচনের ফলাফলে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের মতো নয়। এখানে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, পারিবারিক ঐতিহ্য, স্থানীয় প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের জনসম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিএনপি শীর্ষ নেতারা বলছেন, বিএনপি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। এ দলে নেতার সংখ্যা বেশি হওয়া স্বাভাবিক। সেই জন্য যেকোনো নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীও বেশি দেখা যায় এবারও ব্যতিক্রম নয়। প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও এলাকায় গ্রহণযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা একজনকে সমর্থন দেবেন।
এবার বিতর্কিতদের স্থান দেওয়া হবে না এবং বিএনপির নাম ভাঙিয়ে যারা সুবিধা নিচ্ছে তাদের বিষয়েও দল সতর্ক রয়েছে। যারা দলের নির্দেশ অমান্য করবেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ ব্যক্তির চেয়ে দল বড়।
বিএনপির বিভিন্ন জেলার নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে তিন থেকে ছয়জন পর্যন্ত বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে কাজ শুরু করেছেন। একইভাবে পৌর মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে প্রস্তুতি নেওয়া নেতার সংখ্যা আরও বেশি। তাদের প্রত্যেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ, মামলা-হামলা মোকাবিলা এবং দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কারণে মনোনয়নের ক্ষেত্রে তারা অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবিদার।
এমন পরিস্থিতিতে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা যেমন বাড়বে, তেমনি মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। অতীতে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় দলগুলোর বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের নজির রয়েছে। তাই বিএনপিকেও একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কার্যকর কৌশল গ্রহণ করতে হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণের ক্ষেত্রে জরিপ, স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামত, সাংগঠনিক মূল্যায়ন এবং জনগ্রহণযোগ্যতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে মনোনয়ন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক করা গেলে অসন্তোষ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, সম্ভাব্য নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূলের সাংগঠনিক অবস্থা, নেতাদের জনপ্রিয়তা এবং বিগত সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। কেন্দ্রীয় নেতারাও স্থানীয় পর্যায়ের মতামত গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী বাছাইয়ের পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে পানি সম্পদমন্ত্রী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সময়ের আলোকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ার বিষয়ে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে সারা দেশের প্রত্যেকটা ইউনিয়ন উপজেলায়, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে প্রার্থিতা ঘোষণা করছে। বিরোধী দল কমিটমেন্ট থেকে সরে গেছে। কিন্তু বিএনপি এমন কিছু এখনও করেনি।
তিনি বলেন, আমরা প্রার্থী ঘোষণা বা সমর্থন করব কি না সেটাও তো পার্টির মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। ঘোষণা দেওয়া এবং সমর্থন করা এক না।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপির মতো বড় দলে সম্ভাব্য প্রার্থী সবসময়ই বেশি থাকে। সে ক্ষেত্রে দল কৌশল নির্ধারণ করবে। দল যে সিদ্ধান্ত নেবে স্থানীয় নেতারা সেটা মেনে দলকে আরও শক্তিশালী ও সংগঠিত করবেন। বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে দল সিদ্ধান্ত নেবে।
তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে যারা কাজ করেছেন, তাদের দল বিবেচনা করবে। এলাকায় যাদের জনপ্রিয়তা আছে, তাদেরই মূল্যায়ন করা হবে। এর বাইরে কাউকে দেওয়া হবে না।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি