গারো সমাজের নানা রীতি পরিবর্তনের ফলে নারীর ক্ষমতা কমেছে। তারপরও নারীরাই পরিবারের যাবতীয় কিছু দেখভাল করে এবং তারাই পরিবারের প্রধান। পুরুষ স্ত্রীর সম্পদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে মাত্র। একসময় গারো নারীরাই পুরো সংসার সামাল দিত। এতে কর্তৃত্ব থাকত নারীদের কাছে।
বাঙালি সমাজে নারী অধিকারের জন্য আন্দোলন করতে হলেও হাজার বছর আগেই গারো সমাজে নারীকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, এ জন্য তাদের কোনো আন্দোলন করতে হয়নি। গারো সমাজে নারীই ক্ষমতার উৎস।
গারো সমাজ কাঠামোতে নারীর রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এই জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনায় নারীর একটি বিশেষ মাত্রা রয়েছে, যা নারীদের বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বকে ইঙ্গিত করে। পরিবার পরিচালনা, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার নানা পন্থা নির্ণয়ে গারো নারী বিশিষ্ট। তারা পরিবার ও সমাজে পুরুষের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে দেখা যায়। তারা দায়িত্বের প্রতি এতই যত্নশীল যে, ঘরে-মাঠে এবং হাট-বাজারে সমানভাবে কাজ করে। গারো পুরুষরা কখনো কখনো অলস জীবনযাপন করলেও গারো নারীদের যেন ক্লান্তি ছুঁতে পারে না।
কৃষিনির্ভর গারোদের জীবন-জীবিকায় নারীর উপস্থিতি
কৃষির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। কখন কোন ফসল উৎপাদন করতে হবে, কোন বীজ বুনতে হবে সেটা তারাই ঠিক করেন। বীজতলা থেকে শুরু; জমি চাষ, ফসলের যত্ন, জৈব সার ও কীটনাশক দেওয়া, ফসল তোলা- সবই করেন গারো নারীরা। পাহাড় ও মাঠ থেকে ফসল আনার মতো কঠিন শ্রম দেন। নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর ক্ষেত-খামারে উৎপাদিত শস্য বাজারে নিয়ে যান। দূরের কোনো হাটের গন্তব্যে যেতেও তারা অলসতা করেন না। গৃহকাজে ব্যবহার্য পণ্যসামগ্রী, হাতে তৈরি জিনিসপত্র, হাঁস-মুরগি, লাকড়িসহ নানা প্রকার জিনিসপত্র নিয়ে তারা বাজারে আসে। ফলে গারো নারীদের হাট-বাজারে এবং দোকানি তৎপরতা থেকেও নারীর বিশিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায়।
জোঙ্গায় গাছের ছাল বেঁধে তা কপালে ঝুলিয়ে মাইলের পর মাইল পথ বেয়ে চলে গারো নারী, এই দৃশ্য সত্যিই কষ্টকর তবে চমকপ্রদ। যা প্রমাণ করে গারো নারীদের কষ্টসহিষ্ণুতা। জুমচাষেও রয়েছ নারীর একচ্ছত্র সহযোগী ভূমিকা। এ ছাড়া গৃহস্থালি, বাজারঘাট, সন্তান লালনপালন, চাকরি, ব্যবসা, নদী ও খনি থেকে কয়লা ও পাথর উত্তোলন, কুটির শিল্প, এনজিও কার্যক্রম, সংগঠন পরিচালনা, সামাজিক কার্যক্রম এবং পরিবার পরিচালনায় গারো নারীরা একচ্ছত্র ভূমিকা পালন করে। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন ঋতুর উপকরণের খোঁজেও ব্যস্ত থাকে গারো নারী। দেখা গেছে বাবা অলস দিন পার করে নানা স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু মা মাঠে বা অফিসে কাজ করার সময় সন্তান কোলে-পিঠে বেঁধেই কাজ করছে। নারীরা পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি আন্তরিক ও সচেতন।
গারো সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে মেয়েরাই ভূসম্পত্তির অধিকারী হয়। কারও
মেয়ে সন্তান না থাকলে বোনের মেয়ে উত্তরাধিকার হয়। গারোরা ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের ব্যক্তি সত্তার অধিকারী মনে করে না।
গারো সমাজে নারীর দিক থেকে আত্মীয়তা নির্ধারিত হয়। গোত্রের নাম, সামাজিক ও রাজনৈতিক পদবি মায়ের দিক থেকে হয়। তিন প্রজন্মের নারীদের নিয়ে মাতৃক্ষেত্র তৈরি হয়। মায়ের বংশ সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হয়। গারো সমাজ কাঠামোর উল্লেখযোগ্য দিক ‘মাহারীবাদ’। মাহারীর কর্তৃত্বে পরিবার পরিচালিত হয়। মাহারীবাদ মাতৃতান্ত্রিক সমাজের পরিচয় বহন করে। তাই সন্তানরা মা ও মাহারীর পরিচয়ে বড় হয় এবং মায়ের বংশ ও পদবির মাধ্যমে তারা পরিচিত হয়।
মাতৃসূত্র রীতিতেই তারা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। পরিবারের সম্পত্তি যাতে বাইরে না যায় এ জন্য মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ধরে রাখা হয়েছে। মেয়েরা মায়ের সব সম্পত্তির অধিকারী হয়। পুরুষরা কোনো সম্পত্তির মালিক হয় না। তাকে সম্পদহীনভাবে জীবন কাটাতে হয়। মাতৃতান্ত্রিক উত্তরাধিকারে ছোট মেয়ে মায়ের সব সম্পত্তির মালিক হয়। ছোট মেয়ে নকনা নামে পরিচিত। তার স্বামীকে বলা হয় নকরম। ছোট মেয়ের কদর সবচেয়ে বেশি। নকনার স্বামী হওয়া সৌভাগ্যের বিষয়।
ছেলেরা বিয়ের আগে মায়ের সম্পত্তির প্রতি আগ্রহ দেখায় না। সম্পত্তির মালিকানা ভবিষ্যতে বোনের হাতে বর্তাবে এই ভেবে অমনোযোগী থাকে। স্ত্রীর মৃত্যু ঘটলে অনেক সময় বিপত্নীক স্বামীকে রিক্ত হস্তে গৃহত্যাগ করতে হয়। তাই পুরুষরা সংসারে তেমন মনোযোগী হয় না। বোন ভাইয়ের কাজের অবহে লা এবং অপব্যয় সহ্য করতে চায় না। তাই ভাইকে বিয়ে দেওয়ার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে। ছেলে ঘরজামাই হয়ে চলে গেলে মেয়েরা নিজেদের ইচ্ছেমতো সংসার সাজায়।
পুরুষ স্ত্রীর সম্পত্তির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে। তিনি স্ত্রীর অনুমতিক্রমে কাজ করে থাকেন। তবে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। গারো সমাজে একই মাহারীর পুরুষ ও মহিলার বিয়ে নিষিদ্ধ। কারও স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর জন্য নতুন বর নির্ধারণের ক্ষেত্রে মাহারীর লোকেরা দায়িত্ব পালন করে। এটি আখম প্রথা হিসেবে অভিহিত। বিপত্নীক বা বিধবা কেউ নিজের খেয়াল-খুশি মতো বিয়ে করতে পারে না। তাদের সমাজ ব্যবস্থা এখনও টিকে রয়েছে জাতি ব্যবস্থায়। সন্তান পিতার জ্ঞাতি ব্যবহার না করে মায়ের জ্ঞাতি ব্যবস্থা অনুসরণ করে। মায়ের ভাই পিতার সামাজিক দায়িত্ব পালন করে। পিতা নিজ সন্তানের চেয়ে বোনের সন্তানের দায়িত্বের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়।
তবে বর্তমানে গারো সমাজে কিছুটা পুরুষতন্ত্রের প্রভাব লক্ষ করা যায়। মাতৃতান্ত্রিকতায় রাজনৈতিক এবং খ্রিস্টান চার্চের প্রভাবে এখন পরিবারের সিদ্ধান্ত কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ মিলে যৌথভাবে নিচ্ছেন। ধর্মীয় এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত অনেকাংশেই ফাদাররা দিয়ে দিচ্ছেন। তবে পরিবারের কথা যাতে বাইরের লোক না জানতে পারে সে ক্ষেত্রে বয়স্ক নারীদের আমলে আনা হচ্ছে। প্রতিটি গারো পরিবার একেকটি যৌথ পরিবার। তাই ছেলে-মেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, দাদু-দিদিমা নিয়ে পরিবার গঠিত। বর্তমানে গারোদের মধ্যে যৌথ পরিবার থাকছে না। শিক্ষার প্রসার, জীবিকার পরিবর্তন, প্রবল ব্যক্তিস্বার্থ প্রভৃতির ফলে যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও শ্বশুর-শাশুড়িও একক পরিবারে স্থান পাচ্ছে না।
আজ থেকে পাঁচ-ছয়শ বছর আগে গারোরা পিতৃতান্ত্রিক ছিল। বড় ছেলে সম্পত্তির মালিক হতো। ছেলেরা বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি চলে যেত। পরিবারের সম্পত্তি যাতে বাইরে না যায় এ জন্য সমাজের ধরন পরিবর্তন করে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ধরে রাখা হয়। বর্তমানে নানা পরিবর্তনশীলতার কারণে মেয়েরা বিয়ে করে স্বামীর বাড়িতে চলে যাচ্ছে। এর ফলে অনেকেই যৌতুকও গ্রহণ করছে, কিন্তু তারপরও কোন না কোন মেয়েসন্তান মাতৃসূত্রীয় রীতি ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিজ্ঞানী হেনরি মেইনের মতে, পুরুষতান্ত্রিকতা সমাজের সার্বজনীন এবং মৌলিক একক। গারো সমাজে এর প্রভাব পড়েছে।
সবাই এখন নিজ নিজ চিন্তা করছে, তাই আর আগের মতো সবকিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না। গারো সমাজের আশপাশে বাঙালি সমাজ ঢুকে পড়ায় সেই প্রভাবও পড়ছে তাদের মধ্যে। সমাজের নানা অনাচার ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে পরিবারে পুরুষের গুরুত্ব কিছুটা বাড়ছে। গারো জনপদে বহিরাগতদের আগমন এবং বাইরের সংস্কৃতির প্রভাবে তারা গোত্রভিত্তিক এক সঙ্গে থাকতে পারছে না, ফলে গারো অধ্যুষিত এলাকার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষিত গারো ছেলে-মেয়েরা
বাইরের সংস্কৃতির প্রভাবে অনেকাংশেই মায়ের পরিবর্তে বাবার টাইটেল ব্যবহার করছে এবং ছেলেরা ঘরজামাই হতে চাচ্ছে না।
বর্তমানে বাঙালি পরিবারে গারো মেয়েদের বিয়ে, মিশনারি তৎপরতা ও বাঙালিদের আগমনের ফলে গারো নারীদের ক্ষমতা কিছুটা খর্ব হচ্ছে। নারীরা বহির্মুখী হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে ফেলছে নিজেদের আদি ক্ষমতা। তবে গারো সমাজের নানা রীতি পরিবর্তনের ফলে নারীর ক্ষমতা কমেছে। তারপরও নারীরাই পরিবারের যাবতীয় কিছু দেখভাল করে এবং তারাই পরিবারের প্রধান।
পুরুষ স্ত্রীর সম্পদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে মাত্র। একসময় গারো নারীরাই পুরো সংসার সামাল দিত। এতে কর্তৃত্ব থাকত নারীদের কাছে। বাঙালি সমাজে নারী অধিকারের জন্য আন্দোলন করতে হলেও হাজার বছর আগেই গারো সমাজে নারীকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, এ জন্য তাদের কোনো আন্দোলন করতে হয়নি। গারো সমাজে নারীই ক্ষমতার উৎস।
বর্তমানে কিছু লোভী মানুষ গারো নকনাদের বিয়ে করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাধর অসাধু ব্যক্তিরা গারো সমাজে প্রবেশ করে গারোদের আদি বিয়ে পদ্ধতির পরিবর্তন করেছে। অন্য ধর্মের লোকের প্রাদুর্ভাবে গারো সমাজে বিয়ের ক্ষেত্রেও ঐতিহ্যের টানাপোড়েন হচ্ছে। আজকের দিনে ছেলেরা বাইরের জগৎ এবং শিক্ষিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই চালচিত্রে হাওয়া বদলের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তবে নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের বর্তমানে তাদের সংস্কৃতি ও আচারে মনোযেগী হতে দেখা যাচ্ছে। গারো নারীর নিজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মাঝে রয়েছে আপন সত্তা। নারীরা তাদের পরিশ্রম দিয়ে ধরে রেখেছে পরিবার ও সমাজের কর্তৃত্ব।
গবেষক ও লেখক, আঞ্চলিক পরিচালক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/এসএকে