চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে সম্প্রতি একাধিক বিদেশি জাহাজে সংঘবদ্ধ দস্যুতার কবলে পড়েছে। এর ফলে দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশের অধিকাংশ আমদানি-রফতানি হয় এই বন্দরকে কেন্দ্র করে। বন্দরের বহির্নোঙরের নিরাপত্তা দুর্বল হলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে।
চট্টগ্রাম বন্দর কেবল একটি অবকাঠামো নয়, এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। বহির্নোঙরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে খালাস হয়। এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। শুধু পণ্য ওঠানামার গতি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কোনো বন্দরের দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয় না।
বন্দরের নিরাপত্তা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি বিদেশি জাহাজের মালিক, নাবিক কিংবা বীমা প্রতিষ্ঠান মনে করে কোনো বন্দরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে তা হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। নিরাপত্তার ঘাটতি শেষ পর্যন্ত দেশের ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয়ের ওপরই অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা উদ্বেগজনক। অভিযোগ রয়েছে, একটি জাহাজ থেকে জরুরি সংকেত পাঠানোর পরও দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনটা হলে কেবল অপরাধীদের সাহসই বাড়ে না, নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
অভিযান চালিয়ে ডাকাতি হওয়া মালামাল উদ্ধার বা অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। প্রশ্ন হলো, কেন একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটার সুযোগ তৈরি হলো। বহির্নোঙরের বিস্তৃত এলাকায় নজরদারির সীমাবদ্ধতা, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণের অভাব এবং ঝুঁকিভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনার দুর্বলতা থাকলে কেবল টহল বাড়িয়ে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন হবে।
বহির্নোঙর একটি জটিল কার্যক্ষেত্র। সেখানে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ নয়। সাম্প্রতিক ঘটনার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কোস্ট গার্ড সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। নিয়মিত নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখা যেতে পারে। তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর উদ্বেগ তাতে দূর হচ্ছে না। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আস্থা নষ্ট হলে তা পুনরুদ্ধার করতে অনেক সময় লাগে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বহির্নোঙরে টহল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। জাহাজ আসার তথ্য সংশ্লিষ্ট সব নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে জানানোর ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। ইতিমধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষ, কোস্ট গার্ড ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। তবে ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বন্দরে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে। জাহাজ, শিপিং এজেন্ট, বন্দর কর্তৃপক্ষ, কোস্ট গার্ড, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে নিয়মিত তথ্য বিনিময়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোর জন্য ঝুঁকিভিত্তিক সমন্বিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন এবং তার নিয়মিত মূল্যায়ন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
বাংলাদেশ বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াতে চাচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নির্ভরযোগ্য বন্দর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একটি বন্দরের সুনাম গড়ে উঠতে বহু বছর লাগে। দস্যুতার মতো কয়েকটি ঘটনা সেই আস্থায় চিড় ধরাতে পারে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
সময়ের আলো/এসএকে