বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের বায়লাখালী গ্রামের বাসিন্দা আবু বকর সিদ্দিকী সুমন। জীবনের শুরু থেকে সংগ্রাম করে আজ তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা। কর্মজীবনে বেঁচে থাকার তাগিদে কখনো রেলওয়ের চাকরি, কখনো রংমিস্ত্রি, আবার কখনো দিনমজুরের কাজ করেছেন। আজ শুধু তিনি নিজেই স্বাবলম্বী হননি, হাজারো তরুণকে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নও দেখাচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা তরুণ, শিক্ষার্থী, বেকার ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে এরই মধ্যে দুই হাজারের বেশি কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি করেছেন তিনি।
অভাবের কারণে নবম শ্রেণিতে পড়াকালেই পড়াশোনার ইতি টেনে রেলওয়েতে চাকরি নেন আবু বকর সিদ্দিকী সুমন। চাকরি শেষ হলে ভাগ্যবদলের আশায় লেবাননের বৈরুতে পাড়ি জমান। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সিরিয়া ও ফিলিস্তিন ঘুরে ১৭ মাস পর তাকে দেশে ফিরতে হয়। ঢাকার ফকিরাপুলে কখনো রংমিস্ত্রি, কখনো দিনমজুর হিসেবে কাজ করে জীবন চালিয়েছেন তিনি।
২০২১ সালে মাছ চাষের জন্য ঋণ নিতে গেলে তৎকালীন বাবুগঞ্জের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুজ্জামানের পরামর্শে মাছের পাশাপাশি পেঁপে চাষ শুরু করেন। সরকারি একটি প্রকল্প থেকে ৫০ হাজার টাকা সহায়তা পান। প্রথম দিকে ব্যর্থ হলেও পরে গাজীপুর থেকে উন্নতমানের বীজ এনে নিজেই চারা উৎপাদন শুরু করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় শেখা প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে নিজের পতিত জমিতে গড়ে তোলেন আধুনিক পেঁপে বাগান। বর্তমানে ১ একর ৪৮ শতক জমি এবং তিনটি মাছের ঘেরের পাড়জুড়ে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৫০টি পূর্ণবয়স্ক পেঁপে গাছ। বাগানে শাহী, কাশ্মীরি ও টপ লেডি জাতের পেঁপে চাষ করা হয়েছে। প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে চার থেকে পাঁচ মণ পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। তার বাগানে সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি ওজনের পেঁপেও উৎপাদিত হয়েছে।
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সুমন কাঁচা ও পাকা মিলিয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকার পেঁপে এবং ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার পেঁপের চারা বিক্রি করেছেন। এতে তার প্রায় ৬০ লাখ টাকা লাভ হয়েছে। শুধু গত মৌসুমেই তিনি প্রায় ১৫ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন। চলতি মৌসুমে কাঁচা ও পাকা মিলিয়ে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রির আশা করছেন। এ ছাড়া চলতি বছরের শুরু থেকে পেঁপের চারা বিক্রি করেই প্রায় ৭ লাখ টাকা লাভ করেছেন।
চারা উৎপাদনেও এসেছে ধারাবাহিক সাফল্য। ২০২৩ সালে ছয় হাজার চারা বিক্রির মাধ্যমে যাত্রা শুরু হলেও ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ হাজারে। ২০২৫ সালে বিক্রি হয় প্রায় ১৪ লাখ চারা। বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও ২০২৬ সালে ছয় লাখ চারা উৎপাদন ও বিক্রি করেছেন তিনি। আগামী বছরে সারা দেশে ২০ লাখ চারা বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে এরই মধ্যে একটি আধুনিক পলি হাউজ নির্মাণ করেছেন। প্রতিটি চারায় খরচ বাদ দিয়ে প্রায় পাঁচ টাকা লাভ হয় বলে জানান তিনি। পেঁপের পাশাপাশি মাছের ঘেরের পাড়ে মিষ্টি কুমড়া, লাউ, চিচিঙা, ধুন্দুল, করলা ও বরবটিসহ বিভিন্ন সাথী ফসল চাষ করছেন। পুকুরপাড়ে মাচা পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন করেও বছরে অতিরিক্ত কয়েক লাখ টাকা আয় করছেন।
সাফল্যের কথা তুলে ধরে সুমন বলেন, দেশে কৃষিই হতে পারে বেকারত্ব দূর করার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। মাত্র কয়েকটি গাছই বদলে দিতে পারে একজন বেকার চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীর জীবন। তিনি আরও বলেন, আমি চাই বেকার যুবক ও শিক্ষার্থীরা কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করুক। একজন শিক্ষার্থী যদি পড়াশোনার পাশাপাশি মাত্র ২৫টি উন্নত জাতের পেঁপে গাছ লাগিয়ে সঠিক পরিচর্যা করেন, তাহলে এক মৌসুমেই প্রায় এক লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। অন্যের চাকরির অপেক্ষায় না থেকে বাড়ির পতিত জমিকে কাজে লাগাতে হবে। তিনি জানান, তিনি তার ট্রেনিং সেন্টারে বিনা মূল্যে পেঁপে চাষের প্রশিক্ষণ দেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এসে প্রশিক্ষণ নিয়ে সফল উদ্যোক্তা হচ্ছেন।
অল্প জমিতে বেশি ফলন উৎপাদনের স্বীকৃতি হিসেবে দেশ-বিদেশ থেকে সাতটি সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। নেপাল থেকে কৃষি সম্মাননা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি, ভারতের মহাত্মা গান্ধী ও মাদার তেরেসা সম্মাননাসহ একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার তার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে।
বায়লাখালী গ্রামের তরুণ সফিকুল ইসলাম বলেন, সুমন ভাই নিজে সফল হওয়ার পর এখন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তার কাছে প্রশিক্ষণ নিতে আসছেন। অনেকে তার কাছ থেকে চারা নিয়ে সফলভাবে পেঁপে চাষ করছেন।
বাবুগঞ্জের আসলাম উদ্দিন বলেন, আমি তার কাছ থেকে উন্নত জাতের চারা নিয়ে চাষ করে সফল হয়েছি। নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এটি আমার আয়ের নতুন উৎস তৈরি করেছে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রউফ বলেন, আমরা একাধিকবার তার বাগান পরিদর্শন করেছি। তিনি একজন পরিশ্রমী ও উদ্যমী কৃষি উদ্যোক্তা। উন্নতমানের পেঁপের চারা উৎপাদনের মাধ্যমে তিনি কৃষকদের সহায়তা করছেন। তার এই উদ্যোগ অন্যদের জন্যও অনুকরণীয়। তাকে অনুসরণ করে অনেক কৃষক বাণিজ্যিকভাবে পেঁপে চাষে এগিয়ে এলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
সময়ের আলো/জোই