জেন-জিদের ‘সিচুয়েশনশিপে’ আটকে গেল ভারত সরকার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ভারতের রাজধানী দিল্লির এক ব্যস্ত ম্যাকডোনাল্ডস আউটলেটে বসে ছিলেন লেখক মাধবন নারায়ণন। পাশের টেবিলে চোখ পড়তেই তিনি দেখলেন, দুই তরুণ

2026-07-29T18:40:29+00:00
2026-07-29T18:40:41+00:00
 
  বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬,
১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
জেন-জিদের ‘সিচুয়েশনশিপে’ আটকে গেল ভারত সরকার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ৬:৪০ পিএম  আপডেট: ২৯.০৭.২০২৬ ৬:৪০ পিএম
ভারতে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন। ছবি : এনডিটিভি
ভারতের রাজধানী দিল্লির এক ব্যস্ত ম্যাকডোনাল্ডস আউটলেটে বসে ছিলেন লেখক মাধবন নারায়ণন। পাশের টেবিলে চোখ পড়তেই তিনি দেখলেন, দুই তরুণ ও এক তরুণী— সম্ভবত কিশোর বয়সের শেষ প্রান্তে বা বিশের কোঠার শুরুতে—একটি বড় জন্মদিনের কেকের বাক্স খুলছে। দৃশ্যটি তাকে কিছুটা অবাক করল।

কারণ তিনি এমন এক সময়ে বড় হয়েছেন, যখন রেস্তোরাঁর বাইরে লেখা থাকত—“বাইরের খাবার আনা নিষেধ।” সেই পুরোনো নিয়মের সঙ্গে বড় হওয়া প্রজন্মের কাছে আজকের তরুণদের এই স্বচ্ছন্দ আচরণ কিছুটা অচেনাই মনে হতে পারে। তবে তরুণরা শেষ পর্যন্ত একটি বার্গার মিলও অর্ডার করল—যা পরিস্থিতিকে কিছুটা স্বাভাবিক করে দিল।

এই ছোট্ট ঘটনাটিই যেন নতুন প্রজন্মের পরিবর্তিত মানসিকতার একটি প্রতীক।

রোববার, কয়েক সপ্তাহ ধরে যন্তর মন্তরে চলা আলোচিত আন্দোলনের পর যখন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) রাজনৈতিক সাফল্যের দিকে এগোচ্ছিল, তখন একটি তামিল টেলিভিশন চ্যানেলের জনপ্রিয় চ্যাট শোতে বসে মাধবন নারায়ণন দেখছিলেন অন্য এক দৃশ্য। 

সেখানে বুমার, জেন-এক্স ও মিলেনিয়াল প্রজন্মের মানুষ বিস্ময় আর খানিকটা হাসির সঙ্গে শুনছিলেন জেন-জি তরুণদের কর্মক্ষেত্র নিয়ে প্রত্যাশার কথা। 

তারা বলছিল— তারা এমন চাকরি চায় যেখানে অতিরিক্ত নজরদারি থাকবে না, থাকবে নমনীয় সময়সূচি, প্রয়োজনে বাড়ি থেকে কাজের সুযোগ, যোগদানের বোনাস, কর্মী ধরে রাখার বোনাস, সপ্তাহের মাঝামাঝি ছুটি এবং বিনামূল্যের প্রযুক্তি সামগ্রী।

পুরোনো প্রজন্মের কাছে যা ছিল অর্জন করে নেওয়ার বিষয়, নতুন প্রজন্মের কাছে তার অনেক কিছুই যেন স্বাভাবিক অধিকার।

‘রেড ফ্ল্যাগ’ চিনে নেওয়া প্রজন্ম

মাধবন নারায়ণনের চোখে, জেন-জি এমন এক প্রজন্ম, যারা অনেক ক্ষেত্রে আগের প্রজন্মের চেয়ে ভিন্নভাবে পৃথিবীকে দেখে। তারা এমন কিছু সুযোগ ও স্বাধীনতাকে স্বাভাবিক মনে করে, যা আগে মানুষকে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জন করতে হতো।

তবে এই প্রজন্মকে শুধু অধিকারসচেতন বা সুবিধাপ্রত্যাশী বলে দেখলে ভুল হবে।

যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে যে ক্ষোভ দেখা গিয়েছিল এবং যার পর কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল, তা দেখিয়েছে—জেন-জির উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে বেকারত্ব, কঠিন প্রতিযোগিতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ পেশাজীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা।

এই প্রজন্ম একরকম নয়।

গ্রামের সেই তরুণও জেন-জি, যে পরিবারের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে স্নাতক হতে চায়। সেই তরুণও জেন-জি, যে কৃষিকাজ করা পরিবারের পটভূমি থেকে উঠে এসে একটি ভালো চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখে।

আবার শহুরে উচ্চবিত্ত তরুণও এই প্রজন্মের অংশ, যে নতুন জীবনধারা, ভ্যাপিং বা লাউঞ্জ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত।

একদিকে রয়েছে ঐতিহ্যনির্ভর তরুণ, যারা ‘ভজন-ক্লাবিং’-এর মতো নতুন সাংস্কৃতিক মিশ্রণে অংশ নিচ্ছে; অন্যদিকে রয়েছে আধুনিক নগরজীবনের অনুসারীরা।

কিন্তু এত বৈচিত্র্যের মাঝেও একটি বিষয় স্পষ্ট— পুরোনো প্রজন্ম ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে একটি গভীর ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

যাদের একসময় অলস বা লক্ষ্যহীন মনে করা হতো, তারাই প্রয়োজনের সময় সংগঠিত হয়ে দেখিয়েছে নিজেদের শক্তি।

সিজেপি আন্দোলন দেখিয়েছে, এই তরুণরা শুধু প্রতিবাদ করতে জানে না; তারা মিম, ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংগঠন ও আলোচনার কৌশল ব্যবহার করেও আন্দোলন পরিচালনা করতে পারে। 

রাজনৈতিক পরিচয় না থাকলেও তাদের নিজস্ব চিন্তা, ভাষা ও দাবি এখন ভারতীয় জনজীবনের সামনে নতুন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই বাস্তবতা যেমন বিরোধী দলগুলোর জন্য সত্য, তেমনি ক্ষমতাসীন বিজেপির জন্যও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার ১২ বছরে এটি ছিল এক অপ্রত্যাশিত ‘ব্ল্যাক সোয়ান’ ঘটনা।

মামদানির কাছ থেকে শিক্ষা

নরেন্দ্র মোদি ইতোমধ্যেই ইনস্টাগ্রাম ভিডিওর মাধ্যমে জেন-জির কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা শুরু করেছেন। তার দলের কর্মীরাও মাঠ পর্যায়ে একই ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছেন।

কিন্তু সমস্যা হলো— জেন-জি শুধু প্রচার শুনতে চায় না, তারা বোঝাপড়া চায়।  

তারা চায় রাজনৈতিক নেতারা তাদের কথা শুনুক, তাদের জীবনযাপন বুঝুক এবং তাদের বাস্তব সমস্যার দিকে নজর দিক। 

শুধু বার্তা পাঠিয়ে বা প্রচার চালিয়ে তাদের কাছে পৌঁছানো কঠিন। 

মিলেনিয়াল প্রজন্মের জোহরান মামদানিকে অনেকেই জেন-জির প্রতীক হিসেবে দেখেন। যদিও তিনি প্রচলিত বামপন্থী রাজনৈতিক ধারার মানুষ, তবুও তার গুরুত্ব অন্য জায়গায়— তিনি নতুন ভোটারদের কল্পনা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে পেরেছেন।

আজকের তরুণরা শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা নেতাদের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা, চরিত্র এবং সত্যিকারের অবস্থান দেখতে চায়।

জেন-জির ভাষাও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ। 

একজন তরুণী যখন বলেন, তার সরকার তাকে “গ্যাসলাইট” করছে, তখন আগের প্রজন্ম হয়তো এটিকে “রাষ্ট্রের প্রচারণা” বলত।

আরেকজন যখন বলেন, পুলিশের হাতে তাকে “লেজিট” আঘাত করা হয়েছে, তখন বোঝা যায় ভাষার ধরনও বদলে গেছে। 

তাদের কথাবার্তায় কঠোর শব্দ, স্ল্যাং ও ক্ষোভ থাকলেও একই সঙ্গে দেখা যায় ভগৎ সিং, ছত্রপতি শিবাজি ও আম্বেদকরের ছবি হাতে প্রতিবাদ।

অর্থাৎ এই প্রজন্ম একই সঙ্গে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশ্রণ।

তাই অনেকেই একে বলছেন— ‘ইনস্টাগ্রাম বিপ্লব’, যা হোয়াটসঅ্যাপ যুগের ভুয়া তথ্যের রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করছে।


নিজেদের দর্শকদের বুঝতে হবে 

আজকের জেন-জি স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কার ভগৎ সিংদের মতো নয়, আবার জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের আদর্শবাদী তরুণদের মতোও নয়।

তারা আত্মত্যাগী হওয়ার চেয়ে নিজেদের অধিকার ও সুযোগ সম্পর্কে বেশি সচেতন। 

তারা জানে কী চায়— আর এ কারণেই তারা রাজনীতির জন্য একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন এক শক্তি।

এই পরিস্থিতি অনেকটা ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের শুরুর দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

শুরুর কংগ্রেস ছিল শিক্ষিত অভিজাতদের সংগঠন, যারা নিজেদের জন্য ন্যায্য সুযোগ চেয়েছিল। 

তারা চেয়েছিল ব্রিটিশ আমলের ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে ভারতীয়দের সুযোগ বাড়ুক। সেই ছোট দাবি পরে ধীরে ধীরে বড় আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল।

হয়তো সিজেপির তরুণরাও ইতিহাসের নতুন কোনো অধ্যায় লিখছে। 

নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের তুলনায় যন্তর মন্তরের আন্দোলন ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু এটি ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের সামনে বড় শিক্ষা রেখে গেছে।

কারণ এই প্রজন্মকে বোঝার জন্য পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল আর যথেষ্ট নয়। 

যে তরুণদের রাজনৈতিক শিক্ষা একসময় সম্পাদকীয় লেখা বা টেলিভিশন বিতর্ক থেকে আসত, আজ তাদের অনেকের কাছে সেই শিক্ষা আসে স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ানদের কাছ থেকেও।

রাজনৈতিক দলগুলোর এখন সময় এসেছে বুঝে নেওয়ার 

প্রশ্ন হলো—রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে জেন-জিকে ভোটার হিসেবে আকৃষ্ট করবে?

শুধু পুরোনো প্রতিশ্রুতি, সরকারি প্রকল্প বা অতীতের সাফল্যের গল্প দিয়ে এই প্রজন্মকে ধরে রাখা কঠিন। তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক নির্বাচন তার একটি উদাহরণ।

সেখানে এম কে স্ট্যালিনের দল ডিএমকে পরাজিত হয় অভিনেতা সি জোসেফ বিজয়ের নেতৃত্বাধীন নতুন দল টিভিকের কাছে।

অনেকে মনে করেন, ইনস্টাগ্রাম রিলস এবং তরুণদের প্রভাব বড় ভূমিকা রেখেছিল।

তরুণরা শুধু নিজেরাই ভোট দেয়নি, পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলেছে।

ডিএমকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কাজ থাকা সত্ত্বেও ভোটারদের মনোযোগ সরে গেছে আইনশৃঙ্খলা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং নতুন আকাঙ্ক্ষার দিকে।

পুরোনো নেতাদের কাছে এটি ডান-বাম রাজনীতির মতো পরিচিত কোনো বিভাজন নয়। 

এটি অনেকটা এমন— টেস্ট ক্রিকেটের প্রজন্মকে হঠাৎ টি-টোয়েন্টির নিয়ম বুঝতে হচ্ছে।

তারা হয়তো বলবে, এটা আর আগের ক্রিকেট নয়। 

জেন-জি যখন কোনো রাজনৈতিক দলকে “বেট” বা “নো ক্যাপ” বলে সমর্থন করবে, তার আগে দলগুলোর সামনে এখনো অনেক শেখার কাজ বাকি। 

কারণ এই সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত নয়।

ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো এখন জেন-জির সঙ্গে এক অস্বস্তিকর ‘সিচুয়েশনশিপ’-এ আটকে আছে।


সময়ের আলো/ইউএমএইচ



  বিষয়:   ভারত  ককরোচ আন্দোলন  সিচুয়েশনশিপ 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: