বন্দি ফাঁসির আসামি ২৬০০

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

চাঁদপুরের সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ। নৃশংসভাবে খুন করে ১১ নারীকে। নিম্ন আদালত ২০১৫ সালে তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। উচ্চ আদালতও

2026-07-27T01:52:20+00:00
2026-07-27T01:52:20+00:00
 
  সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬,
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
বন্দি ফাঁসির আসামি ২৬০০
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ১:৫২ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
চাঁদপুরের সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ। নৃশংসভাবে খুন করে ১১ নারীকে। নিম্ন আদালত ২০১৫ সালে তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। উচ্চ আদালতও ওই রায় বহাল রাখেন। কিন্তু এখনও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চূড়ান্ত শুনানি হয়নি। সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বিশেষ সেলে দিন কাটছে এ আসামির।

মাগুরার আলোচিত আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে আসামি হিটু শেখকে গত বছরের ১৭ মে মৃত্যুদণ্ড দেন মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। এর চার দিন পর ডেথ রেফারেন্সের নথি পৌঁছায় হাইকোর্টে। রায় ঘোষণা এবং ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানোর এক বছর পূর্ণ হলেও পরবর্তী অগ্রগতি নেই। অথচ মাত্র ১৪ কার্যদিবসেই শেষ হয়েছিল আলোচিত এ মামলার বিচার।

শুধু রসু খাঁ কিংবা হিটু শেখই নয়, নিম্ন কিংবা উচ্চ আদালতে ফাঁসির আদেশের পর কারাগারে নির্জন প্রকোষ্ঠে দিন কাটছে এরকম প্রায় ২ হাজার ৬০০ বন্দির। তাদের উগ্র আচরণে অতিষ্ঠ কারা 

কর্তৃপক্ষ। বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় রাখতে হয় বলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কারারক্ষীকে নিয়োজিত করতে হয় তাদের নিরাপত্তায়। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবসহ নানাবিধ কারণে বিচারিক আদালতের দেওয়া সাজা উচ্চ আদালত কমে যায়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ খালাস পেয়ে যায় অনেকে।

চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়- নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। এর বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পাচ্ছে আসামিরা। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রমাণ, সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়।

কারা কর্মকর্তাদের মতে, পেপারবুক তৈরিতে দেরি হওয়ায় ডেথ রেফারেন্স বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। বছরের পর বছর ধরে এসব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় আসামি ও বিচারপ্রার্থীর দিন কাটে হতাশায়। মৃত্যুদণ্ডের আদেশপ্রাপ্ত এসব আসামিকে দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট সেলে বিশেষ ব্যবস্থায় রাখার ফলে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আবার এই বিপুলসংখ্যক আসামির জন্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কারারক্ষীকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে অন্য আসামিদের দেখাশোনা করতে বাড়তি চাপে থাকতে হয়। আবার কোনো কোনো মামলার ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতের দেওয়া সাজা উচ্চ আদালতে কমেও যেতে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি হওয়া উচিত বলে মনে করছেন তারা।

কেমন থাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্তরা : কারা অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২৩ জুলাই পর্যন্ত দেশের ৭৪টি কারাগারে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আছে। এর মধ্যে নারী বন্দির সংখ্যা ৭৬ জন।

কারা সূত্রে জানা যায়, কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের রাখা হয় নির্দিষ্ট কক্ষে। কক্ষের আকারভেদে কোথাও একজনকে একটি কক্ষে, কোথাও ৩ জনকে, কোনো কক্ষে ৫ জন, বড় সেল হলে ৭ জনকেও একসঙ্গে রাখা হয়, অর্থাৎ সবই বিজোড়সংখ্যক। প্রচলিতভাবে ফাঁসির আসামিদের রাখার কক্ষকে ‘কনডেম সেল’ বলা হলেও কারা কর্তৃপক্ষের মতে এরকম নামে কোনো সেল নেই কারাগারে।

তবে কোনো সেলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জোড়সংখ্যক বন্দি রাখা হয় না। এর কারণ ব্যাখ্যা করে একজন কারা কর্মকর্তা বলেন, কৌশলগত কারণে কখনোই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জোড়সংখ্যক বন্দিকে এক সেলে রাখা হয় না। এতে তারা একমত হয়ে যেকোনো সময় যেকোনো ধরনের নাশকতার ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা থাকে। বিজোড়সংখ্যক হলে সবাই একমত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। এতে তথ্য পেতে সহজ হয় কারা কর্তৃপক্ষের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কারা কর্মকর্তা জানান, মৃত্যুদণ্ডের আদেশ শোনার পর এসব বন্দির আচরণগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তাদের মানসিক চিকিৎসা দেওয়া হয় কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই কারা কর্মকর্তা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, কারাগারগুলোতে যেখানে সাধারণ চিকিৎসা দেওয়ার চিকিৎসকের তীব্র সংকট সেখানে মনোরোগ চিকিৎসক দেওয়ার চিন্তা করাটা ‘অতিচিন্তা’। তবে তিনি স্বীকার করেন, যেহেতু মৃত্যুদণ্ডের আদেশ শোনার পর এ ধরনের বন্দিদের বিচার প্রক্রিয়ার কারণে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় তাই তাদের মধ্যে বিভিন্ন মানসিক চাপ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।

বিশেষ করে যারা আপনজনদের খুন করে জেলে আসে তাদের মধ্যে অনেকেই প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকে। এরপর যখন তারা মৃত্যুদণ্ডাদেশ পায় তখন অনেকে ট্রমাটাইজড হয়ে পড়ে। এ ধরনের মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষ সদর হাসপাতালে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।


এ প্রসঙ্গে কারা অধিদফতরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও উন্নয়ন) মো. জান্নাত উল ফরহাদ সময়ের আলোকে বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিরা সাধারণ বন্দিদের তুলনায় আচরণগত দিক দিয়ে অনেকটাই ভিন্ন হয়ে থাকে। তাদের সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে মিশতে দেওয়া হয় না। কারাগারের ভেতর নির্দিষ্ট একটি এলাকাতেই তাদের চলাচল সীমাবদ্ধ থাকে। নিয়মানুযায়ী তাদের কোনো কাজও দেওয়া হয় না। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের আচরণও অনেক সময় খুব উগ্র হয়ে থাকে। তাদের বিশেষভাবে নজরদারিতে রাখতে হয় কারা কর্তৃপক্ষকে। তিনি জানান, ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্তদের প্রত্যেকের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন।

কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের ব্যবস্থাপনা বিশেষ চ্যালেঞ্জিং। কারা অধিদফতরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিরা প্রায়ই কারা কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানতে চায় না এবং অনেক সময় উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দি রাখা হয়েছে। আদালতগুলো যদি বিচারাধীন মামলাগুলোর নিষ্পত্তি দ্রুত করে, তবে বন্দির সংখ্যা কমে আসবে।

নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত হলেও আইনগত বিভিন্ন কারণে অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে গিয়ে অনেকেই খালাস পেয়ে যায়। অনেকের সাজা কমে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হয়।

কারা অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের শুরুতে দেশের ৭৪টি কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭০৮ জন। গত ২৩ জুলাই বৃহস্পতিবার এ সংখ্যা ছিল প্রায় ২ হাজার ৬০০ জন।

কারা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে নারী ও শিশু নির্যাতনের অপরাধে ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে ধর্ষণ ও পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের দায়ে। ধর্ষণ ও পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ডটি কার্যকর করা হয় ২০২৩ সালের ২২ জানুয়ারি।

যে নিয়মে ফাঁসি : ফৌজদারি মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে হাইকোর্টকে অবশ্যই সেই দণ্ড অনুমোদন করতে হয়। এ ধরনের আইনি প্রক্রিয়া ‘ডেথ রেফারেন্স’ মামলা হিসেবে পরিচিত।

দণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য বিচারিক আদালতকে অবশ্যই তার রায় এবং মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠাতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে, একজন দণ্ডিত ব্যক্তি জেল আপিল এবং রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করতে পারেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি আরও বিভিন্ন আবেদন জমা দিতে পারেন।
আদালত সাধারণত ডেথ রেফারেন্স, জেল আপিল, আপিল এবং বিবিধ আবেদন একসঙ্গে শুনে থাকে। তবে শুনানি শুরু হওয়ার আগে, কর্মকর্তাদের অবশ্যই মামলার নথিসংবলিত একটি পেপারবুক প্রস্তুত করতে হবে।

এ নথিতে ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (এফআইআর), অভিযোগ গঠনের আদেশ, সাক্ষীদের সাক্ষ্য, বিচারিক আদালতের রায় এবং মামলার অন্যান্য প্রাসঙ্গিক উপকরণ অন্তর্ভুক্ত থাকে।

অনেক ক্ষেত্রে, ডেথ রেফারেন্সের শুনানিতে উল্লেখযোগ্য বিলম্ব হয়। মামলা শেষ হতে প্রায়ই মাস বা বছর লেগে যায়।
এ সময়কালে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কারাগারেই থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, অপরাধ প্রমাণে অপর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়ায় উচ্চ আদালত আসামিদের খালাস দিয়ে থাকেন কিংবা সাজা কমিয়ে দেন।

কারাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আপিল পেন্ডিং হলে অনেক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত রায় হতে ৮ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত লাগে। আপিলযোগ্য মামলা খুব দ্রুত যদি হয়ে থাকে চূড়ান্ত রায়ের জন্য তা হলেও ৫ থেকে ৬ বছর অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু আপিলযোগ্য না হলে চূড়ান্ত রায় এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই হয়ে যায়।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   বন্দি  ফাঁসির আসামি  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: