ঢাকার পথচলা বুঝতে চায় ওয়াশিংটন। দেশটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে, ভবিষ্যৎ কর্মপন্থাগুলো কী এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক কোন দিকে যাচ্ছে, সরকারের নীতিমালায় অগ্রাধিকার তালিকায় কোন কোন ইস্যু স্থান পাচ্ছে, মোটা দাগে ঢাকার পররাষ্ট্র নীতিতে কোন কোন ইস্যু গুরুত্ব পাচ্ছে তা জানতে-বুঝতে চায়।
এ জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর আগামী সপ্তাহে দুদিনের ঢাকা সফরে আসছেন। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, একাধিক কারণে সারা বিশ্বে এখন অস্থিরতা চলছে। বড় শক্তির দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা প্রতি মুহূর্তেই বেড়ে চলেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর চলমান জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ঢাকা সফর করবেন। এই সফর নিয়ে দুই দেশের কূটনীতিকরা কাজ করছেন, এখনও দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি।
খসড়া সূচি অনুযায়ী, সফরটি আগামী ২৮ ও ২৯ জুলাই হতে পারে। এই সফরে রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে ঢাকার অবস্থান জানা-বোঝার চেষ্টা করবেন। বিশেষ করে ঢাকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ শীর্ষক পররাষ্ট্র নীতিতে কোন কোন বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে, সামনে কোন কোন বিষয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঢাকা এগিয়ে নিতে চায় সেসব বিষয় আসন্ন সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ভোটের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। আগস্টে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাপান এবং অক্টোবরে তুরস্ক সফরে যেতে পারেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত ৫ মাসে তুরস্ক বেলজিয়াম, ইথিওপিয়া, ভারত, চীন এবং রাশিয়া সফর করেছেন। এসব সফরে ওই দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থিত। একই সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থিত। এমন নানা ইস্যুতে ঢাকা ওয়াশিংটনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন সবসময়ই ঢাকাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর গত ৫ মাসে দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে ঢাকা তার বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে যেসব সমঝোতা করেছে এবং সামনের দিনে তা কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে তা জানা-বোঝার জন্যই মূলত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর ঢাকা সফরে আসছেন।
বাংলাদেশ বরাবর এক-চীন নীতির সমর্থক ছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয় যে, চীন যদি তার পুনঃরেত্রীকরণের উদ্যোগ নেয় তবে বাংলাদেশ তাতে সমর্থন দেবে। চীন সফরে বাংলাদেশ দেশটির চারটা ইনিশিয়েটিভের (গ্লোবাল গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ-জিজিআই, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ-জিডিআই, গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ- জিএসআই, গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ-জিসিআই) প্রশংসা করেছে।
এ ছাড়া গত চীন সফরে দুটি প্রস্তাবনা সবারই নজর কেরেছে। এক চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর ও দুই পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা সমন্বয়ে দুদেশের ২+২ বৈঠক আয়োজনে সম্মত হওয়া। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গত জুনে ঢাকা সফর করেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরে উভয়পক্ষ সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তুরস্ক বাংলাদেশে ড্রোন কারখানা স্থাপন করবে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ভাইরাল হয়েছে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের দক্ষিণ ও ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য প্রতিনিধিদের সফরের তুলনায় রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের সফর আলাদা গুরুত্ব বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য প্রতিনিধিদের সফর মূলত নিয়মিত কাজের অংশ। অন্যদিকে বিশেষ দূতের সফরে নির্দিষ্ট বিষয়ে আলোকপাত হয়ে থাকে। এই প্রতিবেদন লেখার সময়ে রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর ম্যানিলা সফরে ছিলেন।
ম্যানিলা সফর নিয়ে রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর সামাজিকমাধ্যম এক্স বার্তায় মঙ্গলবার বলেন, ফিলিপাইনের রাষ্ট্রপতি ফার্দিনান্দ মার্কোসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আমি আনন্দিত। একটি মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক বজায় রাখার গুরুত্ব নিয়ে আমাদের মধ্যে একটি ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত আন্তরিক ও ফলপ্রসূ বৈঠক ছিল, যা আমাদের দুদেশের মধ্যে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্ব তুলে ধরেছে। কোয়াডের (চার দেশের নিরাপত্তা জোট) চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেছি।
ঢাকার একজন কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র হচ্ছে ‘বাংলাদেশ ফাস্ট’। যার আওতায় ঢাকা সবার সঙ্গে ভারসাম্যের সম্পর্ক রক্ষা করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ের সঙ্গেই ভারসাম্য সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। ঢাকার কাছে চীন হচ্ছে মূল ঋণদাতা, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়নসহ এই দেশের জনগণের কল্যাণে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বাজার, যেখানে বাংলাদেশি পণ্য বিক্রয় করে ঢাকা লাভবান হতে চায়। ওয়াশিংটন ও বেইজিং এই দুদেশের সঙ্গেই ঢাকা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে চায় কিন্তু কোনো সংঘাত বা তাদের মাধ্যমে কোনো জোটে যুক্ত হতে চায় না। বাংলাদেশ শুধু নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী। যেমন : চীন তাদের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগে (জিডিআই, জিএসআই, জিসিআই, জিজিআই) যোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে চাপ দিলেও ঢাকা এখনও সবগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়নি।
আবার যুক্তরাষ্ট্র বিগত ২০১৯ সাল থেকে সামরিক খাতের আকসা ও জিসোমিয়া চুক্তি করার জন্য চাপ দিলেও বাংলাদেশ এখনও চুক্তি সই না করে আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি