ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই)-এর অন-স্ক্রিন মার্কিং (ওএসএম) পোর্টালের নিরাপত্তা ত্রুটি উন্মোচন করে দেশজুড়ে আলোচনায় আসা ১৯ বছর বয়সী সাইবার নিরাপত্তা গবেষক নিসর্গ অধিকারী এবার দিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (শরদ পাওয়ার)-এর মুখপাত্র অনীশ গাওয়ান্ডের সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করেন।
ছবির ক্যাপশনে নিসর্গ লেখেন, এখানকার উদ্দীপনা সত্যিই অবিশ্বাস্য।
মুখোশ পরা অবস্থায় আন্দোলনস্থলে তার উপস্থিতির পর তরুণ আন্দোলনকারীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়। অনেকেই মন্তব্য করেন, হ্যাকার এসে গেছে!
সপ্তাহজুড়ে চলা আন্দোলনে নতুন মাত্রা
যন্তর মন্তরের এই আন্দোলন এখন সপ্তম সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। শুক্রবার কেন্দ্র সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সিজেপির নেতাদের নতুন দফায় বৈঠক হলেও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এখনো কোনো সমাধান আসেনি।
সিবিএসই পোর্টালের ত্রুটি থেকে আইআইটি কানপুর
নিসর্গ জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সিবিএসইর ওএসএম পোর্টালের উন্মুক্ত কোড পরীক্ষা করতে গিয়ে একটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত ‘মাস্টার পাসওয়ার্ড’ খুঁজে পান। নৈতিক হ্যাকার হিসেবে তিনি বিষয়টি প্রথমে সরকারি সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা সিইআরটি-ইন (কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম-ইন্ডিয়া)-কে জানান।
পরে মে মাসে তিনি বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। তার দাবি ছিল, ওই নিরাপত্তা ত্রুটির কারণে ওটিপি (এককালীন পাসওয়ার্ড) বা পরিচয় যাচাইয়ের ধাপ এড়িয়ে পরীক্ষকদের ড্যাশবোর্ডে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল। সেখানে পরীক্ষার্থীদের নম্বর দেখা এবং পরিবর্তন করার সুযোগও ছিল।
প্রথমে সিবিএসই দাবি করেছিল, নিসর্গের প্রকাশ করা স্ক্রিনশট মূল মূল্যায়ন পোর্টালের নয়, একটি পরীক্ষামূলক ওয়েব ঠিকানার। পরে বোর্ড জানায়, চিহ্নিত নিরাপত্তা দুর্বলতাগুলো সমাধান করা হয়েছে।
এই ঘটনার পর নিসর্গ দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের কাজের ব্যাখ্যা দিলেও কখনোই মুখ প্রকাশ করেননি। যন্তর মন্তরের আন্দোলনেও তিনি মুখোশ পরে অংশ নেন।
আইআইটি কানপুরে নিয়োগ
নিসর্গের ব্লগ পড়ে আইআইটি কানপুরের পরিচালক মনীন্দ্র আগরওয়াল তাকে প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র সি৩আইহাবে চুক্তিভিত্তিক থ্রেট ইন্টেলিজেন্স ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিয়োগ দেন।
নিসর্গ জানান, সেখানে বেতন সন্তোষজনক হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য ফ্রিল্যান্স কাজ করে তিনি এর চেয়ে বেশি আয় করতেন।
এছাড়া নিট-ইউজি পুনঃপরীক্ষার আগে টেলিগ্রাম অ্যাপ নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি প্রকাশ্যে মতবিরোধ প্রকাশ করেছিলেন। তার মতে, এতে মূল সমস্যার সমাধান হবে না।
নিট আন্দোলনের সঙ্গে যোগসূত্র
ওএসএম পোর্টাল বিতর্ক সামনে আসে এমন সময়ে, যখন নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান তীব্র সমালোচনার মুখে ছিলেন।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক মাধ্যম উদ্যোগ থেকেই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) জন্ম। পরে এটি ছাত্রদের আন্দোলনে রূপ নেয়। গত ২০ জুন থেকে সংগঠনটি যন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
পরে ২৮ জুন পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলনকে জাতীয় পর্যায়ে আরও আলোচিত করে তোলে। তৃণমূল কংগ্রেস, ডিএমকে, এনসিপি (শরদ পাওয়ার), কংগ্রেসসহ একাধিক রাজনৈতিক দল এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়।
এদিকে সরকার ইতোমধ্যে সিবিএসইর শীর্ষ কর্মকর্তাদের পরিবর্তন করেছে এবং চলতি সপ্তাহে কেন্দ্রীয় শিক্ষা সচিবকেও বদলি করেছে।
সিবিএসই বিতর্কে নিসর্গ অধিকারীর পাশাপাশি আরও দুই কিশোর— বেদান্ত শ্রীবাস্তব, যিনি ভুল উত্তরপত্র পাওয়ার বিষয়টি সামনে আনেন, এবং সার্থক সিদ্ধান্ত, যিনি সিবিএসইর টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্ত করে নিসর্গের সঙ্গে কাজ করেন— গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বেদান্ত ও সার্থকের সঙ্গে দেখা করে তাদের বক্তব্য এক্সে প্রকাশ করেন। একই পোস্টে নিসর্গকেও সার্থকের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে তার প্রশংসা করেন।
আলোচনা চললেও অচলাবস্থা কাটেনি
শুক্রবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রানকার সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করেন। চলতি সপ্তাহে এটি ছিল দুই পক্ষের দ্বিতীয় সরাসরি বৈঠক।
তবে বৈঠকের পর উভয় পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেয়। সিজেপির দাবি, ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি সরকার এখনো মেনে নেয়নি, যদিও তাদের আরও দুটি দাবিতে নীতিগত সম্মতি দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ