যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে প্রথম সরাসরি বৈঠককে ‘চমৎকার’ বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ যুদ্ধ শুরুর পর দুই নেতার মধ্যে এটিই ছিল প্রথম মুখোমুখি বৈঠক।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলা বৈঠকটি ‘ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ’ ছিল বলে জানিয়েছেন হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পও এটিকে ‘খুব ভালো বৈঠক’ বলে উল্লেখ করেন। তবে আলোচনার বিস্তারিত তিনি জানাননি।
ঘনিষ্ঠ বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন দুই নেতাই নিজ নিজ দেশে চাপের মুখে রয়েছেন। নেতানিয়াহু নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়েও তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের ওপরও চাপ রয়েছে ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য। চলমান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে এবং দ্রব্যমূল্য বাড়িয়েছে।
বৈঠকের পর ইসরায়েলি এক কর্মকর্তা জানান, নেতানিয়াহু ট্রাম্প ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের স্পষ্ট করেছেন— ইরান যদি ইসরায়েলে হামলা চালায়, তাহলে ইসরায়েল পাল্টা জবাব দেবে। তবে পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে তারা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখবে।
বৈঠকের পর ইনস্টাগ্রাম পোস্টে নেতানিয়াহু বলেন, এটি ছিল ‘চমৎকার’ আলোচনা। তিনি জানান, ট্রাম্পের পুরো শীর্ষ টিম বৈঠকে উপস্থিত ছিল।
হিব্রু ভাষায় নেতানিয়াহু বলেন, আমি যখন চমৎকার বলছি, সেটি শুধু আনুষ্ঠানিকতার কথা নয়। এটি ছিল পূর্ণ অংশীদারত্ব, পারস্পরিক সমর্থন এবং অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা—যার অন্যতম লক্ষ্য হলো ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।
বৈঠকের আগে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে কিছুটা উত্তেজনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশ্যে আলোচনার পরিকল্পনা করায় নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেন ট্রাম্প।
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ওই স্থাপনা সম্পর্কে তিনি সবকিছু জানেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিশ্বকে জানাতে হবে কেন?” এ সময় ইরানের কার্যক্রম নিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি “বড় সমস্যা নয়।
তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করবে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিজস্ব কৌশলগত সময়সূচি ও আঞ্চলিক মিত্রদের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে তিনি স্বীকার করেছেন।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেছে। তবে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সময় দুই নেতা ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন।
তবে ইরান পাল্টা হামলা শুরু করার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তেহরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনায়। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ বন্ধের চাপ বাড়ে।
ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের মতে, এরপর থেকে ইরান ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নেতানিয়াহুর প্রভাব কিছুটা কমেছে। ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজতে থাকায় ওয়াশিংটন-তেল আবিবের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে।
নেতানিয়াহু এর আগে বলেছিলেন, ইরানের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনেকাংশে ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছে। তিনি বলেন, যদি তিনি তীব্র সামরিক সংঘাতে না ফিরেও সমাধান করতে পারেন, তাহলে সেটিই ভালো।
বৈঠকে ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধ, গাজা পুনর্গঠন এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে রাখলেও, কিছু এলাকায় লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েনের অনুমতি দিয়েছে ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে পরবর্তী আলোচনা রোমে অনুষ্ঠিত হবে।
গাজার বিষয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর সদস্যদের প্রবেশের অনুমোদনের একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। তবে কতগুলো দেশ সেনা পাঠাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এদিকে গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েল দাবি করছে, এসব হামলা সশস্ত্র গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে। তবে এসব হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটছে।
যুক্তরাষ্ট্রে গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমেছে বলেও বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। ওয়াশিংটনের কাছে একদল বিক্ষোভকারী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে স্লোগান দেয় এবং তাকে যুক্তরাষ্ট্রে স্বাগত নয় বলে মন্তব্য করে।
সূত্র: এপি
সময়ের আলো/কেএইচ