২৩ বছর বয়সি আরিফুল ইসলাম রিফাতের কোনো বৈধ ব্যবসা নেই। পরিবারেরও নেই কোনো ব্যবসা। অথচ এই বয়সেই তিনি দুটি বিলাসবহুল বিএমডব্লিউ গাড়ির মালিক। দৈনিক প্রায় অর্ধলাখ টাকা ব্যয় করে বিলাসবহুল হোটেলে থাকতেন। বিদেশি চক্রের সঙ্গে অনলাইন জুয়ার সাইট পরিচালনা করে তিনি বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ। সম্প্রতি গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন রিফাত।
রিফাতের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। অনলাইন জুয়া, ভুয়া বিনিয়োগ, অনলাইন আয়ের প্রলোভন, পরিচয় জালিয়াতি, ব্ল্যাকমেইল, ভুয়া লিংক ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারসহ নানা ধরনের প্রতারণার ফাঁদ এখন ছড়িয়ে পড়েছে নেট দুনিয়ায়। সহজ আয়ের সুযোগ দেখিয়ে এসব ফাঁদে ফেলা হচ্ছে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব বয়সি মানুষকে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ হারাচ্ছেন অর্থ, ব্যক্তিগত তথ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, দেশি-বিদেশি নাগরিকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে সক্রিয়। আগে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের এ ধরনের প্রতারণায় বেশি দেখা গেলেও এখন চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের নাগরিকদের সংশ্লিষ্টতা বেশি পাওয়া যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝেমধ্যে এসব চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করলেও সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতারণা ঠেকাতে জনসচেতনতার বিকল্প নেই।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, একটি ভুল ক্লিক, অসতর্কভাবে কোনো তথ্য শেয়ার কিংবা অপরিচিত ব্যক্তির কাছে ওটিপি দেওয়াই মুহূর্তে বড় ধরনের আর্থিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সম্প্রতি দেশে সাইবার হয়রানি, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, পরিচয় জালিয়াতি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার ও ডিজিটাল প্রতারণার মতো অপরাধ বাড়ছে।
এসব প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশেও পাচার হচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিভিন্ন তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন জুয়া, অবৈধ এমএলএম ব্যবসা ও ডিজিটাল প্রতারণার অর্থ বাইন্যান্স ও বাইবিটের মতো আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা, দেশের বিভিন্ন অবৈধ অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়।
ডিবি ও সিআইডির সাম্প্রতিক অভিযানে জানা গেছে, দেশীয় এজেন্টরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জুয়াড়িদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে তা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করেন। পরে চীনসহ বিভিন্ন দেশের ডিজিটাল ওয়ালেটে তা পাচার করা হয়। ২০২৩ সালের একটি বড় প্রতারণার ঘটনায় প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ক্রিপ্টোর মাধ্যমে দেশ থেকে পাচার করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
প্রতারণার কৌশলও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। ভুয়া পণ্য বিক্রির পেজ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি এখন অনলাইন আয়ের প্রলোভন, ভুয়া বিনিয়োগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় ব্যবহার এবং টেলিগ্রামভিত্তিক প্রতারণা চলছে। সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে এসব অপরাধের পেছনে সংগঠিত নেটওয়ার্ক, একাধিক ডিভাইস, ভুয়া পরিচয় এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে।
গত আগস্টে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন প্রতারণা ও অবৈধ ভিওআইপি চক্রের সন্ধান পায়। এ ঘটনায় তিন বিদেশি নাগরিকসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রামীণ ব্যাংকের নাম ব্যবহার করে অনলাইনে ভুয়া ঋণ দেওয়ার নামেও সাধারণ মানুষের কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও অর্থনৈতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, কার্ড ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সাইবার অপরাধীরা ৯২৬.০১ মিলিয়ন টাকা বা প্রায় ৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮২৭.২১ মিলিয়ন টাকা এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয়ের ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ নিয়ে আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। অনলাইন ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফাঁদে ফেলে তরুণদের বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। পরে বিভিন্ন ‘স্ক্যাম সেন্টারে’ আটকে রেখে তাদের জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত তথ্য চুরিও নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। সরকারি সার্ভার থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল ব্যাংকিং, সিম নিবন্ধন ও কল ডিটেইলসের তথ্য চুরি করে একটি চক্র অনলাইনে বিক্রি করছিল। এসব তথ্য ব্যবহার করে ক্লোন সিম বা ফিশিং লিংকের মাধ্যমে আর্থিক জালিয়াতি করা সহজ হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
চলতি বছর অনলাইনে আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুই প্রতারককে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। চলতি মাসে টেলিগ্রাম ব্যবহার করে অনলাইন প্রতারণার ঘটনায়ও দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে অনলাইন প্রতারণার অভিযোগে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের নাগরিক ছিলেন। তারা প্রায় দেড় মাস আগে খুলশীর কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন। পুলিশের ভাষ্য, তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বাসা ভাড়া নিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা ও অন্যান্য অনলাইন অপরাধে যুক্ত ছিলেন। তাদের সহযোগিতায় দেশি-বিদেশি আরও কয়েকজন বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার শহরের একটি হোটেল থেকে ছয় চীনা নাগরিককে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, অন্তত ৩০টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস ও যোগাযোগের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, সাইবার অপরাধীরা অনেক সময় প্রযুক্তির দুর্বলতার চেয়ে মানুষের অসতর্কতাকেই বেশি কাজে লাগায়। একটি ওটিপি শেয়ার করা, অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ বড় ধরনের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাসই সাইবার নিরাপত্তার প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
সিআইডির ডিআইজি (ভারপ্রাপ্ত) মো. সাইফুদ্দিন শাহীন বলেন, প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে নতুন সুযোগের পাশাপাশি নতুন ঝুঁকি ও অপরাধও তৈরি হয়েছে। সচেতনতাই সাইবার নিরাপত্তার প্রধান হাতিয়ার। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি