রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি বালিকা ফুটবলের ফাইনালে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে সবার নজর কেড়েছেন রংপুর অঞ্চলের ফরোয়ার্ড স্মৃতি কিসকো। রাজশাহী অঞ্চলকে ৪-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জয়ের ম্যাচে দুটি গোল করেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে ৮ গোল করে আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও নিজের করে নিয়েছেন এই কিশোরী ফুটবলার।
মাঠে গোল করার দক্ষতায় প্রশংসা কুড়ালেও মাঠের বাইরের জীবনটা স্মৃতির জন্য মোটেও সহজ নয়। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছেন তিনি। পরিবারের দায়িত্ব এখন তার মায়ের কাঁধে। অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে সংসার চালান মা। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ফলে পরিবারের আর্থিক বাস্তবতার মধ্যেই বেড়ে উঠতে হয়েছে স্মৃতিকে।
ফাইনাল শেষে নিজের সাফল্য নিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বাস না দেখিয়ে স্মৃতি বলেন, চ্যাম্পিয়ন হতে পেরে তার খুব ভালো লাগছে। রংপুর থেকে এসে শিরোপা জেতার আনন্দই এখন সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ফুটবলের হাতেখড়ি রংপুরের একটি একাডেমিতে। সেখানেই থাকা, খাওয়া ও অনুশীলন সবকিছুই চলে তার। নতুন কুঁড়ি টুর্নামেন্টের আগেও সেখানেই নিয়মিত প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। স্মৃতির বিশ্বাস, একাডেমির কোচদের কাছ থেকেই তিনি একজন স্ট্রাইকার হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার শিক্ষা পেয়েছেন।
পরিবারের কঠিন বাস্তবতা সত্ত্বেও খেলার পথে সবসময় সমর্থন পেয়েছেন মা ও বড় বোনের। তবে সমাজের অনেকেই মেয়েদের ফুটবল খেলাকে ভালো চোখে দেখতেন না। নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হলেও সেসব উপেক্ষা করেই নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে গেছেন তিনি।
স্মৃতি জানান, ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন না থাকায় নিয়মিত মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারেন না। ফাইনালের পরও কোচের ফোন ব্যবহার করে মাকে নিজের সাফল্যের খবর দিয়েছেন।
বর্তমানে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার জারুল্লাপুর স্কুলের শিক্ষার্থী স্মৃতি। পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত ফুটবল চালিয়ে যাচ্ছেন। আবাসিক একাডেমিই তার বর্তমান ঠিকানা। সেখানে কোচ মিলন মিয়ার তত্ত্বাবধানে অনুশীলনের পাশাপাশি থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। নিজের এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে কোচের অবদান সবচেয়ে বেশি বলেও মনে করেন তিনি।
ফাইনালে না খেলতে পারা সতীর্থ অনন্যার কথাও ভুলে যাননি স্মৃতি। মাথায় আঘাত পেয়ে ৯টি সেলাই পড়ায় মাঠে নামতে পারেননি অনন্যা। স্মৃতির বিশ্বাস, অনন্যা খেলতে পারলে দল আরও ভালো পারফর্ম করতে পারত।
স্মৃতি বলেন, আমরা তো দুই বোন। আমার বড় দিদি আছে, বিয়ে হয়েছে। এখন তো স্বামীর বাড়ি থাকে। আমার মা থাকে বাড়িতে আর আমি তো একাডেমিতে থাকি। বড় বোনও তাকে উৎসাহ দেন, ‘হ্যাঁ, সাপোর্ট দেয় আমার দিদি। আমার ভাই নাই। দিদি আর তার স্বামীর সাপোর্ট আমার জন্য বড় পাওয়া।’
দারিদ্র্য, পারিবারিক সংগ্রাম আর সামাজিক বাধা পেরিয়ে ফুটবলে নিজের পরিচয় গড়ে তুলছেন স্মৃতি কিসকো। অল্প বয়সেই তার এই পথচলা ভবিষ্যতের জন্য নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি