যুদ্ধের শুরু যেখান থেকে হয়, শেষ প্রায়ই তা অন্য কোনো প্রান্তে গিয়ে ঠেকে। ইরানের সঙ্গে বর্তমান সংঘাতের লক্ষ্য শুরু থেকেই অস্পষ্ট ও পরিবর্তনশীল। কখনো সরকার পতনের আশা, কখনো বা ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক সামর্থ্য কমানোর সীমিত লক্ষ্য। প্রায় ছয় মাস পর আজ তা সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। লড়াইটা এখন চলছে কার হাতে থাকবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রবাহের ধমনি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ থাকবে তা নিয়ে। ইরান এখন প্রমাণ করেছে, তার নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলা ছাড়া এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করা বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র তা অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে।
এখন পুরো কৌশল এক প্রশ্নের ওপর নির্ভর করছে। হরমুজ প্রণালি কি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবেই থাকবে, নাকি ইরানই স্থির করবে কারা কী শর্তে এ পথ দিয়ে যেতে পারবে? নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে চলে গেলে প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার প্রবাহ ফি পাবে তারা; সঙ্গে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের মাত্রাও নিজেদের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। অর্থাৎ বিশ্বঅর্থনীতির ‘চালকের আসন’টি চলে যাবে তাদের হাতে।
ইরান প্রণালিটি ব্যারিকেড বসিয়ে বন্ধ করে বরং বেসামরিক জাহাজের ওপর ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। এটাই যথেষ্ট বাণিজ্য প্রবাহ থামিয়ে দেওয়ার জন্য এবং দীর্ঘদিনের এক ধারণা ভেঙে ফেলার জন্য। ধারণাটি ছিল যুদ্ধের সময়ও হরমুজ প্রণালি সবসময় উন্মুক্ত থাকবে। যেমন ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পরও প্রণালিটি প্রভাবিত হয়নি।
এই ধারণাটি এখন চিরতরে ভেঙে গেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ইরানের সমর্থিত হুথি বাহিনী একই কৌশলে বাব আল-মান্দেব প্রণালি ব্যবহার করে লোহিত সাগরের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জোট গঠন করে তাদের সামর্থ্য কমানোর জন্য বিমান অভিযান চালিয়েছিল। কিন্তু তা নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিতে পারিনি। হুথিরা শুধু ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তির পরই হামলা বন্ধ করবে।
এবারও যুক্তরাষ্ট্র একই সমস্যার মুখোমুখি হবে। এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূর থেকে চালানো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সামর্থ্য নষ্ট করা এক অত্যন্ত কঠিন, ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ কাজ যেন খড়ের গাদা থেকে সুই খোঁজা। এবারের সমস্যা অনেক ভয়াবহ। বাব আল-মান্দেব প্রণালি বিশ্বের মোট জাহাজ চলাচলের মাত্র ১০ শতাংশ বহন করে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বিশ্বের মোট জ্বালানি বাণিজ্যের ২০ শতাংশ বহন করে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন একবার বলেছিলেন, এটা বন্ধ হলে তা হবে এক ‘অর্থনৈতিক বিপর্যয়’।
ইরানের কৌশল হলো বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিয়ে হোয়াইট হাউসকে প্রণালির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের কাছে ছেড়ে দিতে বাধ্য করা। কিন্তু বেসামরিক জাহাজ ও উপসাগরজুড়ে হামলার মতো পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে তার বিরুদ্ধেই কাজ করবে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সরকার ও জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এখন হরমুজ প্রণালি ব্যবহার না করে তেল, গ্যাস ও পণ্য পরিবহনের জন্য পাইপলাইন, বন্দর ও নতুন পথ তৈরির কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই প্রকল্পগুলোকে সমর্থন করছে।
প্রণালিটি এখনও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কয়েক দশক পর প্রথমবারের মতো এই অঞ্চল এমন এক ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করছে, যেখানে হরমুজ আর অপরিহার্য নাও থাকতে পারে। ইরানের এই চাপকে নিরপেক্ষ করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি মানচিত্রই এখন নতুন করে আঁকা হচ্ছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২৩ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি পণ্য হরমুজ প্রণালি পথে যেত। ইরাক, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের রফতানির একমাত্র পথ এটি; সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান পরিবহন পথও ছিল এটি।
এখন সব রাষ্ট্র এমন ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছে, যেখানে হরমুজ মাঝে মাঝে বন্ধ থাকতে পারে বা বাণিজ্যের জন্য নির্ভরযোগ্য নাও থাকতে পারে। এক অপরিহার্য পথের বদলে তারা একাধিক রফতানি পথ তৈরি করছে যা ধীরে ধীরে ইরানের প্রভাব কমিয়ে দেবে। এই প্রকল্পগুলো হরমুজ পথের সমস্ত পরিবহনকে প্রতিস্থাপন করবে না কিন্তু এর গুরুত্ব অনেকটাই কমিয়ে দেবে। গোল্ডম্যান স্যাক্সের অনুমান, ২০২৮ সালের শেষের দিকে এই বিকল্প পথগুলো প্রণালি পথে পরিবহন করা তেলের প্রায় ৬০ শতাংশ বহন করতে পারবে।
যুদ্ধের কারণে এগিয়ে চলা কিছু প্রধান প্রকল্প :
সৌদি আরব (প্রতিদিন ৯ মিলিয়ন ব্যারেল) : গত চার দশক আগে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সৌদি আরব পূর্ব থেকে পশ্চিমে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিশাল পাইপলাইন তৈরি করেছিল। বর্তমান সংকটে এই পাইপলাইন প্রতিদিন প্রায় ৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে পাঠাচ্ছে। ২০২৯ সালের শেষের দিকে এর সক্ষমতা আরও ১-২ মিলিয়ন ব্যারেল বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে তারা। প্রতিদিন মোট ৯ মিলিয়ন ব্যারেল হরমুজকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (প্রতিদিন ৩.৬ মিলিয়ন ব্যারেল) : তাদের বিদ্যমান পাইপলাইন এখন প্রতিদিন ১.৮ মিলিয়ন ব্যারেল পাঠায়। ২০২৭ সালের মধ্যে তা দ্বিগুণ করে ৩.৬ মিলিয়ন ব্যারেল করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
ইরাক-সিরিয়া (প্রতিদিন ২-৩ মিলিয়ন ব্যারেল) : ইরাকের নতুন প্রধানমন্ত্রী গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সফরে সিরিয়ার সঙ্গে মিলে পুরোনো পাইপলাইন সংস্কার ও নতুন লাইন যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন, যার মাধ্যমে ইরাক ও কুয়েতের তেল ভূমধ্যসাগরে পাঠানো হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পন্ন করা এই প্রকল্প হরমুজ পুরোপুরি গৌণ করে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরাক-তুরস্ক (প্রতিদিন ১ মিলিয়ন ব্যারেল) : কিরকুক থেকে তুরস্কের জেহান বন্দর পর্যন্ত পুরোনো পাইপলাইন সংস্কার করা হবে, যা দীর্ঘদিন রাজনৈতিক বিবাদের কারণে বন্ধ ছিল।
ইরাক-জর্ডান (প্রতিদিন ১-২.৫ মিলিয়ন ব্যারেল) : বসরা থেকে পশ্চিম ইরাক হয়ে জর্ডানের আকাবা বন্দর পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন তৈরির কাজ দ্রুত করা হচ্ছে। এগুলো শুধু সৌদি আরব তুরস্ক বা আকাবা হয়ে ভূমধ্যসাগরে পাঠানোর আরও পথ নিয়ে আলোচনা করছে। এর পেছনে ইতিহাসের দৃষ্টান্তও আছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র বাকু-তিবিলিসি-জেহান পাইপলাইন তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিল, যা তখন অনেকের কাছে অসম্ভব মনে হয়েছিল।
২০০৬ সালে সম্পন্ন হওয়া এই প্রকল্প রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন পথের ওপর নির্ভরতা চিরতরে কমিয়ে দেয় এবং প্রমাণ করে, জ্বালানি অবকাঠামো সামরিক জোটের মতোই বিশ্বরাজনীতি বদলে দিতে পারে। অপরদিকে ইউরোপ রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকার ভুল করেছিল উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ইরানের ক্ষেত্রে সেই ভুল আর করবে না।
এই নতুন পাইপলাইন ও অংশীদারিত্বের পথে বাধা আসবেই। ইরান স্থায়ী পাইপলাইনগুলোতে হামলা চালাতে পারে, নির্মাণে বিলম্ব বা আর্থিক সংকটও দেখা দিতে পারে। কিন্তু সব মিলিয়ে এটা এমন এক কৌশল যা থেকে পিছু হটবে না। যে রাষ্ট্রগুলো একসময় হরমুজের উন্মুক্ত থাকাকে নিশ্চিত মনে করত, তারা এখন তা বন্ধ থাকার সম্ভাবনা মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করছে। একাধিক নির্ভরযোগ্য পথ তৈরি এখন তাদের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ও নিজেদের তহবিল দিয়ে এগিয়ে নিচ্ছেন তারা।
ইরানের কৌশলের মূল ভিত্তি ছিল বিশ্বের কাছে হরমুজের বিকল্প কিছুই নেই। কিন্তু প্রণালিটিকে অস্ত্র বানানোর মাধ্যমে তারা প্রতিবেশীদেরই এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করতে বাধ্য করছে, যেখানে ইরানের ওপর নির্ভরতা আর থাকবে না। আর এই ফলাফলটি পেতে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের সক্রিয় ভূমিকা রাখা উচিত।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও