জুলাই ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৬। ক্যালেন্ডারে মাত্র দুই বছর। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেন দুই যুগ। এই সময়ে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেছে, পুরোনো জোট নতুন রূপে ফিরে এসেছে, আর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একদল তরুণ মুখ। যে প্রজন্ম একসময় রাজপথে স্লোগান দিয়েছিল, তাদের অনেকেই আজ সংসদে, সরকারে কিংবা দলীয় নেতৃত্বে।
দুই বছর আগে রাজপথের সবচেয়ে শক্তিশালী স্লোগান ছিল পরিবর্তন। সেটি শুধু সরকার পরিবর্তনের দাবি ছিল না; রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের আকাঙ্ক্ষাও ছিল। সেই আকাঙ্ক্ষাই হাজারো তরুণকে রাজপথে নামিয়েছিল, অসংখ্য পরিবারকে ত্যাগ স্বীকারে বাধ্য করেছিল এবং বাংলাদেশের রাজনীতিকে নতুন মোড়ে নিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু দুই বছর পর দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি আগের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ; ক্ষমতা বদলেছে, রাষ্ট্রও কি আসলেই বদলেছে? সরকার পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে দ্রুত ঘটে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিবর্তন একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।
এই দুই বছরে অনেক কিছুই বদলেছে। নতুন রাজনৈতিক দল এসেছে, পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙেছে, নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজপথে নেতৃত্ব দেওয়া অনেক তরুণ এখন জাতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ। কেউ সংসদ সদস্য, কেউ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে, কেউ নতুন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে। একই সঙ্গে তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না। তবে এটাও সত্য, পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে যাদের মানুষ দেখেছিল, তাদের প্রতিও এখন আগের মতো নিঃশর্ত আস্থা নেই।
এটি অস্বাভাবিক নয়। গণতন্ত্রে ক্ষমতা যত বাড়ে, জবাবদিহির প্রত্যাশাও তত বাড়ে। যারা একসময় ক্ষমতার সমালোচক ছিলেন, ক্ষমতায় এসে তারাও একই ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হন। ইতিহাসের এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।
জুলাই আন্দোলনের পর সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ ছিল— সংস্কার। নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ, স্থানীয় সরকার, রাষ্ট্রের বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান; সবখানেই পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিছু কাঠামোগত পরিবর্তনের আলোচনা হয়েছে, আবার কিছু সংস্কার বাস্তবায়নের পথেও এগিয়েছে। কিন্তু সাধারণ নাগরিকের দৃষ্টিতে প্রশ্নটি এখনো একই, এই পরিবর্তনের বাস্তব প্রতিফলন কতটা দেখা যাচ্ছে?
একজন রিকশাচালক, একজন কৃষক, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা একজন নতুন চাকরিপ্রার্থী রাষ্ট্রকে মূল্যায়ন করেন ভিন্নভাবে। তাদের কাছে রাজনৈতিক তত্ত্বের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, সরকারি সেবার মান, আইনশৃঙ্খলা এবং ন্যায়বিচারের সহজ প্রাপ্তি। যদি এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নতি না আসে, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাফল্যও সাধারণ মানুষের কাছে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
রাষ্ট্র পরিচালনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তি বদলানো সহজ, প্রতিষ্ঠান বদলানো কঠিন। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে হয়। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রত্যাশাও ছিল সেটিই। সেই যাত্রা শুরু হয়েছে কি না, তা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু এটি এখনো শেষ হয়নি, এ বিষয়ে দ্বিমত করা কঠিন।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে মানুষের মানসিকতায়। একসময় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি সহজেই আশা তৈরি করত। এখন মানুষ অপেক্ষা করে ফলাফলের জন্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, দ্রুত তথ্যপ্রবাহ এবং রাজনৈতিক সচেতনতা নাগরিকদের আরও প্রশ্নমুখী করেছে। এখন শুধু বক্তৃতা নয়, সিদ্ধান্তও মূল্যায়িত হয়। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নও পরিমাপ করা হয়।
এটি গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক লক্ষণ। কারণ প্রশ্নহীন রাজনীতি কখনোই জবাবদিহিমূলক হয় না।
তবে এই দুই বছরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত অন্য জায়গায়। আন্দোলন একটি সরকারকে সরিয়ে দিতে পারে, কিন্তু একটি উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারে না। সেই কাজের জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি নীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক আত্মসংযম। এই চারটির কোনো বিকল্প নেই।
আরও একটি বিষয় ভুলে যাওয়া উচিত নয়। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, যারা পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য ছিল না। তারা এমন একটি রাষ্ট্রের প্রত্যাশা করেছিলেন, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জবাবদিহির সংস্কৃতিও প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই প্রত্যাশা এখনো অপূর্ণ থাকলে, সেটি শুধু কোনো একটি সরকারের ব্যর্থতা নয়; সেটি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা।
দুই বছর পর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নতুন দল কে, নতুন মুখ কে বা আগামী নির্বাচনে কে জিতবে, তা নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়তে পারছি, যেখানে ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, রাষ্ট্র একইভাবে আইন, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে দাঁড়াবে?
উত্তর, না।
জুলাইয়ের প্রকৃত উত্তরাধিকার ক্ষমতার পালাবদল নয়। এর প্রকৃত উত্তরাধিকার হবে এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে পরিবর্তন কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানের শক্তির ওপর।
ইতিহাসের বিচার কখনো তাড়াহুড়ো করে হয় না। কিন্তু ইতিহাস একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে মনে রাখে—যে আন্দোলন যত বড়ই হোক, তার প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণ হয় ক্ষমতা দখল দিয়ে নয়, ক্ষমতা ব্যবহারের সংস্কৃতি দিয়ে।
সেই পরীক্ষার ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
লেখক : সাংবাদিক
সময়ের আলো/জেডআই