জীবনের কিছু মুহূর্ত থাকে, যা স্মৃতির গভীরে অমলিন হয়ে গেঁথে যায়। কর্মজীবনের দীর্ঘ পথচলায় আমার কাছে তেমনই এক অবিস্মরণীয় সন্ধ্যা ২০০৯ সালের ১১ জুন। সেদিন প্রথমবারের মতো সামনাসামনি দেখা হয়েছিল বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে। সময়ের ব্যবধানে অসংখ্য ঘটনা স্মৃতির আড়ালে মিলিয়ে গেলেও সেই সন্ধ্যার প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি অনুভূতি এবং বেগম খালেদা জিয়ার শান্ত, সংযত ও মার্জিত কণ্ঠে উচ্চারিত কয়েকটি উপদেশ আজও আমার হৃদয়ে ঠিক ততটাই স্পষ্ট, যতটা ছিল সেই প্রথম সাক্ষাতের ক্ষণে। কিছু মানুষকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য শুধু স্মৃতি হয়ে থাকে না; তা হয়ে ওঠে জীবনের দীর্ঘ পথচলার এক বাস্তব অভিজ্ঞতা।
সেই সময় আমি সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। মাঠ প্রশাসনের ব্যস্ত দায়িত্বের মধ্যেই একদিন একজন জ্যেষ্ঠ সাবেক আমলা আমাকে জানালেন, ‘তোমার একটি নতুন পোস্টিং হতে পারে।’ আমি কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলাম, কোথায়? তিনি শান্তভাবে উত্তর দিলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে।’
কথাটি শুনে আমি কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে ছিলাম। এমন কোনো সম্ভাবনার কথা আগে কখনো ভাবিনি। এ ধরনের পদায়নের জন্য আমি কোনো তদবিরও করিনি। ফলে সংবাদটি যেমন ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত, তেমনি দায়িত্বটির গুরুত্ব এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীল এমন একটি পোস্টিংয়ের বিষয়ে আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল।
তখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল। মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিদিনই সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হতো। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের বহু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চলছিল। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল আইন ও বিধিবিধানের আলোকে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা। কিন্তু বাস্তবতার সব প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমার মধ্যে সবসময় যে পাওয়া যায় না তা অনেক ঘটনাই আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ব্যথিত করে।
আমার নীরবতা ভেঙে সেই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আবার বললেন, ‘যদি এই পদায়নের আদেশ আসে, কখনো না বলবে না।’ কথাটি আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। সেদিন রাতে আমি দীর্ঘ সময় মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলাম। প্রার্থনা করেছিলাম- যদি এই দায়িত্বে আমার জন্য কল্যাণ নিহিত থাকে, তবে তিনি যেন আমার জন্য সেই পথ উন্মুক্ত করে দেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি হলো। আমাকে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সরকারি সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে পদায়ন করা হলো। নিয়োগের সংবাদটি আমি সঙ্গে সঙ্গে কাউকে জানাইনি। কয়েক দিন বিষয়টি নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলাম। কর্মস্থলের সহকর্মী কিংবা পরিচিতজনদের কাছেও নতুন দায়িত্বের কথা প্রকাশ করিনি।
কাজীপুর ছিল দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক জনপদ। জাতীয় চার নেতার অন্যতম ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং তার ছেলে মোহাম্মদ নাসিমের দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এলাকাটিতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল অত্যন্ত মজবুত ও শক্তিশালী। সেখানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, রাজনৈতিক মতাদর্শে মানুষের ভিন্নতা থাকলেও একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার প্রতি তাদের প্রত্যাশা একটিই- তিনি যেন ন্যায়সংগত, সৎ ও নিরপেক্ষ থাকেন।
২০০৯ সালের ৯ জুন উপজেলার নদীভাঙা এলাকার একটি বালিকা বিদ্যালয়ের ইজারা কার্যক্রমে সরকারি দায়িত্ব পালন করি। দিনের কাজ শেষে উপজেলা মিলনায়তনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সাধারণ মানুষ আমাকে বিদায় জানান। তাদের অনেকেই আন্তরিকভাবে অনুরোধ করেছিলেন, আমি যেন কাজীপুরেই থেকে যাই। মানুষের সেই ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় আমি গভীরভাবে আপ্লুত হয়েছিলাম। কিন্তু তখন আমার সামনে অপেক্ষা করছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দায়িত্ব, ভিন্ন এক বাস্তবতা। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে আমাকে সেই দায়িত্ব গ্রহণ করতেই হতো। ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় আমার মনে হচ্ছিল, আমি শুধু একটি কর্মস্থল পরিবর্তন করছি না; বরং রাষ্ট্র ও রাজনীতির এমন এক অঙ্গনে প্রবেশ করতে যাচ্ছি, যেখানে প্রতিটি দিনই হয়তো ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠবে।
১১ জুন ২০০৯, বৃহস্পতিবার। সকাল আনুমানিক ১০টা। নতুন দায়িত্ব নেওয়ার উদ্দেশ্যে আমি শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবনে বিরোধীদলীয় নেতার কার্যালয়ে উপস্থিত হলাম। সরকারি চাকরিজীবনে এর আগে নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছি, কিন্তু সেদিনের অনুভূতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন কর্মস্থল, নতুন পরিবেশ এবং সম্পূর্ণ নতুন ধরনের দায়িত্ব- সব মিলিয়ে মনে এক ধরনের স্বাভাবিক কৌতূহলের পাশাপাশি অজানা এক শঙ্কাও কাজ করছিল।
জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে বিরোধীদলীয় নেতার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা আন্তরিক সহযোগিতা করেন। এরপর আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় বিরোধীদলীয় নেত্রীর একান্ত সচিব এএসএম সালেহ আহমেদের সঙ্গে। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে আমাকে গ্রহণ করেন। প্রথম সাক্ষাতেই তাকে শান্ত, ধীরস্থির, সংযত এবং অভিজ্ঞ একজন কর্মকর্তা মনে হয়েছিল। যোগদানের প্রয়োজনীয় দাফতরিক কাগজপত্র নিয়ে সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠিয়ে দেন। এরপর নতুন দায়িত্বের প্রশাসনিক কাঠামো, দাফতরিক কার্যপ্রণালি এবং দায়িত্ব পালনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সংক্ষেপে আমাকে জানান।
দেখতে দেখতেই বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। রাত প্রায় সাড়ে ৮টার দিকে সালেহ স্যার আমাকে সঙ্গে নিয়ে গুলশানস্থ বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হলেন। গাড়িতে বসে আমি নীরবে ভাবছিলাম- মনে হচ্ছিল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার কর্মজীবনের এক স্মরণীয় মুহূর্তের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। যার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি, তিনি বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দুবারের বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন। রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করা এমন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ কেমন হবে- স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল আমার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
গুলশান কার্যালয়ে পৌঁছে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো। অপেক্ষার সেই কয়েকটি মুহূর্ত যেন সময়কে আরও দীর্ঘ করে তুলেছিল। অবশেষে আমার ডাক পড়ল বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের। আমি ধীরপায়ে তার কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলাম। কক্ষে প্রবেশ করে সালাম জানালাম। তিনি সালামের উত্তর দিয়ে আমাকে বসতে বললেন।
কক্ষে তখন দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা উপস্থিত ছিলেন। পরিবেশ ছিল শান্ত, গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খল।
প্রথম সাক্ষাৎ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আমি সংযত ছিলাম। সরকারি চাকরিজীবনে বহু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে; তবু এই সাক্ষাৎ ছিল ভিন্ন অনুভূতির। কারণ তিনি শুধু বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, বিএনপির চেয়ারপারসনই নন, তিনি স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক, সাবেক সেনাপ্রধান এবং শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণীও। যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, এ দেশের বিরুদ্ধে সংঘটিত নানা ষড়যন্ত্র ও ঘাত-প্রতিঘাতের এক অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী।
পরিচয়পর্ব শেষ হলে তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ কিছু কথা বললেন। তিনি বললেন, ‘আমরা অনেক সময় আমাদের নিজেদের মানুষদের চিনতে ভুল করি। যারা দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে, সৎ, দক্ষ, মেধাবী এবং ন্যায়ের পথে থাকে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। নিজের মানুষকে চিনতে শেখা খুব জরুরি।’ কথাগুলো ছিল সহজ, কিন্তু গভীর অর্থবহ। প্রথম সাক্ষাতেই উপলব্ধি করলাম, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন নেতার চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে কতটা বাস্তবমুখী করে তোলে। এরপর তিনি নতুন দায়িত্ব পালনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।
খালেদা জিয়া আমাকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে তার সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে বিবেচনা করেননি। তিনি চেয়েছিলেন একজন সৎ, দক্ষ, ন্যায়পরায়ণ ও পেশাদার কর্মকর্তা। আমার ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক পরিচয় তিনি জানতেনই না; কোনো দিন এ বিষয়ে আমাকে জিগ্যেসও করেননি। রাজনৈতিক কোনো আলাপও তিনি আমাদের সঙ্গে করতেন না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ফরমাল এবং অনন্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে প্রথম সাক্ষাতের সেই সন্ধ্যার কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে একটি কারণেই। তা হলো- রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ম্যাডামের নির্দেশনাগুলো ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছিলেন, ‘নিজের মানুষ চেনা, ত্যাগী, সৎ, দক্ষ, মেধাবী ও ন্যায়ের পথে অবিচল মানুষগুলোকে রাষ্ট্রযন্ত্রে কাজে লাগানো।’
বেগম খালেদা জিয়ার সেই কথাগুলো আজও আমার স্মৃতিপটে এক অবিস্মরণীয় নির্দেশনা হয়ে আছে। রাষ্ট্র পরিচালনা, দায়িত্ববোধ, মানুষ চেনার প্রজ্ঞা এবং সৎ, দক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ মানুষের মূল্যায়ন সম্পর্কে তার সেই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর উপলব্ধিগুলো আজও আমার চিন্তা-চেতনা ও কর্মজীবনের পথচলায় অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে। সময়ের ব্যবধানে অনেক ঘটনা স্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গেলেও, সেই প্রথম সাক্ষাতের সন্ধ্যা এবং তার উচ্চারিত কথাগুলো আজও আমার কাছে সমানভাবে প্রেরণা এবং চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
লেখক : নির্বাহী চেয়ারম্যান, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ, অর্থ বিভাগ
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে