২৮ বছর পর বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে ফিরেছে নরওয়ে। তবে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দেশটির ফুটবল অঙ্গনে আরেকটি বিষয়ও আলোচনায় এসেছে— ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে নরওয়ের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণ সমর্থকদের প্রতিবাদ বা গ্যালারির স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশন প্রাতিষ্ঠানিক ও কূটনৈতিক উপায়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চাপ তৈরির চেষ্টা করছে।
বিশ্বকাপের পথে নরওয়ের যাত্রায় ইসরায়েলও ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপক্ষ। আরব ও মুসলিম দেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ১৯৯৪ সাল থেকে ইসরায়েল ইউরোপীয় অঞ্চলের ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অক্টোবরে অসলোতে অনুষ্ঠিত একটি বাছাইপর্বের ম্যাচে নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশন ঘোষণা দেয়, ওই ম্যাচ থেকে অর্জিত সব অর্থ গাজায় মানবিক সহায়তার জন্য দেওয়া হবে। ম্যাচ চলাকালে স্টেডিয়ামে ফিলিস্তিনি পতাকা, কেফিয়া পরা সমর্থক এবং ‘শিশুদের বাঁচতে দাও’ লেখা ব্যানার দেখা যায়। ইসরায়েলের জাতীয় সংগীত বাজানোর সময়ও দর্শকদের একটি অংশ প্রতিবাদ জানায়।
তবে নরওয়ের অবস্থান শুধু মাঠের প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির ফুটবল কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতর থেকেই চাপ তৈরির পথ বেছে নিয়েছে।
এই কৌশল নরওয়ের দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ১৯৭৮ সালের ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পর মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ায় নরওয়ের ভূমিকা তৈরি হয়। পরবর্তীতে ১৯৯০-এর দশকে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে ঐতিহাসিক ওসলো চুক্তি সম্পাদনেও নরওয়ের মধ্যস্থতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ ও বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে বিতর্ক বাড়তে থাকায় নরওয়ের অবস্থানও ধীরে ধীরে কঠোর হয়।
বর্তমানে নরওয়ে ফুটবল কর্তৃপক্ষের যুক্তি হলো, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর যেভাবে রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, একই নীতি ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা উচিত। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ২০২৪ সালে ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞার যে দাবি তুলেছিল, নরওয়ে সেটিকে সমর্থন করেছে।
তুরস্কের অবস্থানকে অনেকেই ধর্মীয় বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করতে পারেন, আর আয়ারল্যান্ড বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা করতে পারেনি— এমন পরিস্থিতিতে নরওয়ের এই প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা ইসরায়েলবিরোধী প্রচেষ্টাকে ফুটবলের মূলধারার আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
এই উদ্যোগের অন্যতম মুখ নরওয়ের সাবেক ফুটবলার লিস ক্লাভেনেজ। তিনি বর্তমানে একজন আইনজীবী এবং উয়েফার কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময়ও তিনি মানবাধিকার ও এলজিবিটিকিউ অধিকার নিয়ে ফিফা কংগ্রেসে সরব ছিলেন।
নরওয়ের খেলোয়াড়দের মধ্যেও এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দলের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড ২০২৫ সালের শুরুতে জানিয়েছিলেন, গাজার পরিস্থিতি ইসরায়েলের বিপক্ষে ম্যাচের প্রেক্ষাপটে উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়।
এ ছাড়া নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড ২০২৩ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছিলেন। ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া এক ইসরায়েলি জিম্মির সঙ্গে তার ভিডিও কলে কথা বলার দৃশ্যও প্রকাশ্যে আসে।
সব মিলিয়ে, নরওয়ের অবস্থান এখন শুধু ফুটবল মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশটি ফুটবলের আন্তর্জাতিক কাঠামো ব্যবহার করে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও মানবাধিকার ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ