অপ্রত্যাশিত মোড়ে চীন-মার্কিন এআই প্রতিযোগিতা

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

প্রযুক্তির বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারা চলে আসছে। তা হলো, সিলিকন ভ্যালি নতুন নতুন উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দেবে, আর চীন সেগুলো

2026-07-16T06:20:50+00:00
2026-07-16T06:20:50+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬,
১ শ্রাবণ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
অপ্রত্যাশিত মোড়ে চীন-মার্কিন এআই প্রতিযোগিতা
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ৬:২০ এএম 
অপ্রত্যাশিত মোড়ে চীন-মার্কিন এআই প্রতিযোগিতা। ছবি : সংগৃহীত
প্রযুক্তির বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারা চলে আসছে। তা হলো, সিলিকন ভ্যালি নতুন নতুন উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দেবে, আর চীন সেগুলো দ্রুত অনুসরণ করে ব্যাপকভাবে উৎপাদন ও ব্যবহার নিশ্চিত করবে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এবার সেই পুরোনো ছক ভেঙে এক নতুন ও অপ্রত্যাশিত মোড় নিচ্ছে প্রতিযোগিতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন শুধু প্রযুক্তি তৈরির প্রতিযোগিতা নয়, বরং এর ব্যবহার পদ্ধতি ও বাজার দখলের কৌশলই পুরো লড়াইটাকে বদলে দিচ্ছে।

নিউ সায়েন্টিস্টের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চীনা প্রতিষ্ঠান ডিপসিক তাদের ‘আর-ওয়ান’ নামের একটি বড় আকারের ভাষাভিত্তিক এআই মডেল বাজারে আনে। এতেই পুরো প্রযুক্তি জগতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। দাবি করা হয়, এই মডেলটি সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এআই প্রযুক্তির সমকক্ষ। তবে সবচেয়ে বড় চমক ছিল এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ও উন্মুক্ত, অর্থাৎ যে কেউ চাইলে ডাউনলোড করে নিজের সার্ভারে চালাতে পারবেন।

এই ঘোষণার পর মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য এক ধাক্কায় প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার কমে যায়। এমনকি মার্কিন আইনপ্রণেতারা সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ডিভাইসে এই মডেলটি ব্যবহার নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব আনতে বাধ্য হন। এরপর গত মাসে আরেকটি চীনা প্রতিষ্ঠান জেড এআই তাদের ‘জিএলএম-৫.২’ মডেলটি বাজারে আনলেও আগের মতো তীব্র আতঙ্ক বা শোরগোল দেখা যায়নি। এই ঘটনাই প্রমাণ করছে যে, দুই শক্তির মধ্যকার এআই প্রতিযোগিতা এক নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে। 

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়েই এখন আরও শক্তিশালী এআই মডেল তৈরি এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত চিপ ও ডেটা সেন্টার স্থাপনের তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। মার্কিন সরকার ইতিমধ্যেই চীনে সর্বাধুনিক চিপ রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং নিজেদের শীর্ষস্থানীয় এআই মডেলগুলোতে বিদেশিদের প্রবেশাধিকারও সীমিত করে দিয়েছে।

তবে এআই প্রযুক্তি বিকাশের মূল দর্শনেই রয়েছে দুই দেশের মৌলিক পার্থক্য। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বেশিরভাগ মডেলকে ‘ওপেন সোর্স’ বা উন্মুক্ত করে দেয়। ফলে ব্যবহারকারী বিনামূল্যে সেগুলো সংগ্রহ করে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার বা পরিবর্তন করতে পারেন। অন্যদিকে মার্কিন কোম্পানিগুলো পুরোপুরি বিপরীত পথ অনুসরণ করছে। তারা মডেলগুলোকে নিজেদের ক্লাউড সার্ভারে গোপন রাখছে, নির্দিষ্ট ফি নিয়ে ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে এবং এর অভ্যন্তরীণ কাঠামো প্রকাশ করছেন না। বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, চীনা মডেলগুলো হয়তো মার্কিন প্রিমিয়াম মডেলগুলোর মতো শতভাগ নিখুঁত নাও হতে পারে, কিন্তু দৈনন্দিন কাজ ও ছোট ব্যবসার জন্য এগুলো যথেষ্ট কার্যকর। যুক্তরাজ্যের এক সফটওয়্যার প্রকৌশলী বলছেন, ‘একই কাজের জন্য চীনা মডেল ব্যবহার করলে সময় কিছুটা বেশি লাগলেও পুরোপুরি বিনামূল্যে করা সম্ভবÑ যা বড় সাশ্রয় নিয়ে আসে।’

স্বাধীন মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠান ‘আর্টিফিশিয়াল অ্যানালাইসিস’ জেড এআইয়ের ‘জিএলএম-৫.২’কে বর্তমানে বাজারের সবচেয়ে সক্ষম উন্মুক্ত এআই হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে প্রতিযোগিতার মূল বাধা হলো- এআইয়ের কর্মক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য এখনও বিশ্বজুড়ে কোনো একক ও গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড নেই।

তা সত্ত্বেও ব্যবহারকারীদের কাছে চীনা মডেলগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাপী এআই ব্যবহারের তথ্য দেখানো প্ল্যাটফর্ম ‘ওপেনরাউটার’-এর তালিকা বলছে, বর্তমানে সেখানকার শীর্ষ দশটি মডেলের মধ্যে সাতটিই চীনা প্রতিষ্ঠানের তৈরি। শীর্ষস্থানটিও দখল করে আছে ডিপসিকের সর্বশেষ সংস্করণ, যার ব্যবহার অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সার্জ বেলোনি বলেন, ‘চীন এখন আগ্রাসীভাবে তাদের প্রযুক্তি উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য মার্কিন কোম্পানিগুলোর বন্ধ পদ্ধতিকে চাপে ফেলা এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের প্রভাব বাড়ানো।’ তার মতে, প্রযুক্তির ইতিহাসে এটাই প্রথমবার যখন চীন শুধু অনুসরণকারী নয়, বরং নতুন নিয়ম তৈরি করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

এআই প্রযুক্তি শুধু বাণিজ্যিক ক্ষেত্র নয়, চিকিৎসা, গবেষণা ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও প্রভাবিত করছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব, আগামী দিনে এই খাতটি প্রায় ৬০ ট্রিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল বাজারে পরিণত হবে। এখানে কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তার ওপর নির্ভর করবে বিশ্বের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভারসাম্যও।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিখাইল বেলকিন মনে করেন, চীনা মডেলগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো স্থায়িত্ব। ‘মার্কিন মডেলগুলো যেকোনো সময় বন্ধ করে দেওয়া বা পরিবর্তন করা সম্ভব, কিন্তু উন্মুক্ত মডেলটি একবার ব্যবহারকারীর হাতে চলে গেলে তা চিরকালের জন্য তার নিয়ন্ত্রণে থাকে।’


তবে এই প্রতিযোগিতায় মার্কিন কোম্পানিগুলোরও নিজস্ব সুবিধা রয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলো নিরাপত্তা ও নিয়ম মেনে চলার কারণে এখনও প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত মার্কিন প্রযুক্তির ওপরই বেশি নির্ভরশীল। বেলোনি বলেন, ‘মাইক্রোসফট বা গুগল সফল কারণ তাদের প্রযুক্তি সবচেয়ে ভালো না হলেও, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুন মেনে চলার ক্ষেত্রে তারা বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে পেরেছে।’

এদিকে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন ইউরোপের বিশেষজ্ঞরা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলিপ টর বলছেন, এআই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লে ইউরোপ হয়তো এক ধরনের ‘প্রযুক্তিগত উপনিবেশ’ হয়ে পড়বে, যেখানে সবকিছু নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের ওপর। তার মতে, এআই প্রতিযোগিতা পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হতে পারে, যদি না নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলা যায়। সবশেষে বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এআই প্রতিযোগিতা কেবল প্রযুক্তির লড়াই নয় এটি বিশ্ববাজার, রাজনীতি ও ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কাঠামোকে নতুনভাবে গড়ে দেওয়ার এক বড় প্রতিযোগিতা।

সময়ের আলো/জেডআই


  বিষয়:   প্রযুক্তি  চীন-মার্কিন  এআই  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: