চুল কাটতে বের হওয়া রায়হান ফিরল এক পা ও কিডনি হারিয়ে

সময়ের আলো ডেস্ক

সারাদেশ

মাত্র ১০০ টাকা নিয়ে চুল কাটতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছরের মোহাম্মদ রায়হান। এরপর কেটে গেছে সাত মাস। দীর্ঘ

2026-09-14T15:13:09+00:00
2026-09-14T21:48:26+00:00
 
  রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬,
২৪ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
চুল কাটতে বের হওয়া রায়হান ফিরল এক পা ও কিডনি হারিয়ে
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:১৩ পিএম  আপডেট: ১৪.০৯.২০২৬ ৯:৪৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
মাত্র ১০০ টাকা নিয়ে চুল কাটতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছরের মোহাম্মদ রায়হান। এরপর কেটে গেছে সাত মাস। দীর্ঘ সময় পর বাড়ি ফিরলেও সেই চঞ্চল শিশুটি ফিরেছে এক পা হারিয়ে। পেটের ডান পাশ ও পিঠে রয়েছে অস্ত্রোপচারের দীর্ঘ দাগ।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার অটোরিকশাচালক নাজিম উদ্দীনের ছেলে রায়হান। গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয়রা তাকে শনাক্ত করেন। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে ছেলেকে উদ্ধার করেন বাবা।

রায়হানের ভাষ্য, বাড়ি থেকে চুল কাটার জন্য বের হয়ে সে কক্সবাজার চলে যায়। সেখানে কয়েকজন ছেলের সঙ্গে পরিচয়ের পর তাদের সঙ্গে ট্রেনের ছাদে চড়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে যায়। পরে কয়েকজন তাকে চারপাশে বাগান ও মাঝখানে একটি ঘর রয়েছে— এমন একটি জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে তার মতো আরও অনেক ছেলে-মেয়ে ছিল।

রায়হান বলে, এক রাতে সেখানে ঘুমানোর পর সকালে উঠে দেখে তার একটি পা নেই। কারণ জানতে চাইলে তাকে বলা হয়, ট্রেনে দুর্ঘটনায় তার পা কেটে গেছে। এরপর প্রতিদিন তাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ভিক্ষা করানো হতো। ভিক্ষার টাকা একটি প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমা রাখা হতো। সেখানে দুই পুরুষ ও সালমা নামের এক নারী ছিল। আরও অনেকের হাত-পা কাটা ছিল বলেও জানায় সে। একপর্যায়ে রায়হানকে একটি বাসে তুলে দেওয়া হলে সে চুনতির সীরাত মাহফিল এলাকায় চলে আসে।

রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীন বলেন, তার ছেলে হেফজখানায় পড়ত। একটু দুষ্টুমি করত বলে মাঝে মাঝে তাকে পানের ক্ষেতে কাজে নিয়ে যেতেন। চুল কাটার জন্য ১০০ টাকা দিয়ে পাঠানোর পর সে কক্সবাজার চলে যায়। পরে জানতে পারেন, তাকে কমলাপুরে নিয়ে গিয়ে পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো হয়েছে।

নাজিম উদ্দীনের অভিযোগ, ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর অভাবের কারণে তিনি থানায় জিডি করতে পারেননি। পরে রায়হানকে ফিরে পাওয়ার পর লোহাগাড়া থানায় অভিযোগ করতে গেলে পুলিশ ঘটনাটি কমলাপুরের হওয়ায় সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেয়।

তিনি বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ, দিনে এনে দিনে খাই। ঢাকায় গিয়ে অভিযোগ করার সেই সামর্থ্য আমার নেই।’

রায়হানের সৎমা ফয়জুন্নেসা বলেন, ‘চুল কাটতে গিয়ে সাতটা মাস আর বাড়ি ফিরল না। এখন ছেলেটারে ফেরত পাইলাম, কিন্তু দেখি তার একটা পা-ই নেই। পেটেও বড় কাটার দাগ। কোন পাষাণরা আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটার এই হাল করল?’

রায়হানকে প্রথম দেখতে পাওয়া স্থানীয় বাসিন্দা নুরুন্নবী বলেন, রাত ১২টার পর মাহফিলের ভিড়ে এক পায়ে ভর দিয়ে একটি শিশুকে ভিক্ষা করতে দেখেন তিনি। মুখ পরিচিত মনে হওয়ায় কাছে গিয়ে নাম জানতে চান। তখন শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে নিজের পরিচয় দেয়। পরে তিনি রায়হানের বাবাকে খবর দেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. তৈয়ুবুল্লাহ বলেন, ১২ বছরের শিশুটির সঙ্গে যে বর্বরতা করা হয়েছে, তা কল্পনার বাইরে। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

মানবাধিকার কর্মী দেলোয়ার হোসেন রশিদীও ঘটনাটির তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তবে থানায় অভিযোগ না নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে লোহাগাড়া থানার পুলিশ। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রশান্ত কুমার ভৌমিক জানান, রায়হান সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বের হলেও তার পরিবার থানায় কোনো অভিযোগ বা জিডি করেনি।

প্রশান্ত কুমার ভৌমিক বলেন, পরিবারের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পেরেছেন, রায়হান প্রায় এক মাস কক্সবাজারে ছিল। পরে তাকে কমলাপুরে নেওয়া হয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে রায়হান নিখোঁজ থাকার সময় কমলাপুর রেলস্টেশনে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর তার একটি ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। সেখানে রায়হানকে বলতে দেখা যায়, জায়গা-সংক্রান্ত মামলায় তার বাবা কারাগারে এবং সৎমা তাকে মারধর করায় সে ট্রেনের ছাদে চড়ে ঢাকায় এসেছে। তবে স্বজনদের দাবি, ভয় দেখিয়ে বা কাউকে দিয়ে কথা বলিয়ে শিশুটিকে দিয়ে ওই বক্তব্য দেওয়ানো হয়ে থাকতে পারে।

মানবাধিকার আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচএফ) মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশু উদ্ধার হলেও ২ হাজার ৩৮ শিশু এখনো নিখোঁজ।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বিএইচএফ জানায়, নিখোঁজ শিশুদের সিংহভাগের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।

বিএইচএফের চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, নিখোঁজ শিশুদের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। শিশু পাচার, অঙ্গ পাচার ও ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার চক্রের সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। এ জন্য নিখোঁজ শিশুদের সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেজ ও জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।



সময়ের আলো/কেএইচ
  বিষয়:   সময়ের আলো  ভিক্ষা 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: