বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) বিজয়-২৪ হলে গত ১৫ জুলাই দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষের নেপথ্যে মেসকেন্দ্রিক বিরোধ এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন রূপাতলী এলাকার একটি মেসে ঘটে যাওয়া পূর্বশত্রুতার জের ধরেই এই সংঘর্ষের সূত্রপাত।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে ভুক্তভোগী ইতিহাস বিভাগের (২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী মো. সাকিব প্রশাসনকে দেওয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, গত ১৪ জুলাই রূপাতলীর একটি মেসে টাকা-পয়সা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাংলা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ইনামুল হক ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সৌরভের ওপর চড়াও হন। পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলে সাকিবের ওপরও হামলা চালানো হয় এবং গভীর রাতে তাকে মেস ছাড়তে বাধ্য করা হয়। শিক্ষার্থীদের একটি অংশের দাবি, অভিযুক্ত ইনামুল হক ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থীর দাবি, রূপাতলী এলাকার ২৪ নম্বর রোডের ওই মেসটি শিক্ষার্থীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে ‘শিবির মেস’ নামে পরিচিত। অতীতেও সেখানে শিবিরের বিভিন্ন নেতাকর্মীর অবস্থান ছিল বলে তারা জানান। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, পরদিন ১৫ জুলাই বিজয়-২৪ হলে আগের রাতের ঘটনার সমাধানের উদ্দেশ্যে উভয় পক্ষকে আলোচনায় ডাকেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মোশাররফ হোসেন। তবে আলোচনা শুরুর আগেই দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
অন্যদিকে, বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ইনামুল হকের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার দাবি, হলের টিভি রুমে ডেকে নেওয়ার পর ইতিহাস বিভাগের সৌরভ ও সাকিবের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী তার ওপর পরিকল্পিত হামলা চালায়। ওই সময় অংকন নামের আরেক শিক্ষার্থীও হামলায় অংশ নেন বলে তিনি দাবি করেন।
তবে এই সংঘর্ষের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, আমি শুধুমাত্র আগের রাতের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটির শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য দুই পক্ষকে ডেকেছিলাম। অন্য একটি দলীয় কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকায় তাদের কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলি। কিন্তু এর মধ্যেই হলের বাইরে ইতিহাস বিভাগের কয়েকজন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ইনামুলের ওপর হামলা চালায়। এই অনভিপ্রেত ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
অভিযুক্ত অপর শিক্ষার্থী অংকনও নিজের সংশ্লিষ্টতা নাকচ করে বলেন, আমার নেতৃত্বে হামলা হয়েছে—এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। বরং পরিস্থিতি শান্ত করতে আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম এবং মারামারি শুরু হলে ইনামুল ভাইকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি।
সার্বিক বিষয়ে বিজয়-২৪ হলের প্রভোস্ট মো. আরিফ উল ইসলাম বলেন, এটি মূলত মেসে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার পাল্টা প্রতিক্রিয়া। প্রথমে মেসে ইতিহাস বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে মারধর করা হয়েছিল, তারই জেরে হলে আরেকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। হলের ভেতরে শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও মারামারিতে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মেহেদী হাসান সোহাগ জানান, ঘটনার পর উভয় পক্ষের সঙ্গেই কথা বলা হয়েছে এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত বিভাগীয় শিক্ষকরাও বিষয়টি তদারকি করছেন। দুই পক্ষকেই লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ইতোমধ্যে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে উভয় পক্ষই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে পৃথক লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছে। প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে দ্রুত সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/জোই