ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধারা দেশটির বিধ্বস্ত লোহিত সাগর উপকূলীয় এলাকাগুলোতে দ্রুত অগ্রসর হওয়ায় আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছাড়ছেন হাজারো মানুষ। তারা আশ্রয় নিচ্ছেন অস্থায়ী শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে। এতে দীর্ঘদিনের যুদ্ধকবলিত দেশটিতে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়ছে।
উপকূলীয় এলাকা থেকে পালিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ প্রদেশে আশ্রয় নেওয়া আয়েশা মুহাম্মাদ তাদেরই একজন। যুদ্ধের কারণে পালিয়ে আসার সময় তিনি তার দুই মেয়ে ও তিন ছেলেকে বাড়িতে রেখে আসতে বাধ্য হয়েছেন। সংঘাতের কারণে একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথটি এখন পরিণত হয়েছে বাস্তুচ্যুত মানুষের পালানোর পথে।
আয়েশা মুহাম্মাদ বলেন, তাদের আটকে রাখা হচ্ছে এবং গুলি করা হচ্ছে। এখন তারা আমাদের কাছে আসতে পারছে না, আমরাও তাদের কাছে ফিরতে পারছি না। এটি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা।
অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরে পাথরের ওপর আগুন জ্বালিয়ে একটি পুরোনো কালো চায়ের পাত্রে পানি ফুটাতে ফুটাতে তিনি এসব কথা বলেন।
ইরানের প্রভাব আরও বাড়ছে
ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল ও দেশটির সবচেয়ে জনবহুল এলাকাগুলোর বড় অংশ আগে থেকেই হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নতুন করে পশ্চিমাঞ্চলে তাদের দ্রুত অগ্রযাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ইরানের প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
হুথিদের এই অগ্রযাত্রা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে। লোহিত সাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বৈশ্বিক তেল ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।
ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের ছয় মাসেরও বেশি সময় পর ইয়েমেনে হুথিদের নতুন এই অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ইয়েমেনে আবারও মানবিক সংকট
ইয়েমেনে মানবিক সংকট নতুন নয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সৌদি-সমর্থিত সরকার ও হুথিদের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক সংকটের মধ্যে ফেলেছে।
২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর ইয়েমেনে সংঘাত আরও তীব্র হয়। এর পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি বড় ধরনের সংঘাত অনেকটাই কমিয়ে দেয়। ছয় মাস পর আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলেও বড় ধরনের লড়াই তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। তবে স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রচেষ্টা আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেছে।
বাড়ছে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা
ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে হুথিদের নতুন অভিযান শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বা আইওএমের হিসাবে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ইয়েমেনে সংঘাতের কারণে ৮২ হাজার ১৬৪ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
বাস্তুচ্যুতদের কেউ কেউ ইয়েমেন ছেড়ে অন্য দেশেও পালিয়ে যাচ্ছেন।
আইওএমের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ বলেন, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে এমন একটি পরিবার রয়েছে, যারা সবকিছু হারিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অনেক মানুষ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। কেউ কেউ সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছেন একেবারে খালি হাতে, কারণ তাদের আর কোনো বিকল্প নেই।
অ্যামি পোপের ভাষায়, ইয়েমেন দারিদ্র্য ও সংঘাতে ছিন্নভিন্ন একটি দেশ এবং এই সংকট একা বহন করার সক্ষমতা দেশটির নেই।
নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনের অপেক্ষায় মানুষ
দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির শিকার ইয়েমেনের মানুষ এখন আবারও শান্তি ও স্বাভাবিক জীবনের প্রত্যাশায় দিন কাটাচ্ছেন।
বয়স্ক আবদুল্লাহ কায়িদ, যিনি লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটেন, তাদেরই একজন। বাড়িঘর ছেড়ে অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নেওয়ার পর তিনি বলছেন, তারা শুধু নিরাপদে বেঁচে থাকার সুযোগ চান।
আবদুল্লাহ কায়িদের ভাষায়, এখন আমাদের দিকে তাকান। আমরা ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছি, আতঙ্কে কাঁপছি। আমরা শুধু ন্যূনতম জীবিকা চাই, আমরা নিরাপত্তা চাই।
হুথিদের নতুন অগ্রযাত্রায় ইয়েমেনে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান না হলে দেশটির মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ