সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু যেন এখন দেশের স্বাভাবিক ঘটনা। গাড়িচাপায় পথচারীর মৃত্যু, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় স্পট ডেথ- সবকিছুর দায়ই একে অন্যের ওপর চাপানোর প্রবণতা লক্ষ যায়। তবে গাড়িতে উঠার পর শুধু পোশাক-পরিচ্ছদজনিত ব্যক্তিগত অসাবধানতার কারণেও মৃত্যুর সংখ্যা হুহু করে বাড়ছে, যা রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো।
গত সাড়ে সাত বছরের হিসাবে দেখা গেছে, অটোরিকশার চাকায় ওড়না বা পোশাক প্যাঁচিয়ে ১৫৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। শিক্ষার্থীর বাইরে হিসাব করলে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। এ ছাড়া একই সময়ে অসাবধানে রেললাইন পারাপারের সময় এবং কানে হেডফোন ব্যবহার করে রেললাইন ধরে হাঁটার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে ১ হাজার ২৩৭ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। আর সাড়ে সাত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৭ হাজার ৩৬৪ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ধরন পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, পথচারী হিসেবে যানবাহনের চাপা বা ধাক্কায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৯২৩ জন (২৬ দশমিক ১১ শতাংশ)। যানবাহনের যাত্রী হিসেবে নিহত হয়েছেন ৯২৭ জন (১২ দশমিক ৫৮ শতাংশ)।
মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ৮৪১ জন (৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ)। এ ছাড়া বাইসাইকেল ও রিকশার আরোহী হিসেবে নিহত হয়েছেন ৫১৯ জন (৭ দশমিক ০৪ শতাংশ)। আর অটোরিকশার চাকায় ওড়না বা পোশাক প্যাঁচিয়ে নিহত হয়েছেন ১৫৪ জন (২ দশমিক ০৯ শতাংশ)।
দুর্ঘটনা পর্যালোচনা করে সংগঠনটি জানিয়েছে, গ্রামীণ সড়কে দুর্ঘটনা বেশি ঘটেছে। পাঁচ থেকে ১২ বছর বয়সি শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাওয়া-আসার পথে এবং বাড়ির আশপাশে খেলার সময় অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যানবাহনের ধাক্কা বা চাপায় নিহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনা গ্রামীণ সড়কে বেশি ঘটেছে।
এ ছাড়া ১৩ থেকে ২৫ বছর বয়সি শিক্ষার্থীরা মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে বেশি নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনা বেশি ঘটেছে আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়কে।
বাইসাইকেল আরোহীরা থ্রি-হুইলার, মোটরসাইকেল ও অনিরাপদ মালবাহী যানবাহনের ধাক্কায় গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কে বেশি নিহত হয়েছেন। এদিকে অটোরিকশার চাকায় ওড়না বা পোশাক প্যাঁচিয়ে সংঘটিত দুর্ঘটনার জন্য ব্যক্তিগত অসতর্কতাকে দায়ী করা হয়েছে। গত সাড়ে সাত বছরে অসাবধানে রেললাইন পারাপারের সময় এবং কানে হেডফোন ব্যবহার করে রেললাইন ধরে হাঁটার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে ১ হাজার ২৩৭ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহতের বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে ৬৯৩ জন, ২০২০ সালে ৭১৯ জন, ২০২১ সালে ৯৩৬ জন, ২০২২ সালে ১ হাজার ৩৮৫ জন, ২০২৩ সালে ১ হাজার ১৫৩ জন, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৭৩ জন, ২০২৫ সালে ১ হাজার ১৪ জন এবং ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত ৩৯১ জন মারা গেছেন।
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও অনিরাপদ যানবাহন, নিরাপদে সড়ক ব্যবহারে সচেতনতার অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারের অভাব, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর মানসিকতা, ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা এবং অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দায়ী করেছে সংস্থাটি।
সেই সঙ্গে সুপারিশে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে বছরে অন্তত একবার ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা, সরকারি উদ্যোগে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, ক্লাস ও পরীক্ষায় সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করা, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জীবনমুখী প্রচারের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করা, অনিরাপদ যানবাহন বন্ধ করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশের সড়কে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং অপ্রাপ্তবয়স্করা যেন কোনোভাবেই মোটরসাইকেল চালাতে না পারে, সে জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি