সিজেপি আয়োজিত সংসদ অভিযান হিংসাত্মক হয়ে ওঠে, এরপর নিরাপত্তারক্ষীরা বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে। ছবি : পিটিআই
আন্দোলনে উত্তাল ভারতের রাজধানী দিল্লি। একসময় কয়েক হাজার মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা একটি আন্দোলন এখন এত বড় জনসমাগমে পরিণত হয়েছে যে সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, ২০ জুলাই দিল্লি পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার শিক্ষার্থীদের হতাশাকে ক্ষোভে পরিণত করেছে। এর ফলেই যন্তর-মন্তরে নতুন করে আন্দোলনের ঢেউ উঠেছে।
জুনে শুরু হওয়া আন্দোলন থেকে দিল্লির পথে আমিনুল
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) জুন মাসে আন্দোলনের ডাক দেওয়ার সময় ২৬ বছর বয়সী আমিনুল হক ছিলেন দূর থেকে নজর রাখা মানুষদের একজন। আসামে বসে তিনি অনলাইনে এই আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক প্রশ্ন তুলছেন।
লাদাখের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক আন্দোলনে যোগ দিয়ে দিল্লির যন্তর-মন্তরে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করার পর আমিনুলের সমর্থন আরও দৃঢ় হয়।
কিন্তু ওয়াংচুকের অনশন তাকে শেষ পর্যন্ত দিল্লিতে নিয়ে আসেনি। তাকে দিল্লিতে আসতে বাধ্য করেছে ২০ জুলাইয়ের ভিডিওগুলো।
সিজেপির সংসদমুখী মিছিলে দিল্লি পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আমিনুল সিদ্ধান্ত নেন। মাত্র দুই দিনের মধ্যে তিনি বিমানে চড়ে দিল্লি পৌঁছে যান।
তিনি ইন্ডিয়া টুডেকে বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হয়েছে। আমি আসাম থেকে এসেছি এটা দেখাতে যে তারা ভুল প্রজন্মের সঙ্গে লড়াই শুরু করেছে।
২০ জুলাই বিক্ষোভকারীদের ওপর দিল্লি পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের অভিযানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্ল্যাকার্ড হাতে এক বিক্ষোভকারী। ছবি : হিন্দুস্তান টাইমস
যেভাবে হতাশা পরিণত হলো ক্ষোভে
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যন্তর-মন্তরে শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীরা পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের তদন্ত এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। এতদিন সাধারণত কয়েক হাজারের মধ্যেই ছিল উপস্থিতির সংখ্যা।
কিন্তু সোমবারের পুলিশি অভিযানের পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
বুধবার দুপুরের পর দেখা যায়, বিভিন্ন দিক থেকে বিপুল সংখ্যক তরুণ যন্তর-মন্তরের দিকে আসছেন। সংসদ মার্গ ও টলস্টয় রোড থেকে আসা সরু রাস্তাগুলো মানুষে ভরে যায়।
সিজেপির আয়োজকরাও সঠিক সংখ্যা অনুমান করতে পারছিলেন না। তবে ঘটনাস্থলে একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল— আন্দোলন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
অনেক নতুন বিক্ষোভকারী জানান, এর আগে তারা আন্দোলনে অংশ নেননি। কিন্তু গত দুই দিনে মোবাইলে দেখা ভিডিও তাদের এখানে আসতে উৎসাহিত করেছে।
বিক্ষোভস্থলে বারবার একটি বাক্য শোনা যাচ্ছিল— বাচ্চো কো নেহি মারনা চাহিয়ে থা" (শিক্ষার্থীদের মারা উচিত ছিল না)।
"লাঠিচার্জের পর তারা ভেবেছিল শিক্ষার্থীরা ভয় পাবে"
আমিনুল হক বলেন, বিক্ষোভকারীরা কী চাইছিল? তারা জবাবদিহি চাইছিল। প্রশ্ন করার জন্য যদি শিক্ষার্থীদের মারা হয়, তাহলে আরও মানুষ রাস্তায় নামবে। এখন সরকারের সময় এসেছে মানুষের কথা শোনার।
এই একই বক্তব্য শোনা যায় মঞ্চের সামনে ও আশপাশে থাকা শত শত তরুণের কাছেও।
দিল্লির ২০ বছর বয়সী এক বিটেক শিক্ষার্থী বলেন, তারা ভেবেছিল লাঠিচার্জের পর শিক্ষার্থীরা ভয় পেয়ে যাবে। কিন্তু আজ তারা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল খুব সাধারণ— জবাবদিহির জন্য শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। এর জবাব সংলাপের বদলে শক্তি প্রয়োগ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা লজ্জাজনক।
নয়াদিল্লির যন্তর-মন্তরে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের পোস্টার হাতে এক বিক্ষোভকারী দাবি করেন, তিনি এই আন্দোলনে অংশ নিতে মহারাষ্ট্র থেকে এসেছেন। ছবি : হিন্দুস্তান টাইমস
লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিয়ে দিল্লি পুলিশের বক্তব্য
দিল্লি পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা প্রয়োজন ছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, সোমবারের বিক্ষোভে ১১৮ জনের বেশি পুলিশ সদস্য, যার মধ্যে কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও ছিলেন, আহত হয়েছেন। অন্যদিকে প্রায় ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।
এক সরকারি বিবৃতিতে দিল্লি পুলিশ অভিযোগ করে, বারবার সতর্ক করার পরও বিক্ষোভকারীরা "অসংযত, আক্রমণাত্মক ও হিংসাত্মক আচরণ" করেছেন।
পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীরা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেছেন, ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেছেন, পাথর ও অন্যান্য জিনিস দিয়ে পুলিশকে আক্রমণ করেছেন, সরকারি ও পুলিশ গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন এবং জনসম্পত্তির ক্ষতি করেছেন।
এখন আন্দোলনকে ঘিরে দুটি ভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে। একদিকে পুলিশের দাবি— হিংসাত্মক পরিস্থিতি সামলাতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে হাজারো শিক্ষার্থীর দাবি— এই পুলিশি পদক্ষেপই আন্দোলনকে আরও বড় করে তুলেছে।
"ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ": পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গাত্মক বার্তা
যন্তর-মন্তরের হাজারো বিক্ষোভকারীর মধ্যে একজন হাতে লেখা একটি প্ল্যাকার্ড ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাতে লেখা ছিল— "থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইওর লাভ" (আপনাদের ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ)।
বার্তাটি ছিল ব্যঙ্গাত্মক। তার মুখ, হাত ও কাঁধে কালশিটে দাগ ছিল।
আহতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটাই তাদের ভালোবাসা।
তিনি অভিযোগ করেন, ২০ জুলাইয়ের পুলিশি অভিযানের সময় তিনি এই আঘাত পেয়েছেন।
পাশে থাকা শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ডটির ছবি তোলেন এবং পরে দিল্লি পুলিশ ও আরএএফের বিরুদ্ধে স্লোগানে যোগ দেন।
আগের দিনের তুলনায় এবারের আন্দোলনের পরিবেশে ছিল অন্যরকম উত্তেজনা। ক্ষোভ ছিল, তবে একই সঙ্গে ছিল দৃঢ় সংকল্পও।
লাঠিচার্জ কীভাবে আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করল
২০ জুলাইয়ের আগে আন্দোলনের মূল বিষয় ছিল পরীক্ষায় অনিয়ম এবং মন্ত্রীর জবাবদিহির দাবি। কিন্তু পুলিশি অভিযানের পর আন্দোলনের আলোচনায় যুক্ত হয়েছে প্রতিবাদের অধিকার।
যেসব শিক্ষার্থী আগে কখনো কোনো আন্দোলনে অংশ নেননি, তারাও এখন নাগরিক অধিকার, ভিন্নমত প্রকাশ এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে কথা বলছেন।
বুধবার বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেও যন্তর-মন্তরের ভিড় কমেনি। খাবারের ব্যবস্থাও ছিল। বিহার, উত্তরপ্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে নতুন নতুন শিক্ষার্থীরা আসতে থাকেন। অনেকের হাতে ছিল রাত কাটানোর ব্যাগ, যা দেখে বোঝা যাচ্ছিল তারা দীর্ঘ সময় থাকার প্রস্তুতি নিয়েই এসেছেন।
বিক্ষোভস্থলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল— ২০ জুলাইয়ের সংসদ অভিযান ব্যারিকেড, কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের মধ্য দিয়ে শেষ হলেও, অনেক আন্দোলনকারীর মতে সেই পদক্ষেপ আন্দোলন থামাতে পারেনি। বরং সেটিই আন্দোলনের নতুন স্লোগানে পরিণত হয়েছে।
সূর্যাস্তের পরও যন্তর-মন্তরে স্লোগান চলতে থাকে। হাজারো শিক্ষার্থী বার্তা দিতে চেয়েছেন— যে প্রজন্মের সঙ্গে তারা মনে করছেন সংলাপের বদলে শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে, সেই প্রজন্ম পিছিয়ে যাবে না, বরং আরও বেশি সংখ্যায় ফিরে আসবে।