বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনাল মানেই তীব্র উত্তেজনা, চাপ আর ইতিহাস তৈরির মুহূর্ত। এই পর্যায়ের ম্যাচগুলোতে শুধু জয়-পরাজয় নয়, অনেক সময় জন্ম নেয় এমন সব ঘটনা, যা বছরের পর বছর ফুটবলপ্রেমীদের মনে থেকে যায়।
আসন্ন সেমিফাইনালের আগে বিশ্বকাপের বিভিন্ন আসরের এমন কিছু মজার, আবেগঘন ও অবিশ্বাস্য ঘটনা তুলে ধরেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।
শর্টস সামলে পেনাল্টি গোল মিয়াজ্জার
১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল ইতালি। ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত ছিল জুজেপ্পে মিয়াজ্জার পেনাল্টি।
‘ইল বালিল্লা’ নামে পরিচিত এই ইতালিয়ান তারকা যখন স্পট কিকে দাঁড়ান, তখন তাকে শুধু গোলরক্ষককে নয়, নিজের পোশাকের সমস্যাকেও সামলাতে হয়েছিল।
ম্যাচের শুরুতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া শর্টসের ইলাস্টিক পেনাল্টির মুহূর্তে পুরোপুরি ছিঁড়ে যায়। এক হাতে শর্টস ধরে রেখেই পেনাল্টি নেন মিয়াজ্জা এবং বিশেষজ্ঞ গোলরক্ষক ওয়াল্তারকে পরাস্ত করে গোল করেন।
লাল কার্ডের পরও গারিঞ্চার পাশে চিলি
১৯৬২ সালের সেমিফাইনালে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ছিল স্বাগতিক চিলি। ম্যাচে ব্রাজিলের ৪-২ গোলের জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন গারিঞ্চা।
তার অসাধারণ ড্রিবলিং, দুটি গোল এবং একটি অ্যাসিস্টে মুগ্ধ হয় দর্শকরা। স্বাগতিক দলকে হারানোর পরও চিলির সমর্থকদের কাছ থেকে বিদ্বেষ নয়, বরং ভালোবাসা পান তিনি।
তবে ম্যাচের শেষ দিকে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় গারিঞ্চাকে। এর অর্থ ছিল ফাইনালে তার না খেলার সম্ভাবনা। বিষয়টি নিয়ে চিলিজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। এমনকি দেশটির প্রেসিডেন্ট হোর্হে আলেসান্দ্রির নেতৃত্বে তাকে ফাইনালে খেলানোর জন্য আবেদন করা হয়।
শেষ পর্যন্ত ফিফা তাকে ফাইনালে খেলার অনুমতি দেয়। পরে চেকোস্লোভাকিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতে ব্রাজিল।
শুমাখারের সংঘর্ষ ও বাতিস্তোঁর যন্ত্রণা
১৯৮২ সালের সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানি ও ফ্রান্সের ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের বিতর্কিত ঘটনাগুলোর একটি হয়ে আছে।
ম্যাচ চলাকালে জার্মান গোলরক্ষক টনি শুমাখার গোলপোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসে ফ্রান্সের পাত্রিক বাতিস্তোঁকে ভয়াবহভাবে আঘাত করেন। এতে বাতিস্তোঁর দুটি দাঁত ভেঙে যায়, পাঁজরে চিড় ধরে এবং মেরুদণ্ডেও আঘাত লাগে।
ঘটনার পরও শুমাখারের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আহত বাতিস্তোঁকে মাঠে চিকিৎসা দেওয়া হলেও শুমাখারের আচরণে ফরাসি সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়।
শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে দুটি শট ঠেকিয়ে পশ্চিম জার্মানিকে ফাইনালে নিয়ে যান শুমাখার।
গ্যাসকোইনের কান্নায় কেঁদেছিল ইংল্যান্ড
১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ২৪ বছর পর প্রথমবার সেমিফাইনালে ওঠে। সেই যাত্রায় বড় ভূমিকা ছিল পল গ্যাসকোইনের, যিনি ‘গাজ্জা’ নামে পরিচিত ছিলেন।
পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে হলুদ কার্ড পান গ্যাসকোইন। আর সেই কার্ডই তার জন্য হয়ে ওঠে হৃদয়ভাঙার কারণ। কারণ ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে তিনি খেলতে পারতেন না।
নিজের স্বপ্নভঙ্গের সেই মুহূর্তে মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। পরে গ্যাসকোইন বলেন, ছোটবেলা থেকে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন ছিল তার, আর সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পর এমনভাবে শেষ হওয়া ছিল কষ্টকর।
ইংল্যান্ড কোচ ববি রবসনও মনে করেছিলেন, এটি শুধু একজন খেলোয়াড়ের নয়, পুরো দলের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।
তবে সেই কান্নাই গ্যাসকোইনকে ইংল্যান্ডের মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। তার আবেগ ও পারফরম্যান্স তাকে জাতীয় নায়কে পরিণত করে।
ডিফেন্ডার থুরামের অবিশ্বাস্য দিন
ফ্রান্সের ডিফেন্ডার লিলিয়ান থুরাম সাধারণত গোল করার জন্য পরিচিত ছিলেন না। জাতীয় দলের হয়ে ১৪২ ম্যাচে তার গোল ছিল মাত্র একটি। ক্লাব ফুটবলেও ১১ মৌসুমে তিনি করেছিলেন মাত্র এক গোল।
কিন্তু ১৯৯৮ সালের সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে বদলে যায় সব হিসাব।
স্বাগতিক ফ্রান্স যখন কঠিন লড়াইয়ে, তখন থুরামই হয়ে ওঠেন দলের নায়ক। ডান ও বাম দুই পায়ে দুটি গোল করে ফ্রান্সকে ২-১ ব্যবধানে জিতিয়ে ফাইনালে তুলে দেন তিনি।
তার এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে এতটাই আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন তার মা যে গ্যালারিতেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
রোনালদোর অদ্ভুত চুলের গল্প
২০০২ সালের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে চোট পাওয়ার পর ব্রাজিলের রোনালদোকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল নানা প্রশ্ন। তিনি সেমিফাইনালে খেলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে চলছিল আলোচনা।
এসব প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে রোনালদো নিজের চুলের স্টাইল পরিবর্তন করেন। মাথার সামনের অংশে অদ্ভুত ধরনের চুল রেখে তিনি সবার দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন।
পরে তিনি জানিয়েছিলেন, সাংবাদিকরা তার চোটের বদলে নতুন হেয়ারস্টাইল নিয়ে বেশি প্রশ্ন করছিলেন, এতে তিনি স্বস্তি পেয়েছিলেন।
তুরস্কের বিপক্ষে সেমিফাইনালে রোনালদোর একমাত্র গোলেই ব্রাজিল ফাইনালে ওঠে। পরে তিনি মজা করে বলেন, তার সেই হেয়ারস্টাইল দেখে যেসব মা তাদের সন্তানদের একইভাবে চুল কাটতে দিয়েছিলেন, তাদের কাছে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
কান্নাভারোর অসম্ভব হেড
২০০৬ সালের সেমিফাইনালে ইতালির অধিনায়ক ফাবিও কান্নাভারো দেখিয়েছিলেন অসাধারণ নেতৃত্ব।
উচ্চতায় জার্মানির পের মের্টেস্কারের চেয়ে তিনি ২২ সেন্টিমিটার খাটো ছিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে সেই উচ্চতার পার্থক্যকে হার মানিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হেডে জার্মানির আক্রমণ ঠেকিয়ে দেন তিনি।
তার সেই ক্লিয়ারেন্স থেকেই ইতালি পাল্টা আক্রমণে যায়। লুকাস পোডলস্কির কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে আক্রমণ তৈরি করেন কান্নাভারো, যার ফল আসে ইতালির দ্বিতীয় গোলে।
সেই গোলেই জার্মানির স্বপ্ন ভেঙে যায় এবং ইতালি জায়গা করে নেয় ফাইনালে।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল তাই শুধু ফাইনালের টিকিট পাওয়ার লড়াই নয়, এটি এমন সব মুহূর্তের জন্ম দেয়, যা ফুটবল ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ