মানবজাতির ইতিহাসের সূচনা যাঁকে কেন্দ্র করে, তিনি হজরত আদম (আ.)। তিনি শুধু মানবজাতির আদি পিতা নন, আল্লাহর মনোনীত প্রথম নবীও। তাঁর জীবনকাহিনির মধ্যে রয়েছে মানবসৃষ্টির রহস্য, জ্ঞানের মর্যাদা, আল্লাহর আনুগত্য, শয়তানের ষড়যন্ত্র, অহংকারের পরিণতি, ভুলের পর তওবা এবং পৃথিবীতে মানুষের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। পবিত্র কুরআনে হজরত আদম (আ.)-এর ঘটনা একটি মাত্র স্থানে নয়, বরং বিভিন্ন সুরায় বিভিন্ন দিক থেকে বর্ণিত হয়েছে।
বিশেষ করে সুরা আল-বাকারা, আল-আরাফ, আল-হিজর, ত্বহা ও সোয়াদে তাঁর সৃষ্টি, মর্যাদা, ইবলিসের অবাধ্যতা, জান্নাতে অবস্থান এবং পৃথিবীতে আগমনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথিবীতে মানবজাতির সূচনা মানুষকে আল্লাহ তায়ালা উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি। মানবজাতির পৃথিবীতে আগমনের আগেই আল্লাহ ফেরেশতাদের জানিয়ে দেন, ‘নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা সৃষ্টি করতে যাচ্ছি’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৩০)।
এরপর আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.)-কে মাটি থেকে সৃষ্টি করেন। মানুষের সৃষ্টির এই বিবরণে রয়েছে গভীর শিক্ষা। মানুষ যতই ধনী, ক্ষমতাবান কিংবা জ্ঞানী হোক, তার সূচনা মাটি থেকে। অতএব বংশ, সম্পদ, সৌন্দর্য বা ক্ষমতা নিয়ে অহংকার করার কোনো সুযোগ নেই। মানুষের প্রকৃত মর্যাদা ঈমান, তাকওয়া ও সৎকর্মে।
হজরত আদম (আ.)-এর মর্যাদা
আদম (আ.)-এর অন্যতম বিশেষ মর্যাদা ছিল জ্ঞান। আল্লাহ তাঁকে বিভিন্ন বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছিলেন। এরপর সেগুলো ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলে তাঁরা নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেন। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি আদমকে সব নাম শিক্ষা দিলেন’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৩১)। ফেরেশতারা বললেন, ‘আপনি পবিত্র। আপনি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞান নেই’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৩২)। এই ঘটনা মানুষকে জ্ঞানের মর্যাদা যেমন শেখায়, তেমনি জ্ঞানের সঙ্গে বিনয়ের সম্পর্কও স্পষ্ট করে। জ্ঞান মানুষকে মর্যাদা দেয়, কিন্তু সেই জ্ঞান যেন তাকে অহংকারী না করে এটাই কুরআনের শিক্ষা।
ইবলিসের অহংকার
আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ ফেরেশতাদের তাঁকে সেজদা করার নির্দেশ দেন। সবাই সেজদা করলেও ইবলিস অহংকারবশত তা অস্বীকার করে। আল্লাহ বলেন, ‘ইবলিস ছাড়া সবাই সেজদা করল। সে অস্বীকার করল, অহংকার করল এবং সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৩৪)। ইবলিস তার অবাধ্যতার কারণ হিসেবে বলেছিল, ‘আমি তাঁর চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ১২)। ইবলিসের পতনের মূল কারণ ছিল অহংকার। সে আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের যুক্তি ও শ্রেষ্ঠত্বের দাবি দাঁড় করিয়েছিল। এখানেই মানুষের জন্য রয়েছে বড় সতর্কবার্তা। জ্ঞান, সম্পদ, পদমর্যাদা বা ক্ষমতা কোনো কিছুই মানুষকে অন্যের প্রতি অহংকারী হওয়ার অধিকার দেয় না।
জান্নাতে হজরত আদম (আ.) ও তাঁর স্ত্রী
আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.) ও তাঁর স্ত্রীকে জান্নাতে বসবাসের সুযোগ দেন। তাঁদের জন্য জান্নাতের অসংখ্য নেয়ামত উন্মুক্ত ছিল। তবে একটি নির্দিষ্ট গাছের কাছে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা উভয়ে জান্নাতে বসবাস করো এবং সেখান থেকে স্বাচ্ছন্দ্যে আহার করো, কিন্তু এই গাছটির নিকটবর্তী হয়ো না’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৩৫)। কিন্তু শয়তান তাঁদের প্ররোচিত করে। কুরআন বলছে, ‘অতঃপর শয়তান তাঁদের উভয়কে সেখান থেকে পদস্খলিত করল এবং তাঁরা যে অবস্থায় ছিল তা থেকে তাঁদের বের করে দিল’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৩৬)। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। সে মানুষকে পাপের দিকে আকৃষ্ট করে এবং অনেক সময় পাপকে সুন্দর ও লাভজনক হিসেবে উপস্থাপন করে।
হজরত আদম (আ.)-এর তওবা
আদম (আ.)-এর জীবনের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক শিক্ষা হলো, ভুলের পর তওবার দরজা খোলা থাকে। আদম (আ.) ও তাঁর স্ত্রী নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তাঁদের দোয়া কুরআনে এসেছে, ‘হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তা হলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ২৩)। আল্লাহ তাঁদের তওবা কবুল করেন। এখানে মানবজাতির জন্য অসাধারণ আশার বার্তা রয়েছে। মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু ভুলের পর আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই হলো সফলতার পথ।
পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মানুষের আগমন
আদম (আ.) ও তাঁর স্ত্রী পৃথিবীতে আসার পর মানবজাতির পার্থিব জীবনের সূচনা হয়। পৃথিবীর জীবন কোনো উদ্দেশ্যহীন জীবন নয়, এটি পরীক্ষা ও দায়িত্বের জীবন। আল্লাহ বলেন, ‘যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে কোনো হেদায়েত আসবে, তখন যারা আমার হেদায়েত অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৩৮)। অর্থাৎ মানুষের সামনে আল্লাহর হেদায়েত রয়েছে। যে ব্যক্তি সেই হেদায়েত অনুসরণ করবে, তার জন্য রয়েছে সফলতা; আর যে ব্যক্তি শয়তানের পথ অনুসরণ করবে, তার জন্য রয়েছে ক্ষতি।
হজরত আদম (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা
হজরত আদম (আ.)-এর জীবনকাহিনি শুধু অতীতের কোনো ঘটনা নয়, বর্তমান সমাজের জন্যও এর শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজ মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অভাবনীয় উন্নতি করেছে। কিন্তু জ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে যদি নৈতিকতা, বিনয় ও আল্লাহভীতি না থাকে, তা হলে সেই অগ্রগতি মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে বিপদের কারণ হতে পারে। সমাজে অহংকার, হিংসা, বৈষম্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্যের অধিকার হরণ নানা রূপে দেখা যায়। এসবের বিপরীতে আদম (আ.)-এর জীবন আমাদের শেখায়- বিনয়ী হতে হবে, ভুল হলে তা স্বীকার করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে হবে। মানুষের মর্যাদা তার সম্পদে নয়, চরিত্রে; বংশে নয়, তাকওয়ায়; ক্ষমতায় নয়, ন্যায়পরায়ণতায়।
প্রভাষক, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া
সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), চট্টগ্রাম
সময়ের আলো/আআ