যে যুদ্ধ এড়াতে চেয়েছিল, সেই সংঘাতেই জড়িয়ে পড়ছে সৌদি আরব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সংঘাত থেকে দূরে থাকার জন্য গত পাঁচ মাস ধরে নানা চেষ্টা চালিয়ে আসছিল সৌদি আরব। ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের

2026-07-29T13:14:12+00:00
2026-07-29T13:14:12+00:00
 
  বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬,
১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
যে যুদ্ধ এড়াতে চেয়েছিল, সেই সংঘাতেই জড়িয়ে পড়ছে সৌদি আরব
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১:১৪ পিএম 
ছবি : সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সংঘাত থেকে দূরে থাকার জন্য গত পাঁচ মাস ধরে নানা চেষ্টা চালিয়ে আসছিল সৌদি আরব। ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথও খোলা রেখেছিল দেশটি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তিন দিক থেকে শত্রুর চাপের মুখে পড়েছে রিয়াদ— ইরান, ইরানপন্থি ইরাকি মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা।

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে সৌদি আরব ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ইরাকভিত্তিক ইরানপন্থি গোষ্ঠীর ড্রোন হামলা এবং তেহরানের নতুন হুমকির মুখে পড়েছে।

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে সৌদি যুদ্ধবিমান ইরাকের পূর্বাঞ্চলে হামলা চালায়। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, এতদিনের সংযত অবস্থান ধরে রাখা আর সহজ হচ্ছে না।

তবে বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়া সৌদি আরবের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হতে পারে। গত এক দশকে দেশটির মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা। এ কারণেই ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছিল রিয়াদ। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চুক্তিও হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কৌশল বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

গত সপ্তাহান্তে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের উপকূলে সৌদি আরবের দুটি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। স্যাটেলাইট ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইয়েমেন সীমান্তের কাছে জাজান অঞ্চলের একটি স্থাপনা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর আগে হুথিরা লোহিত সাগরে দুটি সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালায়। তারা বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সৌদি জাহাজে অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল। সোমবার আরও একটি সৌদি জাহাজে হামলার দাবি করে গোষ্ঠীটি।

হরমুজ প্রণালীর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব ইতোমধ্যে তেল রপ্তানির বড় অংশ লোহিত সাগরের বন্দর যেমন ইয়ানবুর মাধ্যমে পরিচালনা করছে। ফলে হুথিদের অবরোধ সৌদি অর্থনীতির জন্য বড় চাপ তৈরি করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী তিন বছরে লোহিত সাগর দিয়ে দৈনিক প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে সৌদির। কিন্তু এ পথের বড় অংশই হুথিদের হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে সাত বছর ধরে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েও তাদের পরাজিত করতে পারেনি সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। ওই যুদ্ধ বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করেছিল। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ও মঙ্গলবার ইরাকের দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইরানপন্থি মিলিশিয়ারা ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও রাজধানী রিয়াদ।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব ড্রোন হামলায় হুথিরা প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকতে পারে।

এর জবাবে মঙ্গলবার ইরাকের পূর্বাঞ্চলে ইরানপন্থি মিলিশিয়াদের অবস্থানে হামলা চালায় সৌদি বাহিনী। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির তেল স্থাপনায় হামলার সঙ্গে জড়িত গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে নির্ভুল ও সীমিত অভিযান চালানো হয়েছে।

মন্ত্রণালয় বলেছে, সৌদি আরব সংঘাত বাড়াতে চায় না, তবে যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেবে।

ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস জানিয়েছে, সৌদি হামলায় কয়েকজন নিহত ও আহত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, এটি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের নির্দেশনায় পরিচালিত ৩০টির বেশি ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে “শক্তিশালী জবাব”।

ইরানের দিক থেকেও সৌদি আরব উদ্বেগে রয়েছে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন সৌদির পূর্বাঞ্চলের তেল স্থাপনায় হামলা চালানোর পর রিয়াদ দ্রুত ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা কেনার উদ্যোগ নেয়।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও সৌদি আরব সফর করে ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

তবে এমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাতারাতি স্থাপন করা সম্ভব নয়। ফলে উপসাগরের ওপার থেকে ইরানের ড্রোন ও স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকি এখনো রয়েছে।

যদিও এপ্রিলের পর ইরান সরাসরি সৌদি আরবে হামলা চালায়নি, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবারও অভিযোগ করেছে, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে।

ইরান যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি ২০১৮ সালের পর সবচেয়ে বড় ত্রৈমাসিক বাজেট ঘাটতিতে পড়ে।

যদিও তেলের দাম বাড়ায় কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া গেছে, তবে তেল উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। দেশটির বেশ কিছু বড় উন্নয়ন প্রকল্প এরই মধ্যে সীমিত করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখন সৌদি আরব আরও অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ এক অঞ্চলের মধ্যে অবস্থান করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান ও গাজা নীতি নিয়ে রিয়াদে উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বজায় থাকলেও সৌদি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের আগ্রহ কমে গেলে ইরানের মুখোমুখি একা দাঁড়াতে হতে পারে।

এদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কেও সাম্প্রতিক সময়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ওপেক থেকে আমিরাতের আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন, ইরান সংঘাত এবং ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে কাকে সমর্থন করা হবে— এসব বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিন সংযত থাকার পর সৌদি আরব এখন মনে করছে— আর কতটা চাপ সহ্য করা সম্ভব, তারও একটি সীমা রয়েছে।



  বিষয়:   সময়ের আলো  সৌদি আরব  যুক্তরাষ্ট্র  ইরান  হুতি 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: