গুঞ্জনই যেন সত্যি হতে চলেছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আজ শুক্রবার পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিনি ইতোমধ্যে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তার পদত্যাগপত্র জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে জমা দেবেন।
তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে অবস্থান করায় বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র তার কাছে পাঠানো সম্ভব হয়নি। স্পিকার শুক্রবার সকালে দেশে ফিরবেন। এরপরই রাষ্ট্রপতি তার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। এ লক্ষ্যে বঙ্গভবন থেকে স্পিকারের দফতরের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে সরকারের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, পদত্যাগের পর চাপে পড়তে যাচ্ছেন মো. সাহাবুদ্দিন। তার অর্থ-সম্পদের বিষয়ে খোঁজ নিতে দ্রুতই টিম পাঠাবে দুদক। এ ছাড়া বিদেশ সফরেও নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। পদত্যাগপত্র গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সেদিনই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। সরকার ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র সময়ের আলোকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে বঙ্গভবন কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালেই পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। ফলে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা ঘিরে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও সরকারের অন্দরমহলে সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে কয়েকটি নাম জোরালোভাবে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খানের নাম উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া একজন বিশিষ্ট নারীর নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে দল ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে আরও আলোচনা করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, কোনো কারণে এ চারজনের কাউকে রাষ্ট্রপতি করা না হলে সাবেক সেনাপ্রধানদের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি করা হতে পারে। তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকেই ভারমুক্ত রাষ্ট্রপতি করা হবে- এমন সম্ভাবনায় জোর দিয়েছেন একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ গত ১৯ জুলাই চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে পৌঁছান। সূচি অনুযায়ী তার ২৬ জুলাই ফেরার কথা। তবে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ইস্যুতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের পরামর্শে সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার সকালেই দেশে ফিরছেন তিনি।
সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। আর ৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত ব্যক্তিরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা।
বঙ্গভবন ও বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের শারীরিক অবস্থা আসলেই ভালো নয়। তিনি নানান জটিল রোগে ভুগছেন। ইতিমধ্যে দেশে এবং বিদেশে জটিল রোগের চিকিৎসা নিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি অসুস্থতাকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পদত্যাগের পর তিনি তার গুলশানের বাসায় কিছুদিন বিশ্রাম নেবেন। এরপর চিকিৎসার জন্য তার সিঙ্গাপুর যাওয়ার কথা রয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আওয়ামী সরকারের নিয়োগ দেওয়া রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটবে।
বঙ্গভবন সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘রয়টার্স’-এ প্রকাশিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের একটি সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সরকারের মধ্যে নানা আলোচনা ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। ওই সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে জাতীয় নির্বাচনের পর পদত্যাগ করার পরিকল্পনা করছেন বলেও জানান তিনি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায়ও সাক্ষাৎকার দেন রাষ্ট্রপতি। সেই সাক্ষাৎকার ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছিল। এতে সরকার দেশ এবং বিদেশে অস্বস্তিতে পড়ে। রাষ্ট্রপতি এভাবে সাক্ষাৎকার দিতে পারেন কি না বা যখন-তখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন কি না তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি সরকার। তখন থেকেই রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন- এমন আলোচনার জন্ম নেয়। এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রনেতারা রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ বা অপসারণের দাবিতে আন্দোলনও করে। তার পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিল জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠন।
এমনকি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ দেওয়ার সময় তার তীব্র বিরোধিতা, হট্টগোল ও প্রতিবাদ জানান জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির সংসদ সদস্যরা। এরপর তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। দেশে ফিরে ২৭ জুন তিনি জাতীয় সংসদে সফরের অর্জন নিয়ে কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর থেকে ফেরার পর রাষ্ট্রপতিকে তার সফরের বিষয়ে অবহিত করার রেওয়াজ রয়েছে। তবে তারেক রহমান বুধবার পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বা অন্য কোনোভাবে সফরের ফল তাকে অবহিত করেছেন- এমন কোনো তথ্য বঙ্গভবন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকাশ করেনি। এ কারণে অনেকেই বলছেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি নিজেই পদত্যাগ করতে চান, এমন আলোচনা অনেক দিন ধরেই চলছে। বিষয়টি সরকারের মাথায় ছিল। সবদিক বিবেচনায় নিয়ে সরকারের গ্রিন সিগন্যাল পেয়েই পদত্যাগ করছেন তিনি। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রেস নোট দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হবে। তবে পদত্যাগের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কোনো বক্তব্য বা বার্তা প্রকাশ না হওয়ার পক্ষে রয়েছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা।
রাষ্ট্রপতি শারীরিক অবস্থার কারণে পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন কি না- এমন প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘না, এটা সরকারকে জানানোর কথা না। যদি মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্যগত বা যেকোনো কারণে পদত্যাগ করতে চান, সেই অপশন তো ওনার আছেই। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। আমিও এগুলো পত্রিকায় শুনছি (দেখছি)। আর তিনি যদি পদত্যাগ করতে চান সাংবিধানিকভাবে, সেটা স্পিকার বরাবর পদত্যাগপত্র দিতে হয়। এটুকু জানি। এর বাইরে কিছু জানি না।’
এ বিষয়ে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করছেন গণমাধ্যমে খবরে পড়েছি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী দলের ওপর নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন ও দেশে লাগামহীন লুটপাটের শাসনব্যবস্থার সময়ে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় এবং পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়টা অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে রাষ্ট্রের জন্য ভূমিকা রেখেছেন। ওনার অতীতের সবকিছু ছাড়িয়ে এই সময়টা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
প্রসঙ্গত মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। এরপর সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পালাবদলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন।
সময়ের আলো/আআ