দেশজুড়ে ব্ল্যাকআউট দুর্ভোগে ইরানিরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি সাবওয়ে ট্রেনে বসে শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির দুই শিক্ষার্থী কামরান ও মঈন মোবাইল ফোনে স্ক্রিনে মগ্ন

2026-07-20T05:27:39+00:00
2026-07-20T11:42:24+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
দেশজুড়ে ব্ল্যাকআউট দুর্ভোগে ইরানিরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ৫:২৭ এএম  আপডেট: ২০.০৭.২০২৬ ১১:৪২ এএম
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য হরমোজগানে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সেতু বিধ্বস্ত হয়ে উল্টে যাওয়া একটি বেসামরিক গাড়ি।
ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি সাবওয়ে ট্রেনে বসে শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির দুই শিক্ষার্থী কামরান ও মঈন মোবাইল ফোনে স্ক্রিনে মগ্ন হয়ে আছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও দেখছিলেন তারা। যেখানে দেখা যাচ্ছে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা ব্ল্যাকআউটের কারণে ১৮০ কেজি আইসক্রিম গলে যাওয়ায় এক ক্ষুব্ধ ও হতাশ বিক্রেতা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। 

২২ বছর বয়সি কামরানের কাছে এই ভিডিওটি নিজের জীবনেরই এক প্রতিচ্ছবি। মাত্র কয়েক দিন আগে ফাইনল পরীক্ষার সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভারগুলো অফলাইন হয়ে পড়ে। এর ফলে ইলেকট্রনিক পরীক্ষার প্ল্যাটফর্মটি আর সচল রাখা যায়নি এবং ৩৮টি বিষয়ে পরীক্ষা আগামী মাস পর্যন্ত স্থগিত করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

আলজাজিরাকে কামরান বলেন, এই লোডশেডিং আমাদের সব পরিকল্পনা ওলটপালট এবং ব্যাহত করে দিচ্ছে। আপনার পড়াশোনা করার ইচ্ছাই চলে যাবে, কারণ আপনি কখনোই জানবেন না যে পরীক্ষা আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না। আপনি হয়তো সারা রাত জেগে পড়াশোনা করলেন, আর সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন বিদ্যুতের অভাবে সবকিছু বাতিল হয়ে গেছে।

২৪ বছর বয়সি মঈনের কাছে এই সংকট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার চেয়েও বড় কিছু। তিনি বলেন, যেসব রোগী ঘরে ভেন্টিলেটরের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন, কিংবা যারা রেফ্রিজারেটরে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ মজুদ রাখছেন, তাদের গিয়ে জিগ্যেস করুন। তাদের জন্য বিদ্যুৎ চলে যাওয়া মানে কোনো পরীক্ষায় পিছিয়ে যাওয়া নয়, বরং এটি জীবন-মৃত্যুর বিষয়। আমরা তো সংকটের কেবল হিমশৈলের চূড়াটুকু (সামান্য অংশ) দেখছি।

অনেক ইরানির কাছে এই সংকট আরও বেশি যন্ত্রণার। সরকারের কর্মকর্তাদের দেওয়া আশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে তারা। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং জ্বালানিমন্ত্রী আব্বাস আলিয়াবাদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, এবারের গ্রীষ্মে কোনো বিদ্যুৎ বিভ্রাট হবে না।

কিন্তু তীব্র দাবদাহ এবং দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে চালানো সামরিক হামলার কারণে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো কর্পূরের মতো উবে গেছে। দেশজুড়ে মাঝেমধ্যে হওয়া লোডশেডিং এখন নিত্যদিনের এক রূঢ় বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। হঠাৎ কোনো ঘোষণা ছাড়া এই লোডশেডিংয়ের বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তেহরান সিটি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মেহদি চামরান পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, দুই দিন আগে আমাদের কতগুলো বিদ্যুৎ স্থাপনায় বোমা হামলা চালানো হয়েছে, যদি আপনি জানতেন তা হলে এই প্রশ্নই করতেন না।

ইরানের জাতীয় বিদ্যুৎ কোম্পানির প্রধান নির্বাহী (সিইও) মোহাম্মদ আল্লাহদাদ এই ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা ৪ হাজার ২০০ মেগাওয়াট হ্রাস পেয়েছে এবং পুরো নেটওয়ার্কের ২ হাজারেরও বেশি পয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে মার্কিন হামলা এবং বন্দর আব্বাস, জাস্ক ও চাবাহারের বিতরণ নেটওয়ার্কের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার ফলে ও তীব্র গরমের কারণে তৈরি হওয়া যান্ত্রিক ত্রুটিগুলো আরও প্রকট রূপ নিয়েছে।

আলজাজিরার প্রতিবেদক তেহরান ঘুরে দেখেছেন যে, এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সঙ্গে মহানগরীটি একপ্রকার মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের পচনশীল পণ্যগুলো রক্ষা করতে পোর্টেবল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছেন। বড় বড় ডিজিটাল বিলবোর্ডগুলো অন্ধকার হয়ে পড়ে আছে। ট্রাফিক লাইট বিকল হয়ে যাওয়ায় প্রধান মোড়গুলোতে পুলিশ কর্মকর্তারা হাত দিয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছেন। 

তবে হাসপাতালগুলো এই সংকট থেকে কিছুটা মুক্ত রয়েছে, চারপাশের এলাকা অন্ধকারে ডুবে গেলেও ব্যাকআপ ব্যবস্থার  ওপর ভর করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোর (আইসিইউ) কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে আলজাজিরার প্রতিবেদনে। তবে বড় বড় শিল্প গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকার পরেও কেন এই বিদ্যুৎ ঘাটতি বজায় রয়েছে? তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং শিল্প, খনি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা বাহমান আরমান দেশের জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি বিচিত্র বৈপরীত্যের কথা উল্লেখ করেছেন।

ইরানে ‘রমজান যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিত সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান হামলার শিকার হওয়ার পর দেশটির বৃহত্তম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান ইসফাহানের মোবারাকেহ স্টিল কোম্পানি এবং খুজেস্তান স্টিল বিদ্যুৎ নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আরমান আলজাজিরাকে বলেন, কেবল মোবারাকেহ কোম্পানিই প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট এবং খুজেস্তান প্রায় ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করত। তাত্ত্বিকভাবে এর ফলে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকার কথা ছিল।

কিন্তু মাহশাহর পেট্রোকেমিকেল কমপ্লেক্স, যা আগে জাতীয় গ্রিডের জন্য উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করত, সেটিও বোমা হামলার শিকার হয়েছে। আরমান ব্যাখ্যা করে বলেন, এখন বিদ্যুৎ সরবরাহ করার পরিবর্তে নিজের চাহিদা মেটাতেই এই কমপ্লেক্সকে জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অর্থাৎ যে উৎসটি উদ্বৃত্ত দিত, সেটিই এখন ঘাটতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইরানে এ বছর ভারী বৃষ্টির কারণে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও ব্যবস্থার ভেতরে থাকা দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ অবস্থাই এই সংকটের জন্য প্রধানত দায়ী। এর সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে উঠেছে। আরমান বলেন, এই যুদ্ধ মূলত মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। এই সংকটের আরেকটি মূল কারণ হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগের অভাব। আমাদের গ্রিডে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের অপচয়ও হয়, সঞ্চালন লাইনগুলো পুরোনো হয়ে গেছে এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যর্থতা রয়েছে। তীব্র দাবদাহ কেবল এই ঘাটতিটিকে সবার সামনে তুলে ধরেছে।

আরমান জোর দিয়ে বলেন, স্বল্পমেয়াদি একমাত্র সমাধান হলো বিদ্যমান প্লান্টগুলোর আধুনিকায়ন করা। অন্যদিকে প্রস্তাবিত বখতিয়ারি বাঁধের (যা ২ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে) মতো দীর্ঘমেয়াদি মেগাপ্রকল্পগুলোর জন্য ৫০ কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবে এটি সম্পন্ন করতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অথচ ইরানের হাতে এখন আর সেই সময় নেই।

এদিকে শিল্প খাতের ওপর এই বোঝা সামগ্রিক অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। ইরান চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজ, মাইনস অ্যান্ড এগ্রিকালচারের সাবেক প্রধান হোসেন সেলাহভারজি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, শিল্পাঞ্চলগুলো প্রতিদিন চার থেকে ছয় ঘণ্টার লোডশেডিংয়ের মুখোমুখি হচ্ছে।

সেলাহভারজি কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরাকে বলেন, ‘শিল্প ইউনিটগুলোতে বিদ্যুৎ সীমিত করার ফলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়, উৎপাদন খরচ বাড়ে, অর্ডারের সরবরাহ বিলম্বিত হয় এবং রফতানি বন্ধ হয়ে যায়।’ বিদ্যুতের এই ব্যাঘাত ও যুদ্ধের কারণে অবকাঠামোর বিধ্বংসী ক্ষতি উভয় মিলে ইরানের তেলবহির্ভূত রফতানি খাতের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।

ইরানে প্রতি বছর শীতকালে গ্যাসের ঘাটতি এমনিতেই শিল্প খাতে একটি নিয়মিত বিড়ম্বনা, তার ওপর যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করা কারখানা মালিকদের জন্য আগামী মাসগুলো অত্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন দেখাচ্ছে। সাধারণ ইরানিদের জন্য, তাদের অন্ধকার রাস্তায় এখন একটাই প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে- যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং ক্ষয়িষ্ণু অবকাঠামোর মেলবন্ধনে তৈরি হওয়া এই সংকট তারা আর কতদিন সহ্য করবেন? আর এর কোনো দ্রুত সমাধানও আপাতত দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   দেশজুড়ে ব্ল্যাকআউট  দুর্ভোগ  ইরান  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: