মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর আজ বৃহস্পতিবার দুদিনের বাংলাদেশ সফরে আসছেন। রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর একই সঙ্গে ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কেমন পরিবর্তন আসছে, সামনের দিনগুলোতে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকবে কি না ইত্যাদি ইস্যুতে সরেজমিন খোঁজ-খবর নিতেই রাষ্ট্রদূত গোরের এই সফর।
রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফর নিয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বুধবার মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, তার সঙ্গে ইতিমধ্যে ম্যানিলায় দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, বৈঠক হয়েছে। আমরা দুই দেশের সম্পর্ক রিভিউ করেছি। আপনারা জানেন, আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমুখী। তারাও চাইছেন সম্পর্কটাকে আরও এগিয়ে নিতে। সে বিষয়ে... ওনি কেবল ভারতে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত না, ওনি আমেরিকান প্রেসিডেন্টের দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার বিষয়ভিত্তিক প্রতিনিধি এবং আমাদের এখানে ওনার এই সফর প্রথম সফর। দক্ষিণ এশিয়া যেহেতু তার পোর্টফোলিওতে পড়ে, বাংলাদেশও তার অন্তর্ভুক্ত। প্রথম সফর হিসেবে আমরা ধারণা করছি এটা একটা অনুসন্ধানমূলক সফর। তিনি বাংলাদেশ সম্পর্কে বুঝতে চাইবেন, শুধু আমাদের সঙ্গে না, অন্যান্য স্টেকহোল্ডারের সঙ্গেও কথা বলবেন। আমাদের রোহিঙ্গা সমস্যা সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে বৈদেশিক সাহায্য আমরা যা পেয়েছি, সে সব আন্তর্জাতিক পার্টনারকে আমরা ধন্যবাদ দিচ্ছি, তার ভেতরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যের পরিমাণ সর্বাধিক এবং এটা আমরা স্বীকার করি ধন্যবাদের সঙ্গে। তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাবেন বলে আমরা আশা করছি। পারস্পরিক সম্পর্কের সবদিক, সব প্রধান প্রধান দিক বোঝার চেষ্টা করবেন। তার জন্যই এটা একটা এক্সপ্লোরেটরি বা উপলব্ধির সফর। এবং আমরা তার সঙ্গে আলোচনা করব। আমার সঙ্গেও হবে, তিনি অন্য মন্ত্রীদের সঙ্গেও কথা বলবেন। আমার সঙ্গে যে মিটিং হয়েছে ম্যানিলায়, চমৎকার মিটিং।
একজন সাংবাদিক জানতে চান যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়টা যদি দেখি বিগত সময়গুলোতে ওদের একটা কনসার্ন ছিল যে, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হচ্ছে কি না, উন্নয়নে আরও অংশীদারিত্ব বাড়ছে কি না। বিগত সময় যদি ডোনাল্ড লু-কে দেখি বা অন্য যারা যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত এসেছিলেন, তারা এই কনসার্নটা প্রকাশ করে গেছেন। একই সঙ্গে এবার চীনের সঙ্গে অনেক বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনা হয়েছে, বেশ কিছু প্রটোকল নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তাদের আর্থিক সহায়তার বিষয়ে আলাপ হয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার কি মনে হয় যে, আমেরিকার কোনো কনসার্ন আছে আদৌ?
জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেখুন, এটা আমার মনে হওয়ার বিষয় নয়। কূটনীতিতে আমরা আন্দাজে কাজ করি না। আমরা বাস্তবতার ভিত্তিতে কাজ করি, এটা কিন্তু মনে রাখবেন। এটা সোশ্যাল মিডিয়ার মতো বিষয় নয়, তাই না? দ্বিতীয় নম্বর কথা আমি আপনাকে উত্তর দিচ্ছি, আমাদের কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক অন্য দেশের পরিপ্রেক্ষিতে জিরো-সাম গেম নয়। একজনের সম্পর্ক ক্ষতি করে আরেকজনের সম্পর্ক বৃদ্ধি করা আমরা কখনোই সেটা করব না। সব দেশের সঙ্গে আমাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে, আমাদের স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে আমরা সম্পর্ক বৃদ্ধির চেষ্টা করছি। কারও সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন মানেই এই নয় যে অন্যজনের সঙ্গে সম্পর্ক অবনতি হচ্ছে। চীনের সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত ভালো সফর হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি ভারতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যান, আমরা আশা করব সেই সফরটিও অত্যন্ত ভালো হবে। এবং এই যে মিস্টার গোর আসবেন, আমার সঙ্গে সেক্রেটারি অব স্টেটের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা হয়েছে এগুলো হচ্ছে এই ইন্টারঅ্যাকশনগুলোর মাধ্যমে আমরা সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাচ্ছি। বাংলাদেশের সঙ্গে তো একটা দেশের না, বহু দেশের সম্পর্ক আছে। এটা তো স্ত্রী এবং সতিনের মধ্যে মারামারি নয় ভাই! এটা হচ্ছে স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক। যেখানে আমাদের স্বার্থ, আমরা সেখানে যাব।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় এক অতিথি ভবনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এরপরই তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও রাজনৈতিক দলের নেতাসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপ করতে পারেন। রোহিঙ্গা সংকটের সরেজমিন অভিজ্ঞতা নিতে শুক্রবার কক্সবাজারের একাধিক রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করতে পারেন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর।
এই সফরে রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে ঢাকার অবস্থান জানা-বোঝার চেষ্টা করবেন। বিশেষ করে ঢাকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ শীর্ষক পররাষ্ট্রনীতিতে কোন কোন বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে, সামনে কোন কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার হিসেবে ঢাকা এগিয়ে নিতে চায় সেসব বিষয় আসন্ন সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় ভোটের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। সামনের আগস্টে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাপান এবং অক্টোবরে তুরস্ক সফরে যেতে পারেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত ৫ মাসে তুরস্ক, বেলজিয়াম, ইথিওপিয়া, ভারত, চীন ও রাশিয়া সফর করেছেন। এসব সফরে এই দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থিত। একই সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থিত। এমন নানা ইস্যুতে ঢাকা ওয়াশিংটনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন সবসময়ই ঢাকাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর গত ৫ মাসে দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে ঢাকা তার বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে যে সব সমঝোতা করেছে এবং সামনের দিনে তা কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে তা জানা-বোঝার জন্যই মূলত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের ঢাকা সফর।
বাংলাদেশ বরাবর এক চীন নীতির সমর্থক ছিল। সর্বশেষ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যাওয়ার পর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয় যে, চীন যদি তার পুনঃএকত্রীকরণের উদ্যোগ নেয় তবে বাংলাদেশ তাতে সমর্থন দেবে। চীন সফরে বাংলাদেশ দেশটির চারটা ইনিশিয়েটিভের (গ্লোবাল গভর্নেন্স ইনিশিয়েটিভ-জিজিআই, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ-জিডিআই, গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ- জিএসআই, গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ-জিসিআই) প্রশংসা করেছে। এ ছাড়া গত চীন সফরে দুটি প্রস্তাবনা সবারই নজর কেড়েছে। এক. চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর এবং দুই. পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা সমন্বয়ে দুই দেশের ২+২ বৈঠক আয়োজনে সম্মত হওয়া। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গত জুনে ঢাকা সফর করেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরে উভয়পক্ষ সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তুরস্ক বাংলাদেশে ড্রোন কারখানা স্থাপন করবে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকবে কি না তা পরখ করতেই রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের ঢাকা সফর। এ ছাড়া গত ১২ ফেব্রেুয়ারির নির্বাচনের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই করা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) বাস্তবায়নও এই সফরে গুরুত্ব পাবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আরবিএন