ভারতে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নজরদারি চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এই বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। আন্দোলন শেষ হয়ে গেলেও বিক্ষোভকারীদের ওপর নজরদারি, তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন এক আন্দোলনকারী।
জাতীয় যোগ্যতা নির্ধারণ পরীক্ষা (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে দিল্লিতে হওয়া ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশ একটি বিশেষ নজরদারি ভ্যান ব্যবহার করেছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের প্রকাশ করা ছবিতে দেখা যায়, ‘ইক্ষণ’ নামের ওই মোবাইল ভ্যানের ওপর একটি বিশেষ ক্যামেরা বসানো ছিল। ক্যামেরাটি চারপাশের ৩৬০ ডিগ্রি এলাকার মানুষের ওপর নজর রাখতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়েছে।
ছাত্র আন্দোলনকারী আইশে ঘোষ দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করে বলেছেন, এ ধরনের ব্যাপক নজরদারি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের পরিপন্থী। তিনি আদালতের কাছে দাবি করেছেন, আন্দোলনের সময় সংগ্রহ করা ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলা হোক এবং ভবিষ্যতে নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য স্পষ্ট নিয়ম তৈরি করা হোক।
যদিও আন্দোলন শেষ হয়েছে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর সরকার পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য একটি ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ কমিটি গঠন করেছে, তবুও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে করা মামলাটি চালিয়ে যাচ্ছেন আইশে ঘোষ।
মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্ক
ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ভারতে পুলিশের মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য এখনো নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। তাদের দাবি, আন্দোলনকারীদের ওপর এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে।
তবে সরকারের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তার স্বার্থেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং এটি আইন অনুযায়ী করা হয়েছে।
বিরোধী দল ও বিভিন্ন ডিজিটাল অধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, সরকার নজরদারির ক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং মানুষের ডিজিটাল যোগাযোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, দেশের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ রক্ষার জন্যই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
শুক্রবার আদালতে শুনানির সময় ভারতের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা পুলিশের পক্ষ নিয়ে বলেন, প্রকাশ্য সমাবেশে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের গোপনীয়তার দাবি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এ ধরনের নজরদারি প্রয়োজনীয় ছিল।
আন্দোলনকারীদের তথ্য মুছে ফেলার দাবি
দিল্লিভিত্তিক ডিজিটাল অধিকার সংগঠন ‘ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন’ দিল্লি পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দিয়ে আন্দোলনস্থল থেকে সংগ্রহ করা বায়োমেট্রিক তথ্য মুছে ফেলার দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনটির বক্তব্য, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তার ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ করা উচিত নয়।
তবে দিল্লি পুলিশ দাবি করেছে, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারও স্বাধীনতা বা অধিকার সীমিত করা হয়নি।
প্রযুক্তি আইন বিশেষজ্ঞ আকাশ কারমাকার বলেন, নিরাপত্তার প্রয়োজন থাকলেও নজরদারি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি থাকা জরুরি।
তিনি বলেন, যদি আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, তাহলে পুলিশ সদস্যদের আচরণ ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার।
আন্দোলনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ
অভিযোগ উঠেছে, আন্দোলনস্থলে আসা কিছু বিক্ষোভকারীর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের তথ্যও পুলিশ সংগ্রহ করছিল।
দিল্লি পুলিশের কর্মকর্তা সুনীল কুমার বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক রেকর্ড রয়েছে, তারা যেন আন্দোলনের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই এসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছিল।
এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা নজরদারি ভ্যান
আন্দোলনস্থলে থাকা নজরদারি ভ্যানটিতে দিল্লি পুলিশের প্রতীক এবং ‘ইক্ষণ’ নাম লেখা ছিল। ভ্যানটির প্রযুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা না হলেও, সিসিটিভি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিপি প্লাস জানিয়েছে, তারা দিল্লি পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য নজরদারি সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এসব সরঞ্জাম কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তথ্য কোথায় সংরক্ষণ করা হবে এবং পরিচালনার পদ্ধতি কী হবে— এসব সিদ্ধান্ত পুলিশের নিজস্ব কর্তৃপক্ষ নিয়েছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভ্যানের ভেতরের কম্পিউটার স্ক্রিনে মুখ শনাক্ত করার ব্যবস্থা চালু ছিল। সেখানে একটি মুখের চারপাশে সবুজ চিহ্ন এবং ‘ফেস অ্যাকুরেসি’ নামে একটি মিল শনাক্ত করার সূচক দেখা যায়।
পুলিশ কর্মকর্তা রাজ কুমার দাহিয়া বলেন, এই প্রযুক্তি পূর্বে অপরাধের ইতিহাস থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে এবং আন্দোলনকারীদের সংখ্যা হিসাব করতেও সাহায্য করে।
নজরদারি প্রযুক্তি নিয়ে এই মামলা ভারতে ভবিষ্যতে পুলিশ কীভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য কতটা সুরক্ষিত থাকবে এবং নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে— এসব প্রশ্নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র : রয়টার্স
সময়ের আলো/ইউএমএইচ