আজ ২৯ জুলাই। বিশ্ব বাঘ দিবস। জলবায়ু পরিবর্তনে আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য, খাদ্য সংকট ও কার্যকর টেকসই পদক্ষেপের অভাবে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে অস্তিত্ব সংকটে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই দশকে সুন্দরবনে বাঘের টিকে থাকার লড়াইটা আরও কঠিন করে তুলেছে। পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী ও নান্দনিক প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার বৈশ্বিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন এটি।
২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক টাইগার সামিটে দিনটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তখন বিশ্বে বন্য পরিবেশে বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় ১৩টি বাঘ-আবাসী দেশ যৌথভাবে সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের অঙ্গীকার করে।
বাংলাদেশের জন্য দিবসটির গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনই দেশের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র প্রাকৃতিক আবাসস্থল। বাঘ শুধু একটি প্রাণী নয়; এটি সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল, জীববৈচিত্র্য ও বনভূমির সুস্থতার প্রধান নির্দেশক। বন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘ টিকে থাকলে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রও টিকে থাকবে, আর সুন্দরবন টিকে থাকলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল প্রাকৃতিক সুরক্ষা পাবে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা একশর কিছু বেশি। কয়েক দশক আগে যেখানে শিকার, বন উজাড় ও চোরাকারবারের কারণে বাঘের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছিল, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি, ক্যামেরা ট্র্যাপ, স্মার্ট পেট্রোলিং এবং বন রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বিভিন্ন দেশে সমন্বিত উদ্যোগের ফলে বন্য পরিবেশে বাঘের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে বিশ্বের মোট বাঘ এখনও কয়েক হাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং তাদের আবাসস্থল আগের তুলনায় অনেক বেশি খণ্ডিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্জিত সাফল্য ধরে রাখতে হলে সীমান্তবর্তী বনাঞ্চল সংরক্ষণ, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য বন্ধ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ কার্যক্রমে আরও সম্পৃক্ত করার বিকল্প নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সংখ্যাগত স্থিতিশীলতা অর্জিত হলেও ঝুঁকি এখনও কাটেনি।
২০২৪ সালের বাঘ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি। এর আগে ২০১৫ সালের বাঘশুমারি অনুযায়ী, সুন্দরবনে বাঘ ছিল ১০৬টি। ২০১৮ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ১১৪টি। আগের বছরের চেয়ে ২০২৪ শুমারিতে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে ১১টি। জরিপে ২১টি বাঘশাবকের ছবি পাওয়া গেছে। ২০১৪ ও ২০১৮ শুমারিতে মাত্র ৫টি বাঘশাবকের ছবি পাওয়া গিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের বাঘ সংরক্ষণে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের কারণে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র পরিবর্তিত হচ্ছে। এতে বাঘের আবাসস্থল এবং শিকার প্রাণীর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দ্বিতীয়ত মানুষ-বাঘ সংঘাত।
খাদ্যের সন্ধানে বা আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় অনেক সময় বাঘ লোকালয়ে চলে আসে। আবার বনজীবীরা বনাঞ্চলে প্রবেশ করলে সংঘাতের ঘটনাও ঘটে। তৃতীয়ত অবৈধ শিকার ও বন্যপ্রাণী পাচার। আন্তর্জাতিক বাজারে বাঘের চামড়া, হাড় ও বিভিন্ন অঙ্গের চাহিদা এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্রের তৎপরতা সংরক্ষণ কার্যক্রমের জন্য বড় হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে।
পরিবেশবিদদের মতে, বাঘকে আলাদা করে সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। সুন্দরবনের বনভূমি, নদী-খাল, হরিণ, বন্য শূকরসহ পুরো বাস্তুতন্ত্রকে একসঙ্গে রক্ষা করতে হবে। কারণ বাঘ খাদ্যশৃঙ্খলের সর্বোচ্চ স্তরের প্রাণী। এর সংখ্যা কমে গেলে পুরো বনজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে সুন্দরবন বাংলাদেশের জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে জীবন্ত প্রতিরক্ষা দেয়াল। তাই বাঘ সংরক্ষণ মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; বরং দেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকাকে সুরক্ষিত রাখা।
এ বছরও বিশ্ব বাঘ দিবসে বিভিন্ন দেশ সচেতনতামূলক কর্মসূচি, আলোচনা, শিক্ষামূলক কার্যক্রম ও প্রচারের আয়োজন করেছে। সংরক্ষণবাদীদের মতে, বাঘ শুধু একটি জাতীয় গর্বের প্রতীক নয়; এটি একটি সুস্থ বন, নিরাপদ পরিবেশ এবং টেকসই ভবিষ্যতের প্রতীক। তাই বাঘ রক্ষায় সরকার, বন বিভাগ, গবেষক, স্থানীয় জনগণ এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে সুন্দরবন ও বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি