চলমান ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০ শতাংশ মাশুল (ফি) আদায়ের যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক ও আইনি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত সোমবার নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প নিজেকে ‘হরমুজ প্রণালীর অভিভাবক’ দাবি করে এই খরচের বোঝা চাপানোর ঘোষণা দেন। তবে জাহাজ চলাচল ও আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিশেষজ্ঞরা এই প্রস্তাবের কার্যকারিতা এবং বৈধতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন।
সেন্টার ফর মেরিটাইম স্ট্র্যাটেজির সিনিয়র ফেলো এবং জাহাজ লজিস্টিকস কোম্পানি ট্রেইলার ব্রিজের সাবেক সিইও জন ম্যাককাউন মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, কেউ এই সেবা নিতে আগ্রহী কি না, তা মূল্যায়নের আগে এর সঠিক খরচ কত তা জানা জরুরি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ট্রাম্পের এই ২০ শতাংশ ফি কীভাবে হিসাব করা হবে? এটি কি মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ বা এসকর্ট (পাহারা) দেওয়ার খরচের ২০ শতাংশ, নাকি জাহাজে থাকা পণ্যের মোট মূল্যের ২০ শতাংশ— তা এখনও অস্পষ্ট। এই বিষয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকেও কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ম্যাককাউন জানান, সাধারণত আমদানিকারকরা পণ্য পরিবহনের জন্য মোট মূল্যের মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ ভাড়া বা ফি দিয়ে থাকেন। তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি অর্থাৎ ২০ শতাংশ ফি দেওয়া শিপিং কোম্পানিগুলোর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে শেষ পর্যন্ত এই রুটে জাহাজ চলবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত হয়তো বিমাকারী (ইন্সুরেন্স) কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভর করবে। ঝুঁকি বেশি মনে করলে তারা কোনো জাহাজেরই বিমা করতে রাজি হবে না, তখন মার্কিন নিরাপত্তা নিয়েও লাভ হবে না।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালী একটি মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ, যেখানে সব দেশের জাহাজের অবাধ যাতায়াতের অধিকার রয়েছে। এর আগে ইরান এই প্রণালীতে এক ধরনের ‘সার্ভিস ফি’ বা টোল আদায়ের চেষ্টা করেছিল, যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
ইউএস নেভাল ওয়ার কলেজের আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের অধ্যাপক জেমস ক্রাসকা ট্রাম্পের টুইট বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি বলে— আমরা এই জলপথ দিয়ে জাহাজ পাহারা দিয়ে নিয়ে যাব, আর আপনি যদি আমাদের বহরে যোগ দিতে চান তবে এই খরচ দিতে হবে— তাহলে সেটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করবে না। কারণ এটি হবে একটি ‘ঐচ্ছিক সেবা’। কিন্তু কেউ যদি এই টাকা না দিলে প্রণালী দিয়ে পার হতে পারবে না এমন নিয়ম করা হয়, তবে তা হবে সম্পূর্ণ অবৈধ।’ তবে আইনিভাবে সম্ভব হলেও এমন পদক্ষেপ নেওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না বলে তিনি মনে করেন।
পণ্যবাহী জাহাজের ডেটা অ্যানালিটিকস প্ল্যাটফর্ম ‘জেনেটা’-এর নির্বাহী শিল্প উপদেষ্টা বিয়র্ন ভ্যাং জেনসেন ঐতিহাসিক এক উদাহরণ টেনে বলেন, ‘বিশ্বে সর্বশেষ ১৪০০ থেকে ১৮০০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ডেনমার্ক তাদের ‘ওরেসুন্ড’ প্রণালী পার হওয়ার জন্য বিদেশি জাহাজের পণ্যের মূল্যের ওপর এভাবে কর আদায় করত। মজার বিষয় হলো, আমেরিকার হস্তক্ষেপের কারণেই ডেনমার্কের সেই জোরপূর্বক কর আদায়ের প্রথা বন্ধ হয়েছিল। আর আজ খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টই সেই একই ধরনের প্রথা চালু করতে চাইছেন।’
সময়ের আলো/কহু