দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের একত্রে যুক্ত করে একটি ত্রিপাক্ষিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেছেন, দেশে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও নিকটবর্তী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সংযোগের ঘাটতি রয়েছে। এ বাস্তবতায় শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের জন্য সুযোগ তৈরির পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মেধাকেও কাজে লাগাতে চায় সরকার।
শনিবার (২৫ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর নভোথিয়েটারে অনুষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম অ্যান্ড বিইএআর সামিট ২০২৬’-এ তিনি এসব কথা বলেন।
‘বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর ভবিষ্যৎ নির্মাণ’ প্রতিপাদ্যে সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং সিলিকন রিভার বাংলাদেশ কর্মসূচির অংশীদারত্বে দুই দিনব্যাপী এ সামিটের আয়োজন করা হয়। এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সামিটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, শুধু সেমিকন্ডাক্টর শিল্প নয়, দেশের যেকোনো শিল্পের বিকাশে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সমমানের অন্যান্য অর্থনীতির তুলনায় বাংলাদেশের জনমিতিক সুবিধাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণীর সফল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাব রাখার ইচ্ছাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বর্তমান নির্বাচিত সরকারের অঙ্গীকার তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে থাকায় তরুণ শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে সবাইকে নিয়ে কাজ করা হবে। এ লক্ষ্যে দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, ক্লাব, সেমিনার, সিলেবাস এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই খাতটি একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, রোবোটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়গুলোকে শুধু আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও স্নাতকদের সম্পৃক্ত করাই সরকারের লক্ষ্য।
ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে প্রবাসীদের নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত করতে একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে এবং তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞান নিশ্চিত করতে শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগ বাড়াতে হবে। ইন্টার্নশিপ, সামার স্কুল, যৌথ কর্মসূচি এবং শিল্পখাতের বিশেষজ্ঞদের ভিজিটিং লেকচার বাড়ানো হলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে।
গবেষণা খাতের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বেশ কিছু মৌলিক সমস্যা রয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় গবেষণাগার নেই। বিশেষ করে জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ল্যাব সুবিধা অত্যন্ত সীমিত। এমনকি দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও কাঙ্ক্ষিত মানের গবেষণা, জার্নাল ও প্রকাশনায় সহজ ও পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার নেই।
এ প্রেক্ষাপটে তিনি ল্যাবরেটরি স্থাপন, আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ, বই, জার্নাল ও প্রকাশনাসহ গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। শিক্ষা ও শিল্পখাতের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আধুনিক ও প্রায়োগিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন তিনি।
মাহ্দী আমিন বলেন, উচ্চশিক্ষাকে গবেষণামুখী করতে এবারের বাজেটে শিক্ষা, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই অর্থের বড় অংশ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হবে। তবে তা শুধু ভবন নির্মাণে নয়, মানসম্মত গবেষণাগার গড়ে তোলা এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য। তিনি স্থানীয় শিল্পখাতকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথভাবে আঞ্চলিক সমস্যার স্থানীয় সমাধান খুঁজে বের করার আহ্বান জানান।
সরকারের মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, ব্রিটেনসহ উন্নত দেশগুলোর আদলে ধীরে ধীরে বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। বিজ্ঞান, কলা ও মানবিকসহ প্রতিটি নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্য আলাদা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে মৌলিক গবেষণার পাশাপাশি বাংলাদেশের বাস্তব সমস্যার প্রয়োগিক সমাধানভিত্তিক গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশিরা সাফল্যের সঙ্গে কাজ করলেও রাষ্ট্রগঠনমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের যথেষ্ট সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষক এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও পেশাজীবীরা কাজ করছেন। কিন্তু সেরা চর্চার অভাবে দেশের ভেতরে মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না।
দেশের তরুণদের উদ্যোক্তা মনোভাবের প্রশংসা করে তিনি বলেন, বড় ধরনের সরকারি সহায়তা ছাড়াই শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য কাজ করছে। আত্মউন্নয়ন, আত্মকর্মসংস্থান ও নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দেশের ভেতরে অনেক মেধাবী মানুষ রয়েছেন, যাদের যথাযথ দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, দেশের ভেতরের উদীয়মান তরুণ, শিল্পখাত এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রতিভাবান প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা ও মেধাকে একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করতে হবে।
সরকারি সহায়তা বাড়লে ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশি, চাকরির সুযোগ এবং ক্যারিয়ার সেবার মতো উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো একটি সাধারণ ক্যারিয়ার সেন্টারও নেই। তাই শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা মূলত তত্ত্বনির্ভর। সরকার এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করবে না, বরং বাস্তব প্রয়োগের কৌশলও শিখবে।
সবাইকে মূলধারার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ধারায় রূপান্তর করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক সেরা চর্চা অনুসরণ করে শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ জোরদারে বর্তমান সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
সময়ের আলো/আরবিএন