আজ ১৮ জুলাই। দুই বছর পরও কেবল একটি তারিখ নয়। এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে রক্ত, প্রতিরোধ, ইন্টারনেট ব্লাকআউট এবং আন্দোলনের মোড় ঘুরে যাওয়ার এক স্মরনীয় দিন। ২০২৬ সালের এই দিনে পূর্ণ হলো ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত ও রক্তক্ষয়ী দিনটির দ্বিতীয় বছর।
সেদিন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছিল নজিরবিহীন সংঘর্ষ, সহিংসতা ও প্রাণহানি। আর দিনের শেষ ভাগে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়ায় কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ। আন্দোলনের ইতিহাসে ১৮ জুলাই পরিণত হয় এক মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া অধ্যায়ে।
১৭ জুলাই রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ১৮ জুলাই সকাল থেকেই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ সফল করতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।
সেদিন সবচেয়ে তীব্র সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু ছিল উত্তরা। বেলা ১১টার পর সড়ক অবরোধকে ঘিরে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। উত্তরার সংঘর্ষে পুলিশের একটি গাড়ি আন্দোলনকারীদের চাপা দেওয়ার দৃশ্য গণমাধ্যমে উঠে আসে, যাতে বহু মানুষ আহত হন। সন্ধ্যার মধ্যেই শুধু উত্তরা এলাকা থেকে আটজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
নিহতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। আন্দোলনকারীদের মাঝে খাবার ও পানি বিতরণ করার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়, যা পরবর্তীতে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়।
উত্তরা ছাড়াও মহাখালী, বনানী, মিরপুর, ধানমন্ডি, রামপুরা, বাড্ডা ও যাত্রাবাড়ীসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকা সারাদিন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। মহাখালীতে দুর্যোগে ব্যবস্থাপনা অধিদফতর এবং বনানী সেতু ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়। একটি বাসে আগুন লাগার ধোঁয়া মেট্রোরেলের লাইনে ছড়িয়ে পড়লে চারটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সন্ধ্যার পর রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) প্রধান কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সম্প্রচার ব্যাহত হয়।
ধানমন্ডির ২৭ নম্বর এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজ। যাত্রাবাড়ীতে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ঢাকা টাইমসের সাংবাদিক মেহেদি হাসান।
প্রগতি সরণি এলাকায় ব্র্যাক ও ইস্ট ওয়েস্টসহ একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পর এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চার করেন।
দিনভর সংঘর্ষের সময় কয়েকটি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হেলিকপ্টার থেকে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি ছুড়তে দেখা যায়, যার ভিডিও ও ছবি পরে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
১৮ জুলাই ঢাকার বাইরে নরসিংদী, চট্টগ্রাম, সাভার, মাদারীপুর, রংপুর, সিলেটসহ দেশের অন্তত ৪৭টি জেলায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন সাংবাদিকসহ অন্তত ২৭ থেকে ৩১ জন নিহত এবং দেড় সহস্রাধিক মানুষ আহত হন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঢাকার সঙ্গে দেশের অধিকাংশ জেলার রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল।
১৭ জুলাই রাত থেকে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করার পর, ১৮ জুলাই রাত ৯টার পর সরকার দেশব্যাপী ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাও সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। ফলে অনলাইন যোগাযোগ, গণমাধ্যম ও জরুরি ডিজিটাল সেবা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। টানা ৫ দিন ব্রডব্যান্ড এবং ৮ দিন মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকার এই ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় ‘ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট’ হিসেবে পরিচিত।
প্রথমদিকে মহাখালীর খাজা টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডকে ইন্টারনেট বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে দেখানো হলেও, পরবর্তীতে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) জানায়— সরকারি নির্দেশনার ভিত্তিতেই ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের পেছনে তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সেদিনই কোটা সংস্কারের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হওয়ার কথা জানায় তৎকালীন সরকার। জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা দেন, সরকারি চাকরিতে ৮০ শতাংশ নিয়োগ মেধার ভিত্তিতে এবং ২০ শতাংশ কোটার আওতায় রাখার সুপারিশ করবে সরকার।
তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা এই আলোচনার আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, গুলি আর আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না। আরেক সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট জানান, শহিদের রক্তের ওপর কোনো সংলাপ হবে না।
অন্যদিকে তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ যাত্রাবাড়ী পরিদর্শনে গিয়ে দাবি করেন, এই সহিংসতায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা নয়, বরং বিরোধী দল জড়িত। ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসও নিজ দেশের নাগরিক ও কর্মকর্তাদের চলাচলে সতর্কতা জারি করে।
১৮ জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের পর ১৯ জুলাই ভোরে পরিস্থিতি আরও থমথমে হয়ে ওঠে এবং দেশজুড়ে ২২৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। মীর মুগ্ধ ও ফারহান ফাইয়াজের মতো তরুণদের আত্মত্যাগে আন্দোলনের গতিপথ মোড় নেয় এবং পরবর্তী কর্মসূচিগুলোতে তাদের স্মরণে নতুন করে সংগঠিত হয় আন্দোলনকারীরা।
এছাড়া পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার টেলিযোগাযোগ খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হয়। এতে ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধের ক্ষমতা সীমিত করা, বিটিআরসির স্বাধীনতা ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং নাগরিকদের ওপর নজরদারির ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতা আরোপের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সময়ের আলো/জোই