দেশের বাজারে প্রচলিত টুথপেস্টে ব্যবহৃত মাইক্রোপ্লাস্টিক নিরাপদ কি না, তা নিরূপণে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। স্বাস্থ্য সচিব ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মহাপরিচালকের প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রুলসহ এ আদেশ দেন।
দেশের বাজারে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা নিয়ে গত সোমবার দুটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন ছাপা হয়। এ দুটিসহ এ বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসা প্রতিবেদন যুক্ত করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন গতকাল রিট করেন। উচ্চ আদালতে গতকালই রিটটির শুনানি হয়। আইনজীবী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন রিটের পক্ষে নিজেই শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যার্টনি জেনারেল মো. ফারুক হোসেন।
আইনজীবী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিশেষজ্ঞ নিয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে হাইকোর্টের আদেশ গ্রহণের ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটিতে বিএসটিআই, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি নিয়ে কমিটি গঠন করতে বলা হয়।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ার বিষয়টি এসেছে উল্লেখ করে আব্দুল্লাহ আল মামুন আরও বলেন, প্রচলিত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির মাত্রা, মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য কতটুকু ক্ষতিকর কিংবা কতটুকু সহনীয়, এসব দিক তদন্ত করবে কমিটি। পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৫ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়েছে।
রুলে টুথপেস্টের ক্ষেত্রে জাতীয় মানদণ্ড ও নির্ধারিত শর্ত নিশ্চিতে ব্যর্থতা কেন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। পরিবেশ সচিব, স্বাস্থ্য সচিব, শিল্প সচিব, পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক ও বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালকসহ বিবাদীদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
ব্যবস্থা নিচ্ছে বিএসটিআই :
অন্যদিকে বিএসটিআই জানিয়েছে তারা বাজারের টুথপেস্টগুলো পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে। বেসরকারি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত গবেষণায় টুথপেস্টের ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ার তথ্য জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় সংস্থাটি।
বিএসটিআই জানিয়েছে, তারা নিজ উদ্যোগে বাজার ও কারখানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দেশি বা বিদেশি স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পুনরায় পরীক্ষা করবে। যদি পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে, কোনো পণ্য বাংলাদেশ মান পূরণ করেনি অথবা অনুমোদনহীন উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, তা হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট আকারের ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যা খালি চোখে সাধারণত দেখা যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে মাইক্রোপ্লাস্টিক একটি উদীয়মান পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের বিষয়। মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়ে এখনও গবেষণা চলমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সর্বপ্রথম যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে টুথপেস্টসহ কসমেটিক্স পণ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। ইউরোপীয় আইনে টুথপেস্টসহ কসমেটিক্স পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধে উৎপাদনকারীদের ২০২৭ সালের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে সংযোজিত প্লাস্টিকের মাইক্রোবিড ব্যবহার নিষিদ্ধ।
ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশের স্ট্যান্ডার্ডে বা আইএসও, এএসটিএম প্রভৃতি আন্তর্জাতিক মান সংস্থা প্রণীত মানে টুথপেস্ট পণ্যের জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো মাত্রা বা ব্যবহার নিষিদ্ধের বিষয় উল্লেখ নেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে টুথপেস্টে অনিচ্ছাকৃতভাবে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য কোনো নির্দিষ্ট গ্রহণযোগ্য সীমা বা একক পরীক্ষাপদ্ধতি এখনও নির্ধারণ করা হয়নি।
টুথপেস্ট পণ্যের জন্য ‘বিডিএস ১২১৬ : ২০১২ স্পেসিফিকেশন ফর টুথপেস্ট’ শিরোনামে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে। এসআরও নম্বর ৫০-আইন/২০১৯ এবং এসআরও নম্বর ৫১-আইন/২০১৯ জারির মাধ্যমে সরকার টুথপেস্ট বিক্রি-বিতরণের ক্ষেত্রে বিএসটিআই থেকে ওই স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী রাসায়নিক, মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ও সেফটি প্যারামিটার পরীক্ষার পর লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে।
বিএসটিআই প্রণীত বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার সংক্রান্ত সরাসরি কোনো বিধি-নিষেধ না থাকলেও ওই স্ট্যান্ডার্ডে টুথপেস্ট উৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য ৮১টি উপাদানের তালিকা দেওয়া হয়েছে, যেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিক উল্লেখ নেই। বিএসটিআই থেকে সনদ দেওয়ার সময় টুথপেস্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যাচাই করা হয়, বিধায় টুথপেস্ট উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের সুযোগ নেই।
শুধু কোনো পরীক্ষায় প্লাস্টিকজাত কণা পাওয়া গেছে বলেই সেটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করেছে বা সেটি মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। এ জন্য আরও বিস্তারিত পরীক্ষা, কণার ধরন, উৎস, পরিমাণ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এ কারণে বিএসটিআই এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে গবেষণার পূর্ণাঙ্গ তথ্য, পরীক্ষা পদ্ধতি, পরীক্ষার ডাটা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের কাছ থেকেও কাঁচামাল, পণ্যের উপাদান এবং সিনথেটিক পলিমার ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ও আইনগত যাচাই ছাড়া কোনো ব্র্যান্ড বা টুথপেস্টকে অনিরাপদ বা নিম্নমানের বলে ঘোষণা করাও সঠিক হবে না বলে মনে করছে বিএসটিআই।
সংস্থাটি আরও বলেছে, এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ অধিদফতর, ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর, দন্ত চিকিৎসক, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তা প্রতিনিধিদের নিয়ে টুথপেস্টের বাংলাদেশ মান পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেলে টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিক মাইক্রোবিড ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, উপাদান প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এবং পরীক্ষাপদ্ধতি সংযোজনসহ বাংলাদেশ মান হালনাগাদ করা হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি